হো হো করে হাসে তন্ময়। বুঝে যায় এলাকাটা নীলিমার খুবই চেনা হয়ে গেছে। নীলিমা আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে, পেছন থেকে তন্ময় অন্য দিকে চলে যায়। দেখতে পায় যে যার কাজে ব্যস্ত, তা আয়না মোছাই হোক বা বন্ধুর সাথে আড্ডাই হোক। তন্ময় অকারণে ঘুরে বেড়ায়–গন্ধ নেয়, ছুঁয়ে দেখে, দাঁড়িয়ে থাকে, কারো গায়ে ধাক্কা লাগলে সরি। বলে। সারিবদ্ধভাবে চামড়ার বিভিন্ন ধরনের জিনসের দোকান সাজানো–এদের মধ্যে বেশি আছে জ্যাকেট, বুটজুতো, ব্যাগ। তন্ময় একটি কালো রঙের জ্যাকেট কেনে। ঘড়ির দোকান আছে কয়েকটা মায়ের জন্য একটি ঘড়ি কিনবে বলে ভাবে, কিন্তু সাবিহা বানুর কড়া নিষেধ আছে কিছু কেনার ব্যাপারে, বলেছেন, শুধু সখিনার জন্য একটা কিছু কিনতে। ও নেড়েচেড়ে রেখে দেয়। হিপ্পিদের পোশাকের দোকানগুলো বেশ দেখার মতো। মেয়েদের কিছু কিছু পোশাক দেখে ওর হাসি পায়। এসব পোশাক পরে কোনো মেয়ে ঢাকা শহরে হাঁটতে পারবে না, এমনকি বিদেশি মেয়েরাও নয়। ঘুরেফিরে ম্যাথুর দোকানে আসে। ম্যাথু ওকে দেখে উজ্জ্বল চোখে তাকায়, আগের মতো বিবর্ণ ভাব নেই ওর চেহারায়। হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলে, তুমি অনেক দিন আসোনি।
নীলিমা হাসতে হাসতে বলে, ও খুব ব্যস্ত। ও ফটোগ্রাফি কোর্সের সিরিয়াস ছাত্র। আমার মতো ফাঁকিবাজ নয়।
ম্যাথু হা হা করে হাসে। তন্ময় ওর আনন্দে সাড়া দিতে পারে না। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে, আজ কোন লকেটটা বেশি বিক্রি হলো।
নীলিমা আগ বাড়িয়ে বলে, পরীর। ওই লকেটটা সবার পছন্দ।
হা হা করে হাসে ম্যাথু। তন্ময় আকস্মিকভাবে উপলব্ধি করে যে ম্যাথু আজকে অনেক বেশি উচ্ছল–কারণে-অকারণে হেসে আনন্দ প্রকাশ করে মাথায় তুলছে ওর চারপাশ, নীলিমার স্পর্শ কি বদলে দিল ম্যাথুর সবটুকু প্রকৃতি? কোথাও একটুও ফাঁক নেই, এটাই সত্যি–এরই নাম জীবন। তন্ময়কে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ম্যাথু হেসে বলে, নীলিমা চমৎকার মেয়ে, ঠিক পরীর মতো ওর মধ্যে স্বপ্ন এবং বাস্তব মিশে আছে।
সত্যি? তন্ময় চোখ বড় করে নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা মৃদু হেসে আস্তে করে বলে, তোমাকে বলেছি তো সব। লুকাইনি কিছুই।
একটি বিষয় লুকিয়েছ।
কী?
আমাকে বাদ দিয়ে ম্যাথুর কাছে এসেছ। কবে এত কিছু হয়ে গেল জানতেও পারলাম না।
আগেভাগে সব কিছু জেনে গেলে চমক পাবে কী করে? চলো যাই। নান্দোসের চিকেন খেয়ে আসি।
আজ না। আর একদিন।
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তন্ময় আবার একলা হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, ওর আসল নাম আশরাফুল হক। আসল মাকে ও কোনো দিন দেখেনি। পালক মায়ের যে ভালোবাসা পেয়েছে সেটা মাধবী কুটির অভিজ্ঞতার বিপরীত, গভীরভাবে উল্টো, তাহলে ভালোবাসার সত্যিকার কোনো ঠিকানা নেই–জন্মের পরে অসংখ্য আসল মা তো শিশুদের ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। উপায়হীন সেসব মায়েদের নিজেদের ভাবনার জায়গা যেমন নেই, তেমনি নিজের সন্তানদের জন্যও ভাবনার জায়গা নেই। উন্নয়নশীল দেশে শিশুদের এটাই নিয়তি। লে বাব্বা, আমি আবার তাত্ত্বিক ভাবনা ভাবতে বসলাম, হয়েছে কি আমার। ও নান্দোস রেস্তোরাঁয় ঢোকে ঝাল চিকেন আর হলুদ ভাত খাওয়ার জন্য। এটা পর্তুগিজদের দোকান। ওকে দেখে পর্তুগিজ ছেলেটি ছুটে আসে। মেনুটা এগিয়ে দিয়ে বলে, হাই।
তন্ময় মাথা নাড়ালে বলে, তোমার গার্ল ফ্রেন্ড আসেনি?
তন্ময় মুচকি হেসে বলে, আমার ফ্রেন্ড অন্য কাজে ব্যস্ত। তুমি আমাকে সেদিনের মেনুটাই সার্ভ করো।
ছেলেটি চলে যায়। একটু পরে খাবার আনে, দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, ওর চোখ দিয়ে জল ঝরতে শুরু করলে ও একটুখানি মিষ্টি জাতীয় কিছু নিয়ে ছুটে আসে না। তন্ময় কোক খেয়ে নিজেকে সামলায়। বুঝতে পারে, নীলিমা ওর ভালোবাসা পেয়েছে, নারী বলে কি? কে জানে, ওর হয়তো কোনো স্মৃতি আছে নীলিমাকে নিয়ে কিংবা নীলিমার মতো কাউকে ও পর্তুগালে রেখে এসেছে। কে জানে, ও হাত ওলটায়, ঝাল খেতে খেতে অনিমাকে চিঠি লিখবে বলে মনে করে, এখন পর্যন্ত অনিমার কাছ থেকে কোনো চিঠি পায়নি। তাতে কি, ফুলমসির মতো অখ্যাত স্টেশনে এত দূর থেকে কোনো চিঠি হয়তো পৌঁছায়নি।
ঘরে ফিরে ওর মন খারাপ লাগে। জানালার পর্দা টেনে দিয়ে ও অনিমার জন্য কেনা লকেটটা ঘরের বিভিন্ন জায়গায় রেখে অনেকগুলো ছবি তোলে। ছবিগুলো অনিমাকে পাঠাতে হবে। বাসার কাছেই একটি পোস্ট অফিস আছে, এটা ও আগে খেয়াল করেনি। একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ভেতর ছোট্ট এক কোনায় দুটো লোক এই পোস্ট অফিস চালায়। পরে জেনেছে এখানে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে পোস্ট অফিস চালাতে পারে সরকারের অনুমতি নিয়ে। ধারণাটা মন্দ নয়, তাহলে বাংলাদেশের অনেকে কাজের জায়গী খুঁজে পাবে, মানুষের হাতের নাগালে থাকবে ডাক ব্যবস্থা। এক কাপ কফি খেয়ে তন্ময় অনিমাকে চিঠি লিখতে বসে। হঠাৎ করে উপলব্ধি করে মন খারাপের বোধ ও ছাড়াতে পারেনি। আসলে সেই পর্তুগিজ ছেলেটি কেন ওর জন্য খানিকটুকু মিষ্টি জাতীয় কিছু নিয়ে ছুটে আসেনি, তা ওর বুকে বেজেছে। নীলিমা থাকলে হয়তো ঠিকই আসত। পরমুহূর্তে নিজেকে শাসন করে ও, কেন এভাবে ভাবছে, নীলিমার সঙ্গে ওই ছেলেটির বন্ধুত্ব বেশি দিনের, ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে মাত্র একবার। ছেলেটির কাছে নীলিমার মতো প্রত্যাশা কেন ওর থাকবে? পরিচয় বেশি দিনের হলে ঠিকই ওর কাছে আসত। এর পরে যখন যাবে তখন ও ঠিকই আসবে, এমন ভাবনার সাথে সাথে ওর ভেতরের বরফ গলতে শুরু করে। যে কলমটা দাঁতে কামড়ে রেখেছিল সেটা নেমে আসে লেখার কাগজের ওপর। প্রিয় অনিমা, প্রিয়তম… কেমন আছ তুমি? অনেক কিছু তোমাকে লেখার আছে, কিন্তু লিখতে পারছি না। শরীরের এমন মারমুখী আচরণ, যখন তখন বেঁকে বসে, গাল ফোলায়, রাগ করে–ভারি বিপদ এই দুষ্ট ছেলেটিকে সামলাতে…। আর লেখা হয় না তন্ময়ের। লাইট বন্ধ করে লেপের নিচে ঢুকে পড়ে।
