আনন্দ অবাক হয়ে গেল। বাড়ির সামনেই লাইব্রেরিটা, অথচ সে জানত না। আক্ষেপে মন ছেয়ে গেল, কেন মেম্বার হয়নি। মেজদা বলেছিল, যারা ক্রিকেট শিখতে চায়, বইটা তাদের গীতার মতো পড়া উচিত। আর সেই গীতাটাকে উইয়ে কেটে দিল লাইব্রেরির তাকে! একবার যদি কেউ বলত, তা হলে মেম্বার হয়ে যেত। লাইব্রেরিতে গিয়ে কোনওদিন সে ইংরেজি বইয়ের ক্যাটালগটাও যদি দেখত। মেজদাটাও কখনও লাইব্রেরির মেম্বার হয়নি। ওখানে নাকি মান্ধাতার আমলের বই আর মাসিক পত্রিকা ছাড়া কিছু নেই। অথচ আর্ট অফ ক্রিকেট ছিল। এরকম হয়তো আরও অনেক বই পড়ে আছে।
জিজ্ঞাসা করার জন্য মুখ ফিরিয়ে আনন্দ ওকে দেখতে পেল না। আসার মতোই নিঃসাড়ে চলে গেছে। গলা লম্বা করে আনন্দ চারধারে খুঁজল। কয়েক পা গেলেই পর্দার আড়ালে চলে যাওয়া যায়। ওকে দেখা গেল না। উঠে খুঁজতে ইচ্ছে হল না তার। একা বসে তাকিয়ে রইল কোর্টের দিকে। এবং ক্রমশ ভারবোধ করতে লাগল সারা দেহে। সামান্য ঝিমুনি আসছে।
আনন্দ নিজের কপালে হাত রাখল, বোধহয় আবার জ্বর আসছে। অনেকটা হেঁটে বাড়ি, কিছু পয়সা থাকলে রিকশায় যেত। মেজদাকে আজই বলতে হবে। ও হয়তো বাবাকে বলবে। জ্বর টর হলে বাবা বিরক্ত হয়। জ্বরের জন্য ডাক্তার দেখানো, ওষুধ কেনাটা বাজে খরচ মনে করে। মেজদা যেন বাবাকে না বলে। কিন্তু ডাক্তার যদি বলে, খেলা বন্ধ করতে হবে! যদি বলে তোমার দারুণ একটা অসুখ করেছে, খেলা একদম বন্ধ! চিরকালের মতো বন্ধ!
ভয়ে কেঁপে উঠল আনন্দর বুক। সন্ধ্যা নামছে। পার্কের গাছগুলোয় একটানা কিচিরমিচির করে চলেছে পাখিগুলো, আনন্দ ভেবে পায় না কী জন্য রোজ সন্ধ্যায় গাছে ফিরেই সবাই কথা বলে। এত কী কথা ওদের! সে নিজে একদম কথা বলে না বাড়ি ফিরে। কার সঙ্গেই বা বলবে। তরুণের কপাল ফেটেছে তার বলে, একথাটা বাড়িতে কাকে জানাবে? মেজদা তো আসবে অনেক রাতে।
যদি মা থাকত।
আকাশের গাঢ় কমলা রঙের অংশটার উপর একসার কালো ফুটকি ভেসে উঠে সন্ধ্যার ধূসরতার মধ্যে প্রবেশ করতে দেখল আনন্দ। ওরা পাখি। কোনও বিল বা দীঘির দিকে চলেছে। কিংবা ওরা হয়তো সাইবেরিয়া থেকে আসা এখন আবার ফিরে যাচ্ছে। হাজারেরও বেশি মাইল উড়ে যাবে। কী জোর ওদের ডানায়, ওদের হার্টে! অবসাদে ক্লান্ত লাগছে তার। এইবার তার নিজেকে একা মনে হচ্ছে। শীতকালের ভোরে ঘন কুয়াশার আড়ালে দূরের রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া মানুষের মতো এখন সে একা আবছা এবং বিষণ্ণ। মিলারকে দিয়ে টানা কুড়ি ওভার বল করিয়েছিল ব্র্যাডমান। স্ট্যামিনা, স্ট্রেংথ..স্ট্যামিনা, স্ট্রেংথ…কোথায় স্ট্যামিনা? বুকের মধ্যে কলকবজা একটা বিগড়েছে।
কোর্ট থেকে ওরা চলে গেছে। আনন্দ একা বসে, উঠতে ইচ্ছে করছে না। নেট অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তরুণ কি আজ আবার ব্যাট করেছে? পরপর দুদিন চোরের মতো সে পালিয়ে এল। কী লজ্জা, আনন্দ ব্যানার্জি কিনা দু ওভার বল করেই টায়ার্ড! হাসবে, ওরা হাসবে।
বেঞ্চ থেকে উঠে, মন্থর পায়ে আনন্দ বেরিয়ে এল। ঘুম পাচ্ছে তার। হাঁটুতে ব্যথা, কনুইয়ে, কবজিতে ব্যথা।
পালিয়ে যাচ্ছে আনন্দ!
আনন্দ মাথা নাড়ল। কিছু করার নেই, কিছুই করার নেই। বিয়াল্লিশ অল আউট। তার থেকেও লজ্জার এই ক্লান্তি। এই ব্যথা, হাঁপ ধরা। পরপর দুদিন পালিয়ে আসা। আমি জানি না আমি কী করব। জানি না, জানি না, জানি না।
রাতে আবার জ্বর এল। অরুণ তার কাছে এসে কপালে হাত রাখতেই চোখ খুলে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আনন্দ হাতটা চেপে ধরল।
মেজদা, আমি পালিয়ে এসেছি। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, হাত পায়ে ব্যথা করে। আমায় ডাক্তার দেখাও। আমায় ভাল করে দাও। দু ওভারও বল করতে পারি না।
ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এল আনন্দর কণ্ঠস্বর। দু চোখ বন্ধ করতে করতে ফিসফিসিয়ে বলল, তরুণ বলেছে হুক করে টেনিস ক্লাবে পাঠাবে। আমি ঠুকে দিয়েছিলাম বলটা, কিন্তু ওরা ভেবেছে পিচটা খারাপ তাই লাফিয়েছে। কেন আমার বল মারবে? আমি অপমান সহ্য করব না।..চ্যালেঞ্জ নোেব, মেরে সরাব…সোবার্স, চ্যাপেল, বয়কট, লয়েড সবাই সবাইকে…আমাকে শুধু ভাল করে দাও, ভাল করে দাও, ভাল করে দাও।
.
০৪.
ডাক্তারবাবু, ভাল হয়ে যাবে তো?
চশমাটা টেবিল থেকে তুলে চোখে লাগিয়ে ডাক্তার তাকালেন অরুণের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে। টাক ঢাকতে পিছনের চুল দিয়ে সযত্ন প্রয়াস রয়েছে ডাক্তারবাবুর মাথায়। বেঁটেখাটো মানুষটি এরকম আকুল কণ্ঠস্বর প্রতিদিন বহুবারই শুনে থাকেন বাড়িতে চেম্বারে বা হাসপাতালে। ব্যস্ত না হয়ে তিনি আড়চোখে একবার বাইরের দরজার পর্দাটার দিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। পর্দার ওপারে, রাস্তায় নেমে যাওয়া সিঁড়ির ধাপে একজোড়া পা। আনন্দ দাঁড়িয়ে। রাস্তায় রবারের বল খেলছে পাড়ার ছেলেরা তাই দেখছে।
খেলা যত না হচ্ছে তার থেকেও বেশি চিৎকার করছে ছেলেরা। আনন্দ চেষ্টা করছে ঘরের মধ্যে মেজদা আর ডাক্তারের কথাগুলো শুনতে, কিন্তু পারছে না।
ঘরের মধ্যে যাবে কি না ভাবল। বুক ঢিপঢিপ করছে। ডাক্তারবাবু কী বলবেন, কে জানে! যতক্ষণ পরীক্ষা করছিলেন বলের ফ্লাইট লক্ষ করার মতো সে সারাক্ষণ গম্ভীর নিরাসক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুই সে বুঝতে পারেনি, বা তিনি তাকে বুঝতে দেননি।
