তাহলে আমি একদিন বাংলাদেশে বেড়াতে যাব।
আমাকে যোগাযোগ করবে। আমি তো তোমাকে ঠিকানা দিয়েছি।
তোমার মাকে দেখতে আমার খুব ইচ্ছে। আর দেশে ফিরলে তো তুমি বিয়ে করবে। অনিমার সঙ্গেও আলাপ হবে।
তন্ময় মাধবী কুটির সারল্য উপভোগ করে। তারপর নদী দেখতে দেখতে মাধবী ওর কথা বলে, নীলিমার মতোই কথা, তফাত একটুখানি মাধবীর গল্পে মায়ের নেতিবাচক ভূমিকা আছে।
অনেক রাতে অনিমাকে মাধবী কুট্টির কথা জানাতে চিঠি লিখতে বসে তনয়। টেরই পায় না যে বাইরে তুষারপাত হচ্ছে। জানালায় মোটা পর্দা, ঘরে হিটারের ছড়িয়ে দেয়া উষ্ণতা। টেবিলে সাজানো অনিমার ছবিটা হাতে নিয়ে বলে, আমার চিঠিগুলো তুমি পাচ্ছ কি-না বুঝতে পারছি না। কত দূর ফুলমসি স্টেশন, ঢাকার চিঠি যেতে অনেক সময় লাগে, আর আমি তো সাত-সমুদ্র তেরো নদী পার থেকে লিখছি। ও টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিয়ে ঘরের অন্য বাতি বন্ধ করে দেয়। অনিমাকে লেখার জন্য চমৎকার একটি প্যাড কিনেছে, আজই এই রাইটিং প্যাডের প্রথম পৃষ্ঠার ব্যবহার–প্রিয় অনিমা, আমার ভালোবাসার প্রথম নারী, কেমন আছ তুমি, জানি সারাক্ষণ মনে করো আমার ফেলে আসা দিনগুলো। অপেক্ষা করে আছ আমার ফেরার। ফেরার আর বেশি দিন নেই। কোর্স শেস হলে একদিনও এ দেশে থাকব না।
আজ তোমাকে মাধবীর কথা শোনাব। ওর মুখেই শোনো : মা চেয়েছিল আমার বিয়েটি যেন ভেঙে না যায়। আর আমার মনে হয়েছিল, আমি আমার সন্তানকে ভাঙা পরিবারের সন্তান করব না। এই বাজে লোকটির কাছ থেকে আমার দ্রুত চলে যাওয়াই মঙ্গল। বাসররাতে লোকটি মাতাল হয়ে এসেছিল। পরে জেনেছিলাম বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কও ছিল। আমার কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম ছিল না ওর কাছে। আমি ছিলাম ব্যবহার্য কাপড়ের মতো। মাকে এসব বলাতে মা বলে, মুখ বুজে ঘর করো। বেশি বাড়াবাড়ি করবে না। ও তো তোমাকে রানির হালে রেখেছে। আসলে লোকটার টাকা দেখে আমার মা আমাকে বিকিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের মর্যাদার কাছে আমি তো অর্থকে তুচ্ছ মনে করতাম। মাকে তা বোঝাতে পারিনি। তাই একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বান্ধবীর কাছে আশ্রয় নেই। নানা জায়গায় কাজ করি, তাতে নিজের চলবে তো, লোকটি আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগল। নানাভাবে হ্যারাস করা শুরু করল। শেষে একটা স্কলারশিপ জোগাড় করে এখানে চলে আসি। দেশে আর ফিরব না ঠিক করেছি। বলছিলাম মায়ের কথা, আমি একা বিদেশে আসব শুনে মায়ের তো ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। তারপরও কালিকট বিমানবন্দরে আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিল মা। অন্য সময় আমি ভারতের অন্য কোনো জায়গায় গেলে জড়িয়ে ধরে চুমু খেত মা, এবার রাগী চেহারায় দাঁড়িয়ে রইল–বুঝলাম চাপা রাগ আর কান্নায় থমথম করছে মা। আমি তো বাইরের পৃথিবীতে পা দিয়েছি, ফেরার পথ একবারও ভাবছি না। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ, এবার আমাকে বিদায় নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে আমি নিজে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলে মা আমাকে মৃদু ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দিল ধাক্কাটা আমার গায়ে লাগেনি, লেগেছিল বুকে। মনে হয়েছিল মা-মেয়ের বন্ধনের যে সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটাও ছিঁড়ল। ছিঁড়ুক, বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু চোখ থেকে জল ঝরতে দেইনি। গটগট করে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে যেখানে যাত্রীরা অপেক্ষা করে সেখানে পৌঁছে যাই, একবারও পেছন ফিরে তাকাইনি। প্লেনে ওঠার পরে, প্লেনের সাথে সাথে আমিও অন্ধকারে ড়ুবে যাই, তখন আমার সামনে অসীম শূন্যতা ছাড়া আর কোনো গন্তব্যস্থল ছিল না। একজন আমার প্রিয় মানুষ ছিল, তার কাছ থেকে এত বড় আঘাতটা আসবে আমি ভাবিনি, আমি মেয়ে, বারবার তিনি আমাকে এটা বুঝিয়েছিলেন। তার দোষ নেই, তিনিও নারী হিসেবে এই রকম আচরণই পেয়েছিলেন। এবং সেই রকম পথেই আমাকে হাঁটতে হবে তা ধরে নিয়েছিলেন। তারপরও ভীষণ কষ্ট পেয়েছি যখন দেখেছি আমাকে সমর্থন না করে, তিনি ওই বাজে লোকটিকে ক্রমাগত সমর্থন করছিলেন। কারণ আমাদের সমাজে তো কখনো একা বড় হওয়ার সুযোগ দেয়া হয় না, একা থাকতে চাইলেও ক্রু কুঁচকায়। কিন্তু লন্ডনে এসে আমি নিজের মতো করে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছি। একদিন খুব মন খারাপ লাগছিল। দেশে থাকতে সুখ-দুঃখ সামাজিকভাবে অনুভব করতে শেখানো হয়েছিল, এখানে এসে পেলাম ব্যক্তির মর্যাদা। বলছিলাম মন খারাপের কথা। প্রবল মন খারাপ নিয়ে ফুটপাথে বসে জোরে জোরে কাঁদছিলাম। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি এক বুড়ো দম্পতি আমার ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তা পার হয়ে অপর পাশে চলে গেল। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে ওদের সম্মান দেখানো আমাকে খুব স্বস্তি দিয়েছিল। মানুষ হওয়ার যে যাত্রায় পা বাড়িয়েছি সেই লক্ষ্যে যেন পৌঁছাতে পারি সেই সাধনা করছি। প্রতিনিয়ত ভাবি আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার এই জীবন আমি চেয়েছিলাম। লন্ডন আমাকে এই স্বাধীনতা দিয়েছে।
একদিন তুমি এভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে চাইবে কি না আমি জানি না অনিমা। নীলিমা কিংবা মাধবী শুধু মেয়ে হিসেবে আমার বন্ধু নয় এখন, ওরা আমার সামনে এক একটি দরজা খুলে দিচ্ছে, সেই দরজা দিয়ে হুহু করে বাতাস এসে আমার ভাবনা এলোমেলো করে দিচ্ছে। আমি আমার মাকে দেখেছি একভাবে, তোমার সঙ্গে গড়ে উঠবে ভিন্ন সম্পর্কের সেতু, সেটা অনেক ভাবনার, অনেক চিন্তার সেতু। ভুল হলে সেই সেতু হুড়মুড়িয়ে ভাঙবে। তাই নিজেকে বুঝে ওঠার সুযোগটা আমি ছাড়তে চাই না। তোমার কাছে যখন ফিরে যাব, দেখবে ভিন্ন তন্ময়কে, যে তোমাকে বোঝার জন্য নিজের অনুভবের দরজা খুলে রাখবে। আজ এ পর্যন্ত–তোমার তন্ময়।
