চব্বিশ নম্বর বাসটা ধরার জন্য ওকে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে যেতে হয়, অন্তত দশ মিনিট তো বটেই। এরপরই ক্যামডেন টাউনের কাছাকাছি এসে স্টপেজ। ওখান থেকে বাস মর্নিংটন ক্রিসেন্ট টিউব স্টেশনের কাছে এসে ডানে মোড় নেয়, সেখান থেকে সোজা ওয়ারেন স্টেশন ছুঁয়ে ম্যালেট স্ট্রিটে তন্ময়ের স্কুল। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার পথ, বাসে বসার জায়গা পাওয়া যায় না এমনটা হয় না, দেশের মতো বাসে ঠেলাঠেলি নেই। কত নিঃশব্দ, কত সৌজন্য, সব মিলিয়ে এক মিগ্ধ পরিবেশ–শুধু শীতে কষ্ট হচ্ছে, অপেক্ষা একদিন সামার আসবে, ফুরফুরে হয়ে যাবে শহরের জীবনযাপন। বড় বড় গাছগুলো নানা রঙের ফুলে ভরে উঠবে, তখন আর এক ধরনের ছবি ওঠাবে ও। এমন বৈপরীত্য দেশের আবহাওয়ায় নেই, ঋতু বদল আছে, সেটা আমূল বদলে দেয় না প্রকৃতির চেহারা। স্কুলে দেখা হয় মাধবী কুট্টির সঙ্গে, ও ভারতের কেরালার মেয়ে, নরমসরম, গোবেচারা ধরনের মেয়ে, নিজের মতো একা একা থাকতে ভালোবাসে। তন্ময়ের জানতে ইচ্ছে করে ওরও কি নীলিমার মতো সমস্যা আছে, নাকি ও ভীষণ সুখী মেয়ে, মাথার ওপর পুরুষের প্রভুত্বের কোনো চাপ নেই। কিন্তু ভিন্ন দেশের মেয়ে বলে ওর সঙ্গে ক্লাসের বন্ধুতু ছাড়া আলাপ বেশি দূর গড়ায়নি। আজো ওকে দেখে বলে, হাই! ব্যস এটুকুই। তন্ময়ও মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়। জিজ্ঞেস করে, আমি তো দেরি করে ফেলেছি, তুমি ক্লাসে যাওনি।
ক্লাস হবে না। প্রফেসর শরীর খারাপ বলে বোর্ডে নোটিশ দিয়েছেন।
তন্ময় হাত উল্টিয়ে এমন ভঙ্গি করে যে, সে ভঙ্গি দেখে মাধবী হেসে বলে, হতাশ হলে?
একটুও হতাশ হবো না, আমরা দুজনে ক্যান্টিনে বসে চায়ের কাপে ঝড় তুলব।
আমি রাজি।
চলো সোয়াসের ক্যান্টিনে যাই।
দুজনে রাস্তা পার হয়ে সোয়াসে আসে। তন্ময় এখান থেকে মায়ের সঙ্গে কথা বলে।
তুমি কেমন আছ সোনা মা আমার?
অপর প্রান্ত থেকে সাবিহা বানুর হাসির শব্দ শোনা যায়। তন্ময় জিজ্ঞেস করে, আমি তোমার ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে কি তুমি আমাকে এমন স্বাধীনতা দিতে?
হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
বলো না মা।
সাবিহা বানু ধীর কণ্ঠে বলে, আমাদের সমাজ মেয়েদের একা বড় হওয়ার সুযোগ দেয় না। আমিও তো এই সমাজের বাইরের কেউ না, তুই মেয়ে হলে আমাকেও রশি টানতে হতো, পুরো স্বাধীনতা দিতে পারতাম না।
সত্যি বলার জন্য থ্যাঙ্কস মা। তোমার কাছে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। রাখি এখন, একটি ইন্ডিয়ান মেয়ের সঙ্গে চা খেতে যাব।
ও ফোন রেখে দিলে মাধবী কুট্টি বলে, তুমি মাকে খুব ভালোবাসো তন্ময়?
হ্যাঁ, ভীষণ ভালোবাসি। তাছাড়া মাকে তো সব ছেলেমেয়েই ভালোবাসে। তুমি বাসো না?
বাসি, কিন্তু মায়ের সঙ্গে আমার বিরোধ আছে। চলো চা খেতে খেতে তোমাকে আমার গল্প বলব।
তন্ময় মনে মনে বলে, হায় ঈশ্বর, আবার গল্প!
দুজনেই যার যার পছন্দের চসিআর স্ন্যাক্স নিয়ে টেবিলে বসে। আশপাশে আর কেউ বাংলাদেশি বা ভারতীয় নেই, সবাই ইউরোপ বা আফ্রিকার, আমেরিকারও হতে পারে, বোঝা যাচ্ছে না। তন্ময় স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে বলে, আমার মা চমৎকার স্যান্ডউইচ বানায়। ছোটবেলায় আমি খুব স্যান্ডউইচ খেতাম।
মাকে নিয়ে তোমার অনেক স্মৃতি তন্ময়?
হ্যাঁ, অনেক, অনেক। মা আমার জীবনে ভীষণ আনন্দ।
ওর উচ্ছ্বাসে তেমন সাড়া দেয় না মাধবী কুট্টি। ধীরেসুস্থে স্যান্ডউইচ শেষ করে। দৃষ্টি প্লেটের ওপর, ভ্রু কুঁচকে আছে, ওর ঘন কালো লম্বা চুলের মোটা বেণিটা বুকের ওপর দিয়ে অনেকখানি নেমে এসেছে, বেণির মাথায় একটি সবুজ রঙের ফিতা জড়ানো। গায়ে হালকা নীল রঙের টি-শার্ট, ওকে সব সময় জিনস পরতেই দেখেছে তন্ময়। স্যান্ডউইচ খেয়ে ও চায়ের কাপে চুমুক দেয়। বলে, মায়ের কথা ভাবতে আমার বেশি ভালো লাগে না।
তন্ময় চুপ করেই থাকে, নিজের কথা নিজেই বলুক মাধবী, তন্ময় খুঁচিয়ে শুনতে চাইবে না, খোঁচাতে গেলে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ও গভীর মনোযোগ দিয়ে মাধবীকে লক্ষ্য কর বেশ কালো গায়ের রঙ, আবার ব্ল্যাকদের মতো কালো নয়–নারকেল গাছের সারিতে সুশোভিত সাগর-কন্যা কেরালার সবটুকু বৈশিষ্ট্য বুঝি ওর মাঝে আছে একদিন ভাস্কো-ডা-গামার জাহাজ এসে ভিড়েছিল এ রাজ্যের সমুদ্র উপকূলে। হঠাৎ খেয়াল করে মাধবীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ল টেবিলের ওপর। ও মৃদু স্বরে ডাকে, মাধবী!
ও দু-হাতে চোখ মুছে বলে, সরি। তারপর হেসে বলে, কী ছেলেমানুষি করছি, আমরা তো চায়ের কাপে ঝড় তুলতে এসেছিলাম।
তার জন্য সময় শেষ হয়ে যায়নি।
পরিস্থিতিটা আমিই একটু অন্যরকম করে ফেললাম।
আমার ভালোই লাগছে।
চোখের জলও।
আনন্দেও মানুষের চোখে জল আসে। তোমার হয়তো কোনো আনন্দের স্মৃতি মনে পড়েছে।
না তন্ময়, আনন্দ নয়, কষ্টের। তুমি মায়ের সঙ্গে কথা বললে, আমি এখানে এসে একদিনও মাকে ফোন করিনি। আমার ভালো লাগে না তন্ময়। আমার ঘর ভাঙা মা মেনে নেয়নি। মা চেয়েছিল আমি স্বামীর সংসার মুখ বুজে করব। আমি তা মানতে পারিনি, সেজন্য …
থাক এসব কথা। মেয়েদের যে কবে এসব থেকে মুক্তি ঘটবে জানি না। যেতে হবে অনেক দূর।
চলো টেট গ্যালারি ঘুরে আসি।
হ্যাঁ, চলো টেমস নদীর পাড়েও কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারব। নদী দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
আমারও। তুমি কি জানো আমাদের দেশটায় নদী ভরপুর। অসংখ্য নদী, নামগুলোও খুব সুন্দর।
