নীলিমা খোঁচা দিয়ে বলে, পুরুষ মানুষ যে কী চিজ তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই।
ঢালাও মন্তব্য করো না নীলিমা। নইলে তুমি ম্যাথুর কাছে আবার আসতে না।
আসিনি, পায়ে ধরে এনেছে।
তন্ময় হো-হো করে হাসে। বলে, দেবীদের তো পায়ে ধরতেই হয়। যাকগে, মাধবী কোথায় উধাও হলো বলো তো?
ও তো ক্যামব্রিজে গেছে। ওর এক বান্ধবী থাকে ক্যামব্রিজের কাছে কোনো একটা জায়গায়, আমি ঠিক জানি না। আজকালের মধ্যে ফিরবে।
তন্ময় মনে মনে চুপসে যায়। মাধবী ওকে না বলে ক্যামব্রিজে চলে গেল! যাকগে, যেতেই তো পারে। ওকে বলে যেতে হবে কেন মাধবীর? ও তো অনেকবারই বলেছে, আমি কোথাও নেই। আমি বলি আমি আমিই। কারো নই। কোথাও নেই। এভাবেই আছি, এভাবেই থাকব। নিজের সঙ্গেই আমার নিজের বোঝাপড়া। নিজের সাথে ঝগড়া এবং বাকি যা আছে তার সবটুকু। একদমই নিজের ভেতর ঢুকে যাওয়া। অথচ যখন বাইরে তাকাই তখন পৃথিবীটাকে অপূর্ব লাগে, তখন নিজেকে সবটুকু আনন্দ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে আমার এক মুহূর্ত দেরি হয় না। এখন আমি সেকেন্ড সিঙ্গল। দ্বিতীয় বার একা হয়ে যাওয়া এই জীবনটা নিয়ে আমার দুঃখ নেই।
নীলিমা খোঁচা দিয়ে বলে, কী ভাবছ? মাধবীর কথা?
যদি ভাবি, তাহলে কি তুমি জেলাস হবে? ওই দেখো কাস্টমার। ভারি সুন্দর মেয়ে দুটো।
চোখ লাগিও না।
তন্ময় উত্তর দেয়ার আগেই মেয়ে দুটো টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ায়। লকেটগুলো দেখতে দেখতে উচ্ছ্বসিত হয়। দুজনে অনেকক্ষণ ধরে গোটা দশেক লকেট পছন্দ করে এবং কিনে ফেলে। তন্ময় খুশি হয়ে বলে, তুমি দেখছি লাকি দোকানদার।
ম্যাথু খুশিতে বাগবাগ হয়ে যাবে।
ওই দেখো আরো দুজন আসছে। তোমার ভাগ্য যে এত ভালো ম্যাথু কি তা জানে!
নীলিমা ওর কথায় কান দেয় না। খদ্দেরের দিকে নজর দেয়, কত কিছু যে যত্ন করে দেখায় তার ঠিক নেই। কে বলবে নীলিমা মাত্র ক’মাস ম্যাথুর এই দোকানটা চেনে। ওদের কথা বলার ফাঁকে তন্ময় বেরিয়ে আসে। মেলার এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশ্যহীন, গন্তব্যহীনভাবে। সন্ধ্যার পরে একা একা নান্দোসে বসে ঝাল চিকেন খায়। আজ সেই পর্তুগিজ ছেলেটি নেই। মন খারাপ হয়ে যায়। ঝালে চোখে জল এলে কেউ এক টুকরো মিষ্টি এগিয়ে দেয় না। ঘরে ফিরে লেটার বক্স চেক করে মাধবীর চিঠি পায়। দ্রুত তালা খুলে আলো জ্বালায়। চমৎকার একটি খাম এবং চমৎকার কাগজ ব্যবহার করেছে ও। সুগন্ধি আসছে কাগজ থেকে। লিখেছে, প্রিয় তন্ময়, রাইসন থেকে তোমাকে লিখছি। আমি জানি চিঠি পেতে তুমি খুব ভালোবাসো। কিংসক্রস স্টেশন থেকে একটা স্টেশন পরেই রাইসন। এখানে আমার বান্ধবী কমলা থাকে। আমার বিয়ের আগেই ওর বিয়ে হয়েছিল একজন ব্রিটিশ ডাক্তারের সঙ্গে। তারপর থেকেই কমলা রাইসনে। ওদের বাড়িটা ছোট, বেশ নিরাভরণ এবং নিজের মতো করে ছিমছাম করে সাজানো। বাড়িতে বাড়তি কোনো বাহুল্য নয়। মনে হয়েছিল বাড়িটা বুঝি আমারই, আমার বাড়ি হলে আমি বোধহয় এভাবেই রাখতাম। এই ধারণা পেয়েছি বলেই দুদিন থাকব বলে এসে সাতদিন পার করে দিচ্ছি। কমলার স্বামী দিলীপ অফিসের কাজে ফ্রান্স গেছে। দু’বন্ধুর সময় দারুণ কাটছে। দুদিন আগে আমি আর কমলা একটি বুনো আঠে হাঁটতে গিয়েছিলাম। খুব মজা পেয়েছি সেই মাঠে হেঁটে। আমাদের দেশের মতো সাধারণ মাঠ নয়। মাঠটি পাহাড়ের উপরে, ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে যে মালভূমির কথা পড়েছিলাম, এটা সেই মালভূমি। এই মাঠের যে বৈশিষ্ট্য আমার নজর কেড়েছে সেটা একটি কাঠের বেঞ্চ। ছোট পাহাড়, উঠতে তেমন কষ্ট হয় না। মাঠের শেষ প্রান্তে যেখানে পাহাড় খাড়া হয়ে নেমে গেছে ঠিক সেখানে দিগন্ত দেখার জন্য বেঞ্চটা রাখা। ওই বেঞ্চটা তোমার মতো কাউকে নিয়ে বসার জন্য তন্ময়, অবশ্য কমলার সঙ্গে বসা যায় না, তা নয়, কিন্তু তারপরও বুকের মধ্যে ব্যথা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার সঙ্গে কমলাও স্বীকার করল যে, ভালোবাসার জন্য যে কারো কাছেই নতজানু হওয়া যায়, যদি সে সম্পর্কে ব্যক্তিত্বের অবমূল্যায়ন না হয়। আমাদের ছেলেরা জানে না ছেড়ে দেয়া পাখির ভালোবাসার গভীরতা বন্দি পাখির আর্তনাদে কখনো পাওয়া যায় না। খাঁচার পাখিই পালানোর সুযোগ খোঁজে এবং সুযোগ পেলে পালিয়ে যায়। ভেবে দেখো পালানোর কনসেপ্ট স্বাধীন পাখির নেই। পরিস্থিতি বিরূপ হলে ও অনায়াসে ঘোষণা দিয়ে সরে যেতে পারে। কমলা আমাকে বলল, দূরের দিকে তাকিয়ে দেখ। সামনের ঘরবাড়ি ফোঁটা ফোঁটা জলের মতো দিগন্তের কাছে জড়ো হয়েছে। ভাবলাম ফোঁটা ফোঁটা জল কি সমুদ্র হয়, নাকি হাওয়ায় উড়ে যায়? সামনে বনের গাছগুলো দিগন্ত পর্যন্ত সবুজ করে রেখেছে। নিচে যত দূর চোখ যায় দেখতে পাচ্ছি শর্ষে ক্ষেতের সোনালি আভা, আমাকে অভিভূত করে এমন অপরূপ দৃশ্য ভুলে যেতে চাই ক্ষণিকের দুঃখ, দুঃখ যেন আমাকে গ্রাস না করে তার প্রতিজ্ঞা করি। এই অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ কে এঁকে রেখেছে। আমার কোনো প্রিয় শিল্পী কি? তন্ময় এখানেই শেষ করছি। বারবারই মনে হচ্ছে ওই বেঞ্চে তোমার সঙ্গে বসে যদি ল্যান্ডস্কেপটা দেখতে পেতাম! তন্ময় এভাবে নতুন দুঃখ তৈরি হয়। ভালো আছি। রাতে আমরা দুজনে টুনা ফিশের স্যান্ডউইচ খাব। সঙ্গে সালাদ আর রাইস পুডিং। ভালো থেকো। মাধবী।
চিঠিটা পড়ে তন্ময়ের মন খারাপ হয়ে যায়। ওর আবার মনে হয়। কোর্সটা শেষ না করেই চলে যাওয়া উচিত। ওর আর এখানে ভালো লাগছে না। অনিমাকে একটা চিঠি লিখবে বলে কাগজ নিয়ে বসে। কিন্তু লেখা হয় না, আঁকিবুকি কাটে, অনিমার মুখ আঁকে, নিজেকেও আঁকে এবং লন্ডনের বিভিন্ন রাস্তা, টিউব স্টেশনের নামে লিখে ইতি টানে। নিজের খোলা কতগুলো ছবি দিয়ে খামের মুখ বন্ধ করে। এখন পর্যন্ত অনিমার কোনো চিঠি পায়নি। ওর চিঠি কি অনিমা একটাও পায় না? এত কিছু ভাবনার মধ্যেও ওর চমৎকার ঘুম আসে এবং অনিমার হাত ধরে একটি শর্ষে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এমন স্বপ্ন দেখে।
