দুদিন পরে ডাকে একটি চিঠি আসে ওর নামে। মাধবী কুট্টি লিখেছে। এত দেখা-সাক্ষাৎ হয়, তারপরও চিঠি লেখা কেন মাধবীর? ও। চিঠিটা খোলে না, টেবিলে রেখে ক্লাসে যায়, ফেরার পথে সেফওয়েতে ঢুকে কিছু খাবার কেনে। রাতে ঘুমুবার আগে লেপের ভেতরে শুয়ে মাধবী কুট্টির চিঠি খোলে। নিজেকেই বলে, কেন এতটা সময় নিলাম চিঠিটা খুলতে? আমি কি ভেবেছি মাধবী আমাকে প্রেমের চিঠি লিখেছে? না, যে চিঠিই লিখুক না কেন চিঠিটা পেতে ওর খুব ভালো লেগেছে, সেজন্য এক ধরনের উত্তেজনা ছিল নিজের ভেতরে সুখ অনুভবের রেশ ছিল। মাথার কাছে রাখা টেবিল ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোয় গুটি গুটি অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা চিঠিটায় ও মগ্ন হয়ে যায়।
ডিয়ার তন্ময়, তোমাকে আমার ফেলে আসা দিনের অনেক কথা বলেছি। তোমাকে আমার খুব আপন মনে হয়েছে। তুমি অকারণে পুরুষের দৃষ্টি নিয়ে তাকাও না কোনো নারীর দিকে, আগ বাড়িয়ে, ঝুঁকে পড়ার কোনো ন্যাকামি নেই তোমার, নারীর কোনো অঙ্গ ছুঁয়ে ফেলার হ্যাংলামি নেই তোমার। অথচ তোমার পুরুষের দীপ্ত ভঙ্গি আছে, জীবনকে বড় করে দেখার উদারতা আছে, তোমাকে একজন দীপ্ত মানুষ মনে হয়েছে আমার। প্রিয় তন্ময়, এই শহরে তুমিই আমার প্রকৃত বন্ধু, যাকে আমি সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে নির্ভর করতে পারি। সেজন্যই এই চিঠি লেখা। কথাগুলো আমি সামনাসামনি বসে তোমাকে বলতে পারতাম না। তোমার সঙ্গেই আমার নিজের কথা শেয়ার করতে ভালো লাগে, নইলে গুমোট দম বন্ধ করা অবস্থা আমাকে কুরে খায়। যত দিন যাচ্ছে ততই উপলব্ধি করছি কত ভাবে আমাকে মানসিক পীড়ন করা হয়েছিল। অবজ্ঞা, অবহেলা, কটুক্তি, অবিশ্বাস, অপমান কিছুই বাদ ছিল না। তুমি তো বোঝ যে দেশে মারধর করা স্বামীর অধিকারের মধ্যে পড়ে সে দেশে কথার পীড়ন তো কোনো আলোচনার বিষয়ের মধ্যেই পড়ে না। আমাকে আমার নিজস্ব যা কিছু বোধ তা শক্ত বাঁধনে আটকে রেখে বলা হবে স্বামী তার ভালোবাসার দায় পালন করছে। স্ত্রীকে মর্যাদা দিয়ে প্রতিপালন করা হচ্ছে। বলো তন্ময়, আমি কি শিশু! শিশুকেও খেলতে দেয়া হয়, শিশুর এক ধরনের স্বাধীনতা থাকে, বাবা-মায়ের বকুনি খেয়েও শিশু কিন্তু নিজের মতো আচরণই করে। কিন্তু আমি দেখেছিলাম আমার চারপাশে টানা ছিল লক্ষণরেখা, আমার সামনে ছিল সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্মনিয়মকানুনের দেয়াল, আর ছিল সংসারের ভালোবাসার নামে শিকল। আমি আমার মতো করে ভাবতে পারতাম না, যা ভালো লাগে তা বলতে পারতাম না, যা চাই তা জানাতে পারতাম না।
তুমি তো জানো তন্ময়, সবাই মিলে আমরা অধিকারের কথা বলি, আমার জিজ্ঞাসা, এসব কি তার বাইরে? আমি কি শুধুই ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তাটকর জন্য এই সংসারটা ধরে রাখব? সে তো নিজেই জোগাড় করতে পারি। তন্ময় বিশ্বাস করো, আমি একজন মানুষকে চেয়েছি। জীবনযাপনের সঙ্গী হিসেবে। পুরুষ কিংবা স্বামী (প্রভু) নয়। একবার মনে হয়েছিল একটা বাচ্চা থাকলে মন্দ হতো না, নিজেকে স্বস্তিতে রাখার একটি অবলম্বন পেতাম কিন্তু পরে নিজের স্বার্থপরতার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি একটি ভাঙা পরিবারের সন্তান হিসেবে ওকে আনন্দহীন জীবনে ফেলে দেয়ার অধিকার কি আমার আছে, নাকি থাকা উচিত! একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনলেই হলো? কী দায়িত্ব পালন। করতাম তার? খালি নিজেরটুকু ভাবি আমরা আনন্দ, বংশরক্ষা এবং শেষে মানবপ্রজাতির বেঁচে থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে আমরা প্রচণ্ড স্বার্থপর। নতুন প্রজন্মের জন্য কোনো ব্যবস্থা না করে যৌন সুখের তাড়নায় কিংবা অবলম্বনের অংশ হিসেবে সন্তানের কথা ভাবি। তোমার আর আমার দেশের অবস্থা একই তন্ময়। লন্ডনে শিশুদের জন্য কত কিছু–শত শত দোকান, জাদুঘর, পার্ক, কী নৈই ওদের জন্য–ওরাও ভাঙা পরিবারের সন্তান হয়, কিন্তু বস্তুগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় না। রিজেন্টস রোডের হ্যামলিস একটি চমৎকার দোকান। খেলনা যে কত রকমের হতে পারে এখানে না এলে বুঝতাম না। গতকাল হ্যামলিসের নিচের তলায় স্ন্যাকস কর্নারে গিয়ে গ্লাভস, টুপি, মাফলার খুলে বসেছিলাম। কফি খেলাম অকারণে বসে থেকে সেইসব বাচ্চাদের দেখছিলাম। যারা বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলনা কিনতে এসেছে, কিংবা শুধু বাবা অথবা শুধুই মা। বুকভরা কান্নায় আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না তন্ময়। আজ এ পর্যন্ত।
মাধবী কুটির চিঠি পড়ে তন্ময়ের মন ভারি হয়ে যায়। চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দেয়। লেপ মুড়ি দিয়ে মাথা ঢাকার সঙ্গে সঙ্গে বারবারই মনে হয় ও নিজেও একটা পরিত্যক্ত শিশু। দরিদ্র জননী পালতে পারবে না বলে বিত্তশালী আর এক নারীর হাতে তুলে দিয়েছিল। বিধাতা ওকে ঠকায়নি, দুহাত পূর্ণ করে দিয়েছে। বঞ্চনার জীবন নয় ওর।
০৪. দুপুরের দিকে মাধবীর সঙ্গে দেখা
দুপুরের দিকে মাধবীর সঙ্গে দেখা হয় ওর। মাধবী চিঠির প্রসঙ্গ ওঠায় না, ও নিজেও বলে না। কেন, তা তন্ময়ের কাছে পরিষ্কার নয়, শুধু মনে হয় একটু লুকোচুরির খেলা চলুক, দেখা যাক কত দূর গড়ায়। মাধবী জিজ্ঞেস করে, কেমন আছ তন্ময়?
ভালো, তুমি?
আমিও ভালো।
ঠান্ডা তোমার কেমন লাগছে?
একদম ভিন্ন আমেজ। তোমার কাছেও তাই নিশ্চয়ই। কারণ আমরা কেউই এমন আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচিত নই। চলো তোমাকে নিয়ে একটা নতুন জায়গায় যাব।
