আমি এত কিছু ভেবে তোমাকে এ কথা বলিনি। আমি ফান করার। জন্য বলেছি।
আমি সরি তন্ময়, আমার মনে হচ্ছে আমি তোমার কাছে একটু বেশি চাইছি।
মোটেই না। তুমি আমার ভীষণ ভালো বন্ধু।
বন্ধু! মাধবী বিড়বিড় করে বলে। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, চলো যাই।
ঘরে ফিরতে চাই না। তন্ময় উঠতে উঠতে বলে।
আমি তো ঘরে ফিরব না। অক্সফোর্ড স্ট্রিটে যাব। ক্রিসমাসের জন্য দারুণ সাজিয়েছে জায়গাটা। তুমি যাবে
যাবই তো। তন্ময় মাধবীর বিষণতা কাটাতে চায়। ওর ঘাড়ে হাত রেখে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দুজনে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলে করে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে আসে। আলো ঝলমলে শহরটা স্বপ্নপুরীর মতো লাগছে। তন্ময় মাধবীর ঘাড়ে চাপ দিয়ে বলে, ওয়াও, দারুণ তো!
দোকানে দোকানে কী ভীষণ ভিড় দেখেছ?
হুঁ, আমি ভাবছি তোমার জন্য একটা পারফিউম কিনব।
ক্রিসমাস গিফট?
অবশ্যই।
আমিও তোমার জন্য গিফট কিনেছি কুট্টি।
কবে? কখন?
বলবো না। ক্রিসমাসের রাতে দেব। ম্যাথুর দোকান থেকে আমি তোমার জন্য পরীর লকেট কিনেছি। সঙ্গে রুপালি চেন। তোমার ক্রিসমাস স্কার্টের সঙ্গে দারুণ মানাবে।
মাধবী ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। ওর চোখ জলে ভরে যায়। দ্রুত দুহাতে চোখের জল মুছে ও ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এত অকস্মাৎ ঘটনাটি ঘটে যে তন্ময় ভিড় ঠেলে মাধবীর হদিস করতে পারে না। নিজেও ভিড়ের মধ্যে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে মানুষের গুতো খেতে খেতে এগোতে থাকে। ও কোন দিকে যাচ্ছে ও নিজেও জানে না। জনস্রোতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে ওর ভালোই লাগছে। মনে হয় অবসর কাটানোর এমন সুযোগ জীবনে কমই আসে।
দুদিন পরে নীলিমা চোখ বাঁকিয়ে বলে, মাধবীর সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছে?
বন্ধুত্ব হয়েছে, তবে ম্যাথুর সঙ্গে তোমার যেমন বন্ধুত্ব, তেমন নয়।
নীলিমা হাত ওলটায়। কঠিন স্বরে বলে, তোমার কথা বেশ শার্প হয়েছে।
তোমাকে থ্যাঙ্কু নীলিমা, তোমার মতো কথা বলা শিখতে পেরেছি এটা আমার কৃতিত্ব, কী বলে?
নীলিমা কটমট করে তাকায়। হো-হো করে হাসে তন্ময়।
রাগ করছ কেন?
তোমার সঙ্গে রাগ করতে যাব কেন? ম্যাথু কেমন আছে?
জানি না।
মানে?
সহজ কথার মানে বোঝ না? ম্যাথুর খবর আমি জানি না। ওর সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।
ও বাব্বা! গতকালই ম্যাথুর সঙ্গে আমার দেখা হলো। খুবই হাসি-খুশি ছিল। ভাবলাম তোমরা দুজনে হেভি আছ।
তুমি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করোনি?
আমি অন্যের প্রাইভেসিতে নাক গলাই না।
ও আচ্ছা, যাচ্ছি। বাই।
নীলিমা চলে গেলে তন্ময় অবাক হয় না। ম্যাথুকে একজন দারুণ মজার লোক বলে মনে হয়। একটা সম্পর্ক গড়ে অল্প দিনে ভেঙে দিয়ে বেশ আছে। অদ্ভুত মানুষ। আর ও নিজে অনিমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না। তাহলে ও কি ওল্ড ভ্যালুজের লোক? আধুনিক হতে পারেনি? তন্ময়কে বিষয়টি খুব ভাবায়। এই ভাবনায় দুদিন কেটে যায়। পরদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে ঘরের মেঝেতে পায় মাধবীর চিঠি, দরজার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। খামের ওপরে লিখেছে, তন্ময় চিঠিটা মাকে পাঠিয়েছি। তোমাকেও পড়ার জন্য দিলাম। কফি বানিয়ে টেবিলে এসে ল্যাম্প জ্বালিয়ে চিঠি পড়তে বসে তন্ময়।
প্রিয় মা,
তোমার ভাষায় আমি তোমার নষ্ট মেয়ে, ঠিকমতো মুরব্বিদের সঙ্গে আচরণ করতে শিখিনি। এটা তুমি ভাবতেই পারো, বিষয়টি বোঝাতে তুমি যে ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করে তা হলো ভ্যালুজ। তোমরা এক ধরনের ভ্যালুজ নিয়ে বড় হয়েছ মা। আমরা আর এক ধরনের। এমনটা তো হতেই হবে, না হলে মনে হবে সময় চলছে না। কিন্তু আমার গড়ে ওঠা ধারণাকে তুমি অবক্ষয় বলে সংজ্ঞায়িত করো। আমি তোমার এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছি মা। সেজন্য তোমার কাছে আমি খারাপ। ঠিকমতো শিক্ষা-দীক্ষায় বড় হইনি। আমাকে তুমি ভালোভাবে বড়ই করতে পারোনি। কিন্তু মা, মূল্যবোধের অর্থ যদি হয় নিজেকে বঞ্চিত করা, নিজের সাথেই হিপোক্রেসি; তাহলে সে মূল্যবোধ ক্ষয়ে যাওয়াই ভালো। প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কেন নিজেদের এত ভালোবাসি, আসলে প্রশ্নটা ভুল জায়গায় হলো না, প্রশ্নের উত্তরও আমিই তোমাকে দেব। আসলে বিষয়টা হলো আমরা নিজেদের চাওয়া-পাওয়া, নিজেদের ভালোবাসা তোমাদের মতো করেই করি। পার্থক্য হলো আমরা বলে-কয়ে করি, অন্যায় করলে সেটা স্বীকার করতে দ্বিধা করি না, বলতে চাই আমরা যা আমরা তা, আমাদের লুকোছাপা নেই। তোমাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই মা, যে সংকীর্ণ সংজ্ঞা দিয়ে নিজের বিশাল পৃথিবীটাকে ম্যাচ বাক্সে পুরে ফেলতে চাই না–সেজন্য নিজেকে জাতি-রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে যেতে আমার কোনো সমস্যা হয় না। এ এক অন্য সময়ের কথা মা। এ সময়কে যদি তুমি ধরতে না পারো তবে নিজেই পিছিয়ে পড়বে, নিজের মেয়ের সঙ্গেই সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হবে। তুমি হারাবে আমার বয়সী প্রিয়জনদের। তুমি তোমার সময়কে আমাদের ঢুকিয়ে দিতে চেও না। শুধু শুধু কষ্ট পাওয়া বাড়াবে, বিনিময়ে নিজেকে একা হয়ে যেতে দেখবে। আমি জানি আমাকে নিয়ে তোমার ভাবনার অন্ত ছিল না। অনেক রাত তুমি না ঘুমিয়ে কাটাতে। কী দরকার অংক কষার মা? সিস্টেম থিওরিতে কিন্তু আছে দুই আর দুই যোগ করলে হয় পাঁচ কিংবা ছয়, আবার তিনও হতে পারে। সুতরাং তুমি আমাকে বুঝতে চেয়ো না, বরং অনুভব করো। নিজের জীবনকে উপরে ছুঁড়ে দিয়ে আবার ধরার খেলা আমি শিখেছি মা। আমরা তো আমাদের জীবনের নানা ধারণার সংজ্ঞা বদলে ফেলেছি। জীবনকে খাঁচায় রেখে রঙ দেখা, ঝালাই করা, ছুঁড়ে ফেলা, কাছে টানা কিংবা চরম উদাসীনতা বা বৈরাগ্য নিয়ে বেরিয়ে আসার পরীক্ষা কেন্দ্রে আমি নিজেই নিজের গিনিপিগ। মা, সেখানে তুমি সনাতনী সুখী দাম্পত্য চেহারাটি আমার পাবে না। কিন্তু পাবে আমার ভিন্ন সত্তা, যে সত্তা নিজের মতো করে গৃহকোণ সাজায় ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তিতে। কিন্তু তোমাদের কাছে মেয়েদের এই চেহারা পছন্দের না। তোমরা ভালোবাসো নরমসরম–বোকা সেজে থাকা মেয়েদের। মেয়ে হবে কিন্তু ন্যাকামি করবে না, আবদারে গলে যাবে না, এ কি মেনে নেয়া যায়। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো আইডেনটিটি কি নেই? আমরা একজন মানুষ, কিন্তু স্বতন্ত্র, বলতে পারো মা স্বতন্ত্র মানুষের শিক্ষা আমরা পরস্পরকে কবে দিতে পারব? যেখানে মেয়েরা বিকোয় তার জন্মসূত্রে পাওয়া লিঙ্গের ওজনে, সেখানে তো পরিবর্তনের আশা খুবই ক্ষীণ। তারপরও আমি বিপুল প্রত্যাশায় যুদ্ধে নেমেছি। নিজের সাথেই নিজের যুদ্ধ। এ খেলায় আমি হেরে যাব না। কারণ আমার কাছে হারা বা জেতা ভোটে যাচাইয়ের মতো ব্যাপার নয়। আমার দেখার বিষয় গুণের দিক। পরিমাণের দিক নয়। তাই নিজেকে সবসময় জিতিয়ে রেখে গুণের ভার বাড়ানো আমার লক্ষ্য। তবে তুমি জানো মা, জিতিয়ে রাখার ক্ষমতা অর্জন করার পথটা একদমই সহজ নয়। তবু অক্লান্ত চেষ্টার পথের যাত্রী হতে চাই।
