দুদিন পরে মাধবীকে গান্ধীজির মূর্তিটি দেখাতে নিয়ে যায় তন্ময়। ওই পার্কে বিশাল বিশাল কিছু গাছ আছে, যার ছায়ায় কাঠের বেঞ্চও পাতা আছে। ইচ্ছে করলে সময় কাটানো যায়, চিৎ হয়ে শুয়ে গাছের ডালপালা দেখা যায়। পার্কে একটি ছোট খাবার দোকান আছে। সেখানেও আড্ডা মারা যায়, ফুলের রঙ আর বিন্যাসের কারুকাজ তো সীমাহীন, কোনটা ফেলে কোনটার দিকে তাকাবে! মাধবী চারদিকে তাকিয়ে বলে, চমৎকার জায়গায় এনেছ। আমি পার্কটা খেয়ালই করিনি। এখানকার এত কিছুর পরেও আমার একটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে।
কোনটা! আমি এত এসেও আলাদা করে কিছু দেখতে পাইনি।
তাহলে বোঝ, আমার চোখ তিনটা।
সেটা আমি তোমার কথা শুনেই বুঝতে পারি। তুমি যদি বলো যে তোমার চোখ দশটা তাও আমি মেনে নেব। এখন বলো আলাদা কী বৈশিষ্ট্য তুমি পেলে?
তাকিয়ে দেখো ছোট ছোট নানা রঙের ঘাসফুল, আর লতাগুল্ম পার্কটাকে কেমন উজ্জ্বল করে রেখেছে।
ঠিক বলেছ। আমিও দেখেছি, কিন্তু এভাবে ভাবিনি। কী খাবে বলো, আজ আমি তোমাকে খাওয়াব।
এক শর্তে খেতে রাজি আছি।
বলে ফেল।
আমার যতক্ষণ ইচ্ছে হবে ততক্ষণ এখানে বসে থাকতে হবে।
রাজি।
দুজনে রেস্তোরাঁয় ঢোকে। স্যান্ডউইচ আর কফি নেয়।
তন্ময় বিস্ময়ে বলে, শুধু এই?
আপাতত এই, ইচ্ছে হলে পরে নেব।
স্যান্ডউইচ শেষ করার আগেই একজন আফ্রিকান মহিলা এসে ওদের টেবিলে বসার পারমিশন চায়। দুজনে সায় দেয়। মহিলার নাম জুলিয়ানা। বেশ হাসি-খুশি। হো-হো করে হাসতে পারে যখন-তখন। তিনজনের আড্ডা ভালোই জমে ওঠে তবে আলোচনা শেষ পর্যন্ত মাধবী ও জুলিয়ানার জীবন ধারণায় গিয়ে গড়ায়। মাধবী এক পর্যায়ে বলে, আমার মা চেয়েছিল আমার বিয়েটা যেন টিকে যায়। কিন্তু আমি মাকে বোঝাতে পারিনি যে বিয়ে টিকে গেলে আমার সুখী হওয়ার আশাটি হবে শূন্য। কারণ সারাক্ষণ মাথা নত করার শেখার ভেতরে ঢুকে থাকার ব্যবস্থাটি একদমই সুখের নয়। ম্যারেজ ওয়ার্ক করলে কি ভালোবাসা ওয়ার্ক করে?
জুলিয়ানা তীব্র ভাষায় বলে, একদমই না।
জানো আমার স্বল্প দিনের বিবাহিত জীবনে আমি দেখেছি ভালোবাসা ও বিবাহিত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই।
জুলিয়ানা হাসতে হাসতে বলে, হোয়েন দ্য মিউজিক ইজ ওভার টার্ন অব দ্য লাইট। ওয়ান নিডস টু নো হোয়েন টু টার্ন ইট অফ।
ইয়েস, ঠিক বলেছ। মাধবী জুলিয়ানাকে সায় দিয়ে বলে, তোমার আর আমার অভিজ্ঞতা একই রকম। এশিয়া বা আফ্রিকা, মহাদেশ ভিন্ন হলেও কিছু যায়-আসে না–নারীর জন্য অবস্থা একই রকম। তন্ময় কিছু বলছ না যে?
তন্ময় হেসে বলে, আমি তোমাদের সঙ্গে একমত। এখন বিষয়টি আমি গভীরভাবে বুঝতে পারছি। আমার অভিজ্ঞতাও এমন যে দেখেছি নারীকে প্রেমের সময় যত তোয়াজ করা হয়, বিয়ের পরে তা পাল্টে যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। বিয়ের পরে সে হয়ে যায় সাবঅর্ডিনেট। তোমরা যা বলছ তা শুনে বুঝতে পারছি, সত্যি বলার সময় এসেছে।
ব্রেভা তন্ময়।
তারপর গালগল্পের প্রসঙ্গ পাল্টে যায়–কত বিচিত্র বিষয়–এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ-আমেরিকাসহ প্রতিটি মহাদেশ ছুঁয়ে যায়। সঙ্গে কফি, আইসক্রিম এবং স্যান্ডউইচ ও পুডিং। কেমন করে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় ওরা হিসাব রাখে না। অনেক রাতে ঘরে ফেরে তন্ময়।
দেশে ফেরার সময় হয়েছে তন্ময়ের। ওর গোছগাছ শেষ। আগের রাতে মাধবী ওকে ডিনার খাওয়াতে নিয়ে যায়। বিদায় নেবার আগে মাধবী বলে, তন্ময় দেশে গিয়ে যদি তুমি দেখো যে অনিমা তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে কিংবা ওর বাবা ওকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে, তাহলে তুমি কিন্তু লন্ডনে ফিরে আসবে–তুমি যদি চাও আমি বাংলাদেশেও যেতে পারি, তোমাদের নদীভরা দেশটা আমার খুবই পছন্দ–আমি আমার বাকি জীবনটা ওখানে কাটিয়ে দিতে রাজি আছি। আমি তোমার। জন্য অপেক্ষায় থাকব তন্ময়।
তন্ময় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলে, অপেক্ষা!
হ্যাঁ, অপেক্ষা। তোমার জন্য আমার অপেক্ষা।
মাধবীর চোখে জল টলটল করে। তন্ময় হাত বাড়িয়ে সে জল মুছিয়ে দেয়।
০৫. ঢাকায় নেমে বুক ভরে শ্বাস নেয় তন্ময়
ঢাকায় নেমে বুক ভরে শ্বাস নেয় তন্ময়। ইমিগ্রেশন পার হলে দূর থেকে দেখতে পায় মার্কে। সঙ্গে সখিনা আছে। আহ, অনিমা এখানে থাকলে ছবিটা পূর্ণ হয়ে যেত। আকস্মিকভাবে ওর মন খারাপ হয়। বেরিয়ে এলে সাবিহা বানু ওকে জড়িয়ে ধরে।
মাগো, আজ রাতে তোমার সঙ্গে আমি ঘুমুব। তোমার গন্ধ না নিয়ে আমি ঘুমুতে পারব না।
সত্যি?
একদম সত্যি।
মাকে না বলে পালাবি না তো?
তন্ময় মৃদু হাসে। সাবিহা বানু বলে, পালাতে হবে না। সব ব্যবস্থা ঠিক। টুকটাক কিছু কাজ বাকি আছে।
দিল্লিতে ওয়ার্কশপ?
মাত্র পনেরো দিনের। আমি চাই তুই ঘুরে আয়।
যদি না যাই? অনিমার সঙ্গে দেখা করব না?
মাত্র পনেরো দিন।
ঠিক আছে মা, ঠিক আছে। এই তুই কেমন আছিস সখিনা?
ও ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে বলে, আপনি আমারে এতক্ষণে দেখলেন? আমি কতক্ষণ আপনের দিকে চেয়ে আছি।
আমি তো তোর মাথায় হাত রেখেছি। মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম, বোকা মেয়ে। তোর জন্য একটা সুন্দর পুতুল এনেছি। দেখলে তোর কান্না থেমে যাবে। পাগল মেয়ে, আয়।
পাঁচ দিনের মাথায় ওকে আবার ঢাকা ছাড়তে হলো। আধঘণ্টার মধ্যে এসে পৌঁছাল কলকাতায়।
ট্রলিতে স্যুটকেস ঠেলে বিমানবন্দরের বাইরে এসে দাঁড়াতেই গরম বাতাসের হলকা এসে লাগে চোখে-মুখে–আশপাশে মানুষের ঠেলাঠেলি কিন্তু কোথাও তন্ময়ের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে কাউকে দেখতে পায় না। দময়ন্তীর আসার কথা আছে–আসেনি–হয়তো দেরি হবে আসতে–বেশ কিছুক্ষণ, ট্রলিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে–তারপর ভাবে, একটা ফোন করে দেখা যাক ওর কী হলো–ট্রলি ঠেলে ফোনের কাউন্টারে এগিয়ে যায়, লাইনে দাঁড়াতে হয়–গালের মধ্যে পান ঢুকিয়ে ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে লোকেরা–নিজেকে শান্ত করে তন্ময় হায় বাঙালি বলে।
