ভোরে স্কুলেই মাধবীর সঙ্গে দেখা হয়। মাধবী দূর থেকে হাত নাড়ে। সামনাসামনি কথা হয় না। ক্লাস শেষের পরে বলে, চলো সোয়াসের ক্যান্টিনে গিয়ে লাঞ্চ করব। আমার চিঠি পেয়েছ?
পেয়েছি। দারুণ লিখেছ। এমন ল্যান্ডস্কেপের ছবি তুলতে পারলে ভালো লাগত।
দারুণ মিস করেছ। তবে ক্যামব্রিজে ঘোরা আমার ভীষণ আনন্দের হয়েছে। ক্যামব্রিজের মাঠটা দারুণ সুন্দর। নদীর নাম ক্যাম। ওর ওপরে যে ব্রিজটা আছে সেজন্য নাম ক্যামব্রিজ। সুন্দর না?
ভীষণ সুন্দর।
তুমি যদি যেতে চাও তাহলে তোমাকে নিয়ে আমি আবার যাব।
তন্ময় চুপ করে থাকে। আকস্মিকভাবে ওর সব আগ্রহ উবে যায়। ক্যান্টিনের ভেতরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় জমে উঠেছে। দুজনে খুঁজেপেতে দুটো চেয়ার খালি পায়। মাধবী কুট্টি তন্ময়ের পরিবর্তন খেয়াল না করেই বলতে থাকে, ক্যামব্রিজের কুইন্স কিংস, ট্রিনিটি, কপার্স, ক্রিস্টি কলেজগুলো দেখেছি। স্থাপত্য শিল্প আমাকে মুগ্ধ করেছে। কত শত বছর আগে মানুষ কী করে যে ওসব নির্মাণ করেছে ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারি না।
চলো খাবার নিয়ে আসি।
চলো। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় মাধবী। তন্ময়ের মনে হয় মাধবী নিজের মধ্যে বেশ মগ্ন হয়ে আছে। পরক্ষণে ও নিজেকে সোজা করে নেয়, জীবনের প্রতি মাধবীর দৃষ্টিভঙ্গিই তো এমন। ও সময়কে অতিক্রম করবে। কোনো সময় ওকে কাবু করতে পারবে না–এই মাধবী, এমনই মাধবী কুট্টি। খাবার নিয়ে এসে দুজনে আবার মুখোমুখি হয়। মাধবী নিজের কথা বলার জন্য খাবারসহ চামচটা মুখের কাছে উঠিয়ে আবার প্লেটের ওপর নামিয়ে রাখে। বলে, একটা প্রশ্ন নিয়ে আমি নিজের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি তন্ময়।
তন্ময় ওর উত্তর শোনার জন্য তাকিয়ে থাকে। প্রশ্ন করে না। মাধবী এক চামচ ভাত মুখে পোরে। বলে, একদিন সন্ধ্যাবেলা কিংস কলেজে গিয়েছিলাম। কমলা আমাকে কলেজের চ্যাপেলে প্রার্থনা সংগীত শোনার জন্য নিয়ে ঢুকল। কণ্ঠস্বর আর অর্গানের যৌথ শব্দ অপূর্ব ধ্বনির সৃষ্টি করে চ্যাপেলের ভেতরে। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কত বছর আগে তৈরি হয়েছে ওই চ্যাপেল কে জানে। কিন্তু পুরনো জিনিসের অনাধুনিকতা। কোথাও পেলাম না। আমরা দুজনে দেড় ঘণ্টা বসে গান শুনলাম। লম্বা সাদা পোশাক পরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বয়সী ছেলেরা গান গাইছে। তো শ’খানেকের মতো। কণ্ঠের ওঠানামায় সুরের রেশ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আমার মনে হলো সময়টি আমাকে নিজেকে অতিক্রম করতে সাহায্য করছে। আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পাই চ্যাপেলের দেয়ালজুড়ে বিশাল জানালাগুলোর রঙিন কাচে যিশুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি আঁকা। রঙের গাঢ়তা লক্ষণীয়। যেমন গাঢ় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, কালো আর সাদা। এ অল্প কয়েকটি রঙের ব্যবহারে যে ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি হয়েছে তার তুলনা হয় না। মনে হচ্ছিল প্রতিটি ছবির দৃশ্যগুলো এই কিছুক্ষণ আগে ঘটেছে, কিংবা হয়তো কিছুক্ষণ পরে ঘটবে। আলো, রঙ, সুর এবং বাদ্যের মূর্ঘনায় কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যাচ্ছিল টের পাইনি। চ্যাপেলের ভেতরে বসার জন্য সারি সারি বেঞ্চের ওপর যে গানগুলো গাওয়া হচ্ছিল তার একটা করে বই রাখা ছিল। গানের আবেশ কেটে যেতে একটুখানি ধাক্কা খেলাম। বইটি উঠিয়ে নিয়ে গানের বাণীতে চোখ পড়তেই মনটা বিষাদে ভরে গেল। রক্ষণশীলতায় ভরপুর গানের বাণী। তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে পারো তন্ময়, রক্ষণশীলতার সংজ্ঞা কী? তুমি বলতে পারো, তোমার ধর্মীয় বিশ্বাস আর একজনের কাছে রক্ষণশীল হবে কেন? এসব নিয়ে তর্কবিতর্ক হতে পারে। কিন্তু আমার খারাপ লেগেছে অন্য বিষয়ে।
এই বলে মাধবী কুট্টি থামে। দু-চামচ ভাত খায়। ওর চেহারায় ভিন্ন। আলো খেলা করে। মাধবীর এমন চেহারা তন্ময় আগে দেখেনি। ও তখন নিজের থেকেই বলে, বাকিটুকু বলো।
এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে ক্যামব্রিজে পড়া ছেলেমেয়েরা সন্ধেবেলায় রাজার কাছে মাথা নত করার কথা সুর করে বলে বেড়ায়। মধ্যযুগীয় ধর্মকে বদলানোর সাহস এখন পর্যন্ত কারো হয়নি। সে রাতে রাইসনে ফিরে পরদিন আমি ট্রেনে করে লন্ডনে ফিরে আসি।
বেশ এক্সসাইটিং অভিজ্ঞতা।
তোমার তাই মনে হচ্ছে?
অবশ্যই হচ্ছে। আমিও তোমার মতো ভাবছি। নিজের দেশেও ধর্মের অপব্যাখ্যা শুনতে পাই ধর্মান্ধদের কাছে। ওরা প্রয়োজনে ধর্মকে হাতিয়ার করে।
এ রাজনীতি আমার দেশেও আছে নয়। এসো ভাত শেষ করি।
খাওয়া শেষ হলে তন্ময় বলে, আমি ঠিক করেছি কোর্সটা শেষ করব না। দেশে ফিরে যাব।
ভ্রু কুঁচকে মাধবী চেঁচিয়ে বলে, বাজে কথা বলছ কেন?
বাজে কথা নয় মাধবী। আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।
আমি চাই, আমার জন্য তুমি কোর্সটা শেষ করবে। এটা আমার দাবি।
মাধবী বাম হাত দিয়ে তন্ময়ের বাম হাতটা চেপে ধরে।
আজ রাতে আমি অনিমাকে চিঠি লিখব।
লেখো, আমার কথাও লিখো কিন্তু।
এখন মাকে ফোন করলে তোমার কথা আসে, অনিমাকে চিঠি লিখলে তোমার কথা আসে।
দারুণ! মাধবী খিলখিল হাসিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলে আশপাশের টেবিল থেকে অন্যরা ওদের দিকে তাকায়। তন্ময় মগ্ন কণ্ঠে বলে, তুমি আমায় অনেকটা বদলে দিয়েছ মাধবী কুট্টি।
মাধবী ওর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে প্লেটের শেষ ভাতটুকু চামচে তুলে মুখে পোরে। ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে বলে, জানো দেশে একবার এক জ্যোতিষী আমার হাত দেখে চমকে উঠেছিল। বলেছিল, ত্রিভুজ মানে সুখ আর চতুর্ভুজ মানে দুঃখ। তোমার হাতে চতুর্ভুজ বেশি। আমি তার কথায় একটুও ঘাবড়াইনি। তবে ত্রিভুজগুলো জোড়া লেগে সব চতুর্ভুজ হয়েছে। কী পাগলামি দেখ তো! নিয়তি মানি না আমি। নিয়তি যতই আমার সামনে দেয়াল ওঠাবে আমি আমার সাহসের কুড়াল দিয়ে সেই দেয়াল ভাঙব। পারব না?
