কোথায়?
রিজেন্টস রোডের হ্যামলিস দোকানে।
কী আছে ওই দোকানে?
হাজার রকম খেলনা।
খেলনা দিয়ে আমরা কী করব?
আমি দুটো খেলনা কিনব। একটা তোমার জন্য, একটা আমার জন্য। খেলনাটি যত্ন করে সাজিয়ে রাখব ঘরে, ভাবব ওই খেলনাটা আমাদের শৈশবের সময়।
বাহ, বেশ আইডিয়া তো।
তাহলে চলো যাই হ্যামলিসে। দোকানের নিচে স্ন্যাকস কর্নার আছে, কিছু খেয়ে নেব ওখানে।
তারপরে? তারপর দুজনে রিজেন্টস পার্কে গিয়ে ঘাসের ওপর বসে থাকব।
এই ঠান্ডায়?
তাহলে লেস্টার স্কয়ারে গিয়ে সিনেমা হলে ঢুকব।
তুমি দেখছি অনেক কিছু ভেবে রেখেছ।
হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে পুরো সময়টা কাটাব বলে এভাবে ভেবে রেখেছি। তোমার পছন্দ হয়েছে প্রোগ্রামটা?
খুব পছন্দ হয়েছে।
জানি তুমি এটাই বলবে। এজন্যই তোমাকে আমার এত পছন্দ।
মাধবী কুট্টির চেহারা বেগুনি আভায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, তুমি আর আমি একদিন ক্যামব্রিজে ঘুরতে যাব।
সারাদিনের জন্য, আমিও ভেবেছিলাম একাই একদিন ক্যামব্রিজের পথে বেরিয়ে পড়ব। ভালোই হলো যে তুমি সাথে থাকবে।
বাহ্, আমাদের মধ্যে টেলিপ্যাথি যোগ আছে।
মাধবী কুট্টির প্রাণখোলা হাসিতে মুগ্ধ হয় তন্ময়। মনে মনে ভাবে, ও যদি রোজ একটা করে চিঠি লেখে তাহলে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে করবে। এই অজানা শহরে একা একা বাস করার শূন্যতা ভরে উঠবে।
দুজনে হ্যামলিসে আসে। নানা উচ্ছাসে ঘুরে বেড়ায়। দুজনে দুটি খেলনা গাড়ি নিয়ে নেয়। কফি খায়, কিটক্যাট চকলেট কেনে। মাধবী তন্ময়ের হাত ধরে বলে, বেশ লাগছে, মনে হচ্ছে এখনই শৈশবে আছি, আমাদের সবচেয়ে ভালো সময়।
তন্ময়ের মনে হয় আজ ও নতুন করে মাধবীকে আবিষ্কার করবে, মানুষের ভেতরটাকে কখনো কখনো এমনভাবে দেখতে পাওয়া সুখী মানুষেরাই পারে। তন্ময় মাধবীকে বলে, আমি সত্যি একজন ভাগ্যবান। ছেলে, আমার যা হওয়া উচিত ছিল, আমি তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি, তোমাকেসহ মাধবী কুট্টি।
আমাকে সহ? মাধবীর কণ্ঠে বিস্ময়ের ধ্বনি।
তন্ময় মৃদু হেসে বলে, হ্যাঁ তোমাকেসহ, তোমার বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার পূর্ণতা।
তন্ময়, তুমি কী করে বুঝলে আমাকে?
একটি চিঠি।
ওহ্ চিঠি!
চিঠি পেতে আমি খুব ভালোবাসি।
আমি তোমাকে রোজ একটি করে চিঠি লিখব।
লিখবে তো, লিখবেই।
আমি এই দোকানের সব চকোলেট কিনে ফেলতে চাই।
থামো। তন্ময় ওর হাত জড়িয়ে ধরে বাইরে নিয়ে আসে। বলে, সামনে ক্রিসমাস। আমরা সেই ছুটিতে ক্যামব্রিজ যাব। আর কদিন পরেই।
এভাবেই শুরু। প্রতিদিন তন্ময়কে চিঠি লেখে মাধবী। অনিমার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তন্ময়। বলে দেশে ও আমার অপেক্ষায় আছে।
একদিন দিনের প্রথম আলোয় তন্ময়ের দরজায় টুকটুক শব্দ করে মাধবী। উশকোখুশকো চেহারা। ওকে ভেতরে ঢুকিয়ে তন্ময় বলে, কী হয়েছে মাধবী?
তুমি যখন অনিমার কথা বলো তখন আমার খুব কষ্ট হয়। কাল সারারাত এসব ভেবে আমি একটুও ঘুমুতে পারিনি তন্ময়।
আমি তো তোমার সঙ্গে প্রতারণা করতে পারি না মাধবী।
আমি জানি, তুমি পারো না। তুমি তেমন ছেলে নও।
তুমি বসো, আমি কফি বানাই।
হ্যাঁ, কফি খেলে একটু ভালো লাগবে।
তন্ময়ের টেবিলের সামনের চেয়ারটায় বসে মাধবী নিজেকে সামলায়। টেবিলের ওপর রাখা অনিমার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে, তুমিই জিতেছ। তন্ময় তোমারই। তন্ময় কফি আর স্কটিশ কুকি এনে টেবিলে রাখে। মাধবীকে ভীষণ উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে, মাধবীর জন্য ওর খুব মায়াই হয়। ও নিজে কি এজন্য দায়ী? থমকে যায় তন্ময়। ওর আকস্মিক নিশ্ৰুপ হয়ে যাওয়াতে মাধবী অপরাধীর মতো বলে, আমি তোমাকে দুঃখ দিলাম তন্ময়?
ভাবছি, আমি তোমাকে কষ্ট দিলাম কি না।
না, তুমি আমাকে কষ্ট দাওনি। আমিই তো বেশি এগিয়েছি, আমিই তো আমার আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। আমি তোমাকে ভালোবাসি তন্ময়।
দুজনে ধীরেসুস্থে কফি শেষ করে।
কারো মুখে কথা নেই। মাধবী কুট্টি চামচ দিয়ে কাপের গায়ে টুংটুং শব্দ করে। বলে, আগামী শুক্রবার আমাদের ক্যান্টিনে বিশেষ খাবার। দেয়া হবে।
ভীষণ মজা, তন্ময়ের উৎফুল্ল কণ্ঠ। পাঁচ পাউন্ডে দেয়া হবে টার্কি রোস্টের একটা টুকরা, ক্যানবেরি সস, আলুর সালাদ, রুটি, মাখন আর ক্রিসমাস পুডিং।
এই পুডিংটা খেতে আমার বেশি ভালো লাগে না।
তন্ময় চোখ বড় করে তাকিয়ে বলে, কেন?
পুডিং বললেও ওটা আসলে অনেক শুকনো ফল ঠাসা কেক, যার ওপরে কাস্টার্ড ঢালা হয়।
তন্ময় তার উৎফুল্ল ভাব না কমিয়েই বলে, আমার মনে হয় আমার। ভালোই লাগবে।
মাধবীর নিরুত্তাপ কণ্ঠ, কেন?
উৎসবটা ক্রিসমাসের, সেজন্য। খাবারের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবেরও মজা আছে, তাই না?
মাধবী একটু চুপ থেকে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ, তা ঠিক।
তন্ময় কণ্ঠ আরো উফুল্ল করে বলে, চাঙ্গা হও মাধবী। স্কুল থেকে আমাদেরকে দেয়া হবে বেলুন, কাগজের টুপি, বাঁশি আরো কী কী যেন। সবটাই ফান, ভীষণ মজা। আমি কিন্তু তোমার সামনে আমার বেলুনটা ফুটিয়ে দেব। আর তুমি তখন হাততালি দেবে।
হ্যাঁ, বেলুন তো ফোঁটাবেই।
মাধবী খুব বিষণ্ণ কণ্ঠে কথা বলে। ওর চোখের তারায় অদ্ভুত আঁধার, বিষণ্ণতা যে বেদনার এমন প্রতিচ্ছায়া হতে পারে ও ভাবতেই পারে না। এমন দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা তন্ময়ের জীবনে নেই। ও বিমূঢ় হয়ে যায়। তখন মাধবী ওর ডান হাতটা ধরে বলে, আমি জানি আমার ভালোবাসার বেলুনটা তুমি ফাটিয়ে দেবে তন্ময়। তোমাকে ফাটিয়ে দিতেই হবে। কারণ, অনিমা তোমার অপেক্ষায় আছে।
