প্রশ্ন হয়েছিল: কদ্দিন থেকে এই রকম শ্বাসকষ্ট হচ্ছে?
দিন পাঁচেক আগে নেটে বল করার সময়।
তার আগে কখনও হয়নি?
আনন্দ আড়চোখে অরুণের উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, হত, খুব সামান্য।
কতদিন আগে থেকে? দুবছর? তিন বছর?
আনন্দ মনে করার চেষ্টা করল।
জ্বর হত? সর্দি কাশি? গাঁটে গাঁটে ব্যথা?
ডাক্তারের কাছে মিথ্যা বলতে নেই, লুকোতে নেই। আনন্দ ঘাড় নাড়ল।
কাউকে জানাওনি?
আনন্দ কয়েক সেকেন্ড অরুণের মুখ লক্ষ করে বলল, না, আপনা থেকেই সেরে যেত তাই কাউকে বলতাম না।
মাকেও বলনি?
গলা খাঁকারি দিয়ে অরুণ বলল, আমাদের মা নেই। আনন্দ যখন আট বছরের তখন মারা যান, নিউমোনিয়ায়। অত্যন্ত চাপা ছিলেন, কাউকে কিছু প্রথমে বলেননি। আনন্দও মায়ের মতো চাপা স্বভাবের হয়েছে।
এক ঝলক হাসি আনন্দর মুখের ওপর খেলে গেল। ডাক্তারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
ক্রিকেট ছাড়া আর কিছু খেলো?
ফুটবল খেলতাম, এখন আর খেলি না।
কোন পজিশনে?
লেফট উইং।
ছুটতে গেলেই শ্বাসকষ্ট হত, তাই ফুটবল ছেড়েছ।
প্রশ্ন নয়, কথাগুলো যেন ঘোষণার মতো। ডাক্তারবাবু যেন জানেনই কেন আনন্দ ফুটবল খেলা ছেড়েছে। মরিয়া হয়ে সে বলল, পরে ব্যাকে খেলতাম। গত বছরও খেলেছি।
এ বছর?
আমি ক্রিকেটটাই শুধু খেলতে চাই। চোট লাগলে বোলিংয়ে অসুবিধে হবে ভেবে ফুটবল বন্ধ করেছি। আনন্দ একটু বেশি জোর দিল ভেবেইর উপর।
ডাক্তারবাবুর মুচকি হাসিটায় বিব্রত হয়ে, আবার সে বলল, পঙ্কজ রায় তো ক্রিকেটের জন্যই ফুটবল খেলা ছেড়েছিলেন।
উত্তর না দিয়ে ডাক্তারবাবু আর একবার স্টেথস্কোপ দিয়ে আনন্দর শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করে অরুণকে বললেন, ব্যাপারটা যে এই প্রথম, তা নয়। বছর কয়েক আগেই রিউম্যাটিক ফিভার শুরু হয়েছে। তখন গ্রাহ্য করেনি। চিকিৎসা না করে চেপে যাওয়ায়, ডাক্তারি পরিভাষায় এটা রিউম্যাটিক মাইট্রাল ইনকমপিটেন্সে দাঁড়ায়। সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে চিকিৎসা না হওয়া আর অবহেলা, দুটো মিলে মনে হচ্ছে এখন অ্যাডভান্সড স্টেজের দিকে এগিয়েছে। এক্স-রে করা দরকার, দেখতে হবে এট্রিয়েল ফাইব্রিলেশন হয়ে গেছে কি না।
খুব সিরিয়াস ধরনের কিছু কি? অরুণ কোনওরকমে প্রশ্নটি করল। তার চোখে অজানা ভয় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হার্টের ব্যাপার। সেটা চলার একটা ছন্দ আছে। ছন্দটা বদলে গেছে। সুতরাং সিরিয়াস তো বটেই।
আনন্দ দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, সারতে কতদিন লাগবে? আমাদের কোচিং এখনও দিনদশেক চলবে। তার আগেই
ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ছেন দেখে আনন্দ থেমে গেল।
বন্ধ। একদম বন্ধ। কোনওরকম পরিশ্রম নয়, সিঁড়ি ভাঙা পর্যন্ত বন্ধ। খুব আস্তে হাঁটাচলা করলেও করতে পারো। উত্তেজনা আসতে পারে এমন কোনও ব্যাপারে যাবে না, চিন্তাও করবে না। নুন খুব কম খাবে। অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ যা লিখে দিচ্ছি তাই নিয়মিত খাবে, বৃষ্টিতে ভেজা একদম বারণ, মাটিতেও শোবে না।
খেলা একদম বারণ? আনন্দ বিশ্বাস করতে পারছে না।
হ্যাঁ, বারণ, তারপর অরুণকে প্রশ্ন, বাথরুম কি দোতলায়?
না, একতলায়।
তা হলে ওকে একতলায় রাখার ব্যবস্থা করুন, যাতে সিঁড়ি ভাঙতে না হয়।
অরুণ মাথা নাড়ল, কয়েক মুহূর্ত ভেবে আনন্দকে চাপা গলায় বলল, তুই একটু ঘরের বাইরে যা, দু-একটা কথা ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করব।
বাইরে সিড়িতে দাঁড়িয়ে আনন্দ কান পেতে রেখেছিল ঘরে। দু-একটা টুকরো শুনতে পেয়েছে:
দেখাশোনার কেউ নেই.নিশ্চয়, ওকে গুরুত্বটা বুঝিয়ে দেব।
এর থেকে সেরিব্রাল এমবলিজম হতে পারে..পারমানেন্ট প্যারালিসিস..সাবধান না হলে…জোর করে করতে হবে। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা…মা থাকলে ভাল হত।
রাস্তায় একটা গোল হল। চিৎকারের মধ্যেও আনন্দ বুকের ধকধক শব্দটা শুনতে পাচ্ছে। প্যারালিসিস মানে পক্ষাঘাত। শুধু বিছানায় শুয়ে থাকা। হবে, হতে পারে অর্থাৎ আমি সারাজীবন বিছানায় শুয়ে থাকব! কী অদ্ভুত।
চল, যাই এবার।
চমকে উঠল। চিন্তায় ডুবে ছিল, বুঝতে পারেনি অরুণ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ উৎফুল্ল স্বরে সে বলল, ওই ছেলেটা ড্রিবল করছিল দারুণ, দেখবে?
স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে শুকনো গলায় অরুণ শুধু বলল, তাই নাকি।
গম্ভীরমুখে সে সারা পথ স্কুটার চালিয়ে এল। ট্রাফিকের লাল আলোয় একবার থামতে হয়। তখন অরুণ পিছনে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, একতলায় আমাদের একটা ঘর পড়ে আছে না? কী আছে ওটায়?
ভাঙা সোফা, ঝাড়বাতি আরও কীসব আছে। খুব আরশুলা ঘরটায়। প্রায়ই বিছে বেরোয়।
আনন্দ আঁচ করতে পারছে মেজদার মাথায় এখন কী চিন্তা। একতলার ঘরটায় তার থাকার ব্যবস্থার কথা ভাবছে। কিন্তু ওঘরে বাস করার কোনও ইচ্ছেই তার নেই। সে আর একবার যখন আরশুলা-বিছের কথা বলতে যাচ্ছে তখনই স্কুটারটা ছেড়ে দিল। মেজদার চোয়াল অযথা শক্ত হয়ে গেছে দেখে সে বুঝল কোনও অনুনয়েই কাজ হবে না।
আনন্দর থাকার জন্য সেইদিনই ঘর নির্দিষ্ট হল একতলায়।
.
বাড়ির পিছনদিকে ছোট্ট এই ঘরটা বহু বছর পড়ে ছিল। বাড়ির লোকে ভুলেই গেছল ঘরটার কথা। উত্তরের জানলা খুললেই ঝোপঝাড় ছোটখাটো জঙ্গল। তারপরে একটা জলা জমি। জানলা ঘেঁষে বাড়ির পাঁচিল শুরু হয়েছে। দত্তদের কারখানার টিনের শেড আর চিমনিটা দেখা যায়। জানলার নীচেই পায়েচলা পথের দাগটা সাপের খোলসের মতো পাঁচিল ঘেঁষে কারখানার পিছনের দরজার পৌঁছেছে। আনন্দদের বাড়ির অর্ধেকটায় যে গুদাম, তার সঙ্গে কারখানার যোগাযোেগ এই পথ দিয়েও হয়। তবে লরি আসে সামনের দরজায়।
