তবে মাঝে মাঝে খুব ভেঙে পড়ি। ভেতরটা ভেঙে গুড়িয়ে যায়। বিশেষ করে যখন বৃষ্টি পড়ে। বুকের ভেতর উথালপাথাল করে, পাগল পাগল ভাব তড়পায়। এত জল ধারণ করার শক্তি কোথায় পাব বলো!
মাঝে মাঝে ভাবি কোথায় বিলং করি আমি। কখনো নিজেকে আন্তর্জাতিক ভাবি। আবার যখন দেখি নিজের দেশের সমস্যা তখন ক্রোধ জন্মায়, চিৎকার করি এই মুহূর্তে ভিন্ন দেশে বসবাস করার হীনম্মন্যতায় কুঁকড়ে আছি। ভাবি, কী আমার অধিকার এই দেশের মাটির কাছে! তখন মানসিক পীড়নে বিপর্যস্ত হয়ে ভাবি, আমি কোথাও বুঝি বিলং করি না। সুতো কাটা ঘুড়ির মতো হুস করে উড়ে যাই। উড়তে থাকি, নিজের প্রতি প্রবল মমতায় নিজের অবস্থানকে শক্ত করতে চাই। এই যে অজানা গন্তব্যে যাওয়ার বাসনা, সে এক প্রবল আনন্দ হয়ে টানে। মা তুমি ছকবাঁধা জীবনের ভেতরে থেকে কখনো এই গতির দেখা পাওনি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ছেলে তন্ময় আমার ভীষণ ভালো বন্ধু। মা, ওকে পেয়ে আমি নিজের অনেকটুকু সামলে নিয়েছি। তবে আমি এটাও জানি যে, ও আমার জীবনের শেষ কথা নয়। ওকে নিয়ে এই আনন্দদায়ক সময়ও আমার সময়ের ক্রান্তিকাল সময়কে হেয় করার অভিযান। যদি এই সময় আমার জীবন থেকে ঝরে যায় তবে দুঃখ পাব না মা। আমি নিজেকে অতিক্রম করতে শিখেছি।
আমার জন্য একটুও ভেব না।
তোমার মেয়ে, কার্টরাইট গার্ডেন, লন্ডন, ২১ আগস্ট।
তন্ময় চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দেয়। মাধবীকে মোবাইলে ফোন করে পেল না। ফোনটা প্রতিবারই বেজে বেজে থেমে গেল। রাতে ঠিকমতো ঘুমুতে পারল না তন্ময়। বারবার ঘুম ভেঙে গেল ওর।
পরদিন মাধবীকে কোথাও দেখতে পেল না, পরদিনও না।
বিকেলে মাকে ফোন করল তন্ময়।
মাগো মনে হচ্ছিল কত দিন যে তোমার সঙ্গে কথা বলিনি। তুমি কেমন আছ মা?
সাবিহা বানু ওর কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
তুই কেমন আছিস সোনা?
খুব ভালো আছি মা।
তোর বাবার বন্ধু সালামত মিয়ার সঙ্গে দেখা করেছিলি?
করেছিলাম মা। তবে ওদের জন্য আমার দুঃখই হয়েছে। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও ওদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি মা। এখন থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এ দেশে এসে ওরা একই সময়ের গণ্ডিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখেশুনে মনে হয়েছে ওদের রয়েছে কালচারাল শক। ভাষার দূরত্বসহ আরো অনেক কিছু ওদের গণ্ডিবদ্ধ করে রেখেছে।
তোর এসব অবজারভেশন ডায়রিতে লিখে রাখিস বাবা। তোর সঙ্গে কারো বন্ধুত্ব হয়নি?
তোমাকে তো ম্যাথুর কথা বলেছিলাম। ইদানীং মাধবী কুট্টি নামে ভারতের কেরালার একটি মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। ও আমার সঙ্গেই ফটোগ্রাফির কোর্স করছে।
ও আচ্ছা। সাবিহা বানুর কণ্ঠ দমে যায়।
তন্ময় সোৎসাহে বলে, জানো মা ও না একটা দারুণ মেয়ে। দেশে পরিবারের সবার কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার পেয়ে ঘর ছেড়েছিল, পরে দেশও। বলে, আর কোনো দিন দেশে ফিরবে না।
এসব সাময়িক কথা বাবা, ঠিকই দেশে ফিরবে। নিজের দেশে না ফিরলেও দেশের কথা মনে রাখতে হবে। নইলে তো ও শেকড়হীন হয়ে যাবে।
হো-হো করে হেসে তন্ময় বলে, তোমার কাছ থেকে এসব কথা শুনলে মাধবী বলবে, তুমি একদম ওর মায়ের মতো কথা বলছ। অর্থাৎ তোমরা একই জেনারেশনের মানুষ।
তা তো হবোই। তবে একই জেনারেশনের সব মানুষ কিন্তু একই সুরে কথা বলে না। তুই নিজে কি মাধবীর মতো ভাবিস?
সবটা ওর মতো ভাবি না। তবে আমার উত্তর শুনে ও বলবে তুমি পুরুষ, তোমার সঙ্গে আমার অনেক পার্থক্য। তোমরা সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষ।
এটা ও ঠিকই বলে।
মায়ের কথা শুনে আবার হো-হো করে হাসে তন্ময়। বলে, তুমি মাধবীর দলে চলে গেলে মা।
সাবিহা বানু হেসে বলে, কোনো কোনো জায়গায় নারীদের সবার ভাষা একরকম হয়ে যায়। ব্রিটিশদের তোর কেমন লাগছে রে?
ওদের আমার অদ্ভুত লাগে মা। ওদের আছে শুধুই বেঁচে থাকা। মনে হয় ওরা বুঝি শুধুই বেঁচে থাকার জন্য আছে। কেন বাঁচতে হবে এ প্রশ্ন ওদের নেই। জীবনদর্শনহীন ক্রমাগত ছুটতে থাকা চারপাশের ব্রিটিশদের দেখে আমার করুণাই হয়।
হায়রে ছেলে, তোর এমন অভিজ্ঞতা হবে আমি ভাবতে পারিনি।
দুঃখ পেয়ো না মা। তুমি ভালো আছ তো?
হ্যাঁ, ভালোই আছি। তুই ভালো থাকবি। তোর ফেরার অপেক্ষায় আছি।
ফোন রেখে দেয় দুজনে। ফোন বুথের গায়ে হেলান দিয়ে হঠাৎই ওর মনে হয় লন্ডনে ওর আর ভালো লাগছে না। কোর্সটা শেষ না করেই ওর চলে যাওয়ার ভাবনা মাথায় আসে। এটা করলে মা কি রাগ করবে? তন্ময় ধীরেসুস্থে বের হয়ে ভাবে, ম্যাথুর কাছে গিয়ে আড্ডা দিলে ওর ভালো লাগতে পারে। ও বিশ মিনিটের রাস্তা হেঁটেই চলে যায়।
দূর থেকে ম্যাথু আর নীলিমাকে ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে গল্প করতে দেখে ও খুশি হয়ে যায়। বুঝে ফেলে যে কোনো কারণে দুজনের ঝগড়া হয়েছিল, সেটা মিটে গেছে। ওর দিকে চোখ পড়তেই দুজনে হাত নাড়ে। তন্ময় কাছে গিয়ে সোজাসুজি নীলিমাকে বলে, মিলনের উৎসব পালন করে ফেল। ম্যাথু তো দোকান থেকে নড়বে না, যাও নান্দোস থেকে খাবার নিয়ে এসো।
এসেই একদম হুকুম জারি করছ?
করব না, এমন দৃশ্য দেখার ভাগ্য কজনের হয়?
ম্যাথু অবাক হয়ে বলে, কী হয়েছে?
তেমন কিছু না। নীলিমাকে খাওয়াতে বলেছি।
খুব ভালো করেছ। ম্যাথু ওর টেবিলের ড্রয়ার থেকে বিশ পাউন্ড বের করে বলে, আমি যাচ্ছি। তোমরা আমার দোকান সামলাও।
তন্ময় ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, ভাবতে অবাক লাগে যে এই মানুষটা ঝগড়া করতে পারে।
