পারবে মাধবী, পারবে। আমি তোমার সাফল্য কামনা করছি।
চলো যাই।
দুজনে ট্রেসহ প্লেটগুলো উঠিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে বেরিয়ে আসে। দেখতে পায় ম্যাথু আর নীলিমা ক্যান্টিনে ঢুকছে। খানিকটুকু দূরে বলে তন্ময় হাত নাড়ে, ওদিক থেকে ম্যাথু হাত ওঠায়। নীলিমা দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। মাধবী এসে বলে, নীলিমা চায় না যে তুমি আমার সঙ্গে মেশা।
অন্যের চাওয়া-না চাওয়ায় আমার কী এসে যায়। সোয়াসে যখন এসেছি, এখান থেকে মাকে একটা ফোন করব। তুমি একটু দাঁড়াবে?
চলো আমি একটা বুথে ঢুকে কমলার সঙ্গে কথা বলি।
একটা রিং বাজতেই সাবিহা বানু ফোন ওঠায়। তন্ময় উচ্ছ্বসিত হাসিতে বলে, মা তুমি বুঝি জানতে যে আজ তোমার সোনালি ঈগলটা ফোন করবে, তাই ফোনের কাছে বসে ছিলে?
ঠিক বলেছিস।
জানো মা, আমার ধারণা দেশে ফিরলে তুমি ঠিকই টের পাবে যে তোমার ছেলে অনেকখানি বদলে গেছে।
তাই? এ আমার কাছে খুশির খবর।
মাধবীর সঙ্গে মিশে আমি অনেক নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ওর কথা শুনলে মনে হয় আমার সামনে একটা পথ খুলে যাচ্ছে।
মাধবীর দেশে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করেছি তোর জন্য। দিল্লিতে ফটোগ্রাফির ওপর একটা ওয়ার্কশপ হবে। আমি তোর যাবার ব্যবস্থা করেছি। তুই ফিরলেই যেতে পারবি।
ওহ মা, সোনা মা আমার।
লাইন কেটে যায়। বুথ থেকে বেরিয়ে দেখতে পায় অন্য কোনো বুথে মাধবী নেই। ও চলে গেছে। কখন গেল? তন্ময় হেঁটে ঘরে ফেরে। কফি খেয়ে চিঠি লিখতে বসে।
প্রিয় অনিমা, বিকেলে দেখে এসেছি টেমস নদীর পাড়ের ঘরবাড়িগুলোর ওপর শেষ বিকেলের আলো। মনে হয়েছিল কখনো কখনো সূর্য বুঝি অতিরিক্ত কিছু উজাড় করে দেয়। তখন নিজের অনেক কিছু খুঁজে পাওয়া যায়। আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমেছিল টেমসের ওপরে। সেই পটভূমিতে বিগবেন, লন্ডন, টাওয়ার, সেন্টপল চার্চ ছায়ানৃত্যের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। দেখেছিলাম প্রাচীন লন্ডনের ছবি। এক সময় ভবনগুলো কালো হতে থাকে। এমন অন্ধকার রাতই তো তুমি আর আমি দেখেছিলাম ফুলমসি গ্রামে। কী অপরূপ রাত ছিল! ভাবলে আমি রোমাঞ্চিত হই অনিমা। এখনো এই লন্ডন শহরে বসে সেইসব রাত আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগে।
জানো, কয়েক দিন আগে এক বাদ্যযন্ত্রের দোকানে গিয়েছিলাম। বেশ ভিড় ছিল। প্রায় গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে হাঁটা বলতে পারো। ওয়েস্ট এন্ডের পুরনো পাথর বাঁধানো রাস্তায় হাঁটতে বেশ লাগছিল। এমন ভিড় দেখলে আমার সদরঘাট আর ফার্মগেটের ভিড়ের কথা মনে হয়। এমন স্মৃতি লালন করতে করতে নজরে আসে দোকানটা। দোকানিকে দেখে মনে হচ্ছিল মঙ্গোলীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর হবে। না হলে চীনা তো হবেই। দোকানে টাঙানো উইন্ড চাইমটায় নাড়া দিয়ে টুংটাং শব্দ করি, শব্দ শুনে দোকানি জ্ব তুলে তাকিয়ে চোখ নামায় পত্রিকায়। দোকানের বৈচিত্র্যপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র দেখে আমি বিস্ময়ে হাঁ করে। দাঁড়িয়েছিলাম। দোকানি জিজ্ঞেস করল, আপনাকে কোনটা দেখাব? আমি নিজেই আগে একটু দেখেনি বলে দু-পা এগুলাম। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে দেখলাম গাছের ডালের মতো লম্বা একটা জিনিস। বড় একটা। বাঁশের ঝুড়িতে রাখা। তিন ইঞ্চি ডায়ামিটারে প্রায় দেড় ফুট লম্বা কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র দেখে আমার মুগ্ধতা কাটে না। একটা হাতে নিয়ে দেখলাম খুব হালকা, দেশে শুকনো ঝিঙ্গের যে আদল পেতাম সে অনুভূতি মনে আসে অনিমা, শুধু এই বাদ্যযন্ত্রের আকারটা ভিন্ন। দোকানি আমার বিস্ময় খেয়াল করে কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে আসে। বাদ্যযন্ত্রটা কীভাবে বাজাতে হয় তা দেখায়। প্রথমে মাথাটা নিচে, পরে উপরের দিকে নিয়ে বাজিয়ে শোনায়। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম, মনে হয়েছিল পানির স্রোতের মতো নেমে গেল একরাশি বাহারি পুঁতি, যেন আমার ক্যামেরায় তোলা সেই পাহাড়ি মেয়েটিকে আমি এই বাদ্যের সুরের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। এই মাত্র ছিড়ে গেছে তার রঙিন পুঁতির মালা, যা সে কোনো এক বিকেলে উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে গেঁথেছিল। তার পুঁতিগুলো ঝমঝম শব্দে নেমে গেল জলের স্রোতে। আমি নিজেও দোকানির মতো করে বাদ্যযন্ত্রটি বাজালাম। আবার সেই মনোমুগ্ধকর ধ্বনি। আমি তোমার জন্য বাদ্যযন্ত্রটি কিনেছি অনিমা। আমরা দুজনে চাদনি রাতে যন্ত্রটি বাজাব।
এই বাজনার মগ্নতার রেশ যেন কেটে না যায় সেজন্য আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি। মানুষের ভিড়ে যতই হাঁটি হাতের ওঠানামায় সুর ওঠে। আশপাশের লোকেরা খুশি হয়ে মাথা নাড়ে। কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্রটি হাতে নিয়ে নেড়েচড়ে দেখে। আর আমার মুগ্ধতা তো কাটেই না।
এ শহরের ফুটপাথ ধরে হাটতে ভালো লাগে অনিমা। তোমাকে নিয়ে এই শহরে হানিমুন করতে আসব। তোমার শুনে ভালো লাগবে যে আমার স্কুলে যাওয়ার পথে একটি পার্ক পড়ে, সেই পার্কের মাঝখানে মহাত্মা গান্ধীর কষ্টিপাথরের মূর্তি আছে–পদ্মাসনের মতো হাঁটু ভাঁজ করা, পিঠে চাদর ফেলা। একদিন মাধবীকে মূর্তিটি দেখাতে নিয়ে এসেছিলাম। গান্ধীজির শুকনো শরীর–ঝরা পাতার সময়ে, বাতাসে, রোদে, বৃষ্টিতে আর কখনো হালকা তুষারপাতের মধ্যে নির্বিকার বসে থাকেন, যেমনি করে নিজের আদর্শে স্থির ছিলেন শেষ পর্যন্ত। এখানে নানা রঙের গোলাপ ফোটে। ভীষণ ভালো লাগে–কত গাছ, কত বৈচিত্র্য–মন ভরে যায়। লন্ডনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সবুজের মিশেল আমাকে এই শহরের প্রেমে পড়িয়েছে। গান্ধীর মূর্তির অনেক ছবি তুলেছি, আর ঘরে ফিরতে ফিরলেভেবেছি এদের উন্নয়নের সঙ্গে গাছ কাটার সম্পর্ক নেই–খাল কাটার সঙ্গে সঙ্গে গাছ কেটে ফেলার রাজনীতি ওরা করে না কিংবা গাছ কেটে বিক্রি করে কালো টাকা বানায় না। নিজের দেশের জন্য খুব মায়া হয় অনিমা, এত ব্যর্থতা কেন আমাদের! আজ এ পর্যন্ত। তোমার হলুদ গোলাপ তন্ময়।
