এই মুহূর্তে কাঁদতেই আমার ভালো লাগছে তন্ময়। যে নীলিমাকে তুমি দেখছ এই নীলিমার বুকের ভেতরে হাজারটা নীলিমা আছে। তার এক একটি চেহারা আছে। আমি এখন অন্য চেহারায় ভীষণ আক্রান্ত। আমাকে আর প্রশ্ন করো না। কাঁদতে দাও।
তন্ময় দেখতে পায় পুরোটা সময় নীলিমা চোখের জল মুছতে মুছতেই ঝাল চিকেন আর ভাত খায়। এক সময় অস্ফুট স্বরে বলে, ওই পর্তুগিজ ছেলেটি যত্ন করে যে ছোট্ট খাবারটুকু দিয়ে গেছে, তা আমাকে খুব স্পর্শ করেছে। এমন ঘোট ঘোট ভালোবাসার আমি খুব কাঙাল। একজন মানুষের সঙ্গে ঘর করতে গিয়ে এর বিপরীত আচরণ পেয়েছি বলে সেই রক্তক্ষরণ আমাকে মরমে মারে। ছোট ভালোবাসায় আমি কাঁদতে ভালোবাসি।
অনেক রাতে অনিমাকে চিঠি লেখে তন্ময়।
প্রিয় অনিমা, প্রিয়তম নারী আমার, ব্যস্ত কদিন কাটানোর পরে তোমাকে লিখতে বসেছি। ব্যস্তত্ম শুধু নিয়মিত কাজের নয়, ভিন্ন দেশের অচেনা পরিবেশে নিজেকে খাপ-খাইয়ে নেয়ার চেষ্টাও। আসার আগে তোমাকে বলে আসা হয়নি, মা আমার এখানে আসার আয়োজন ঠিক করে রেখেছিল বলে, আমি আর ফুরসত পাইনি বুড়ি ছোঁয়ার মতো তোমাকে এক নজর ছুঁয়ে আসার। জানি তোমার মন খারাপ হলেও, রাগ করবে না, তুমি আমার অপেক্ষায় দিন গুনবে। এই মুহূর্তে আমাদের জীবনে অপেক্ষাই সত্যি। এটিও আমার ভবঘুরে জীবনের একটি অংশ।
আমার সঙ্গে একই কোর্সে পড়তে এসেছে নীলিমা–স্বামীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বাবার পয়সা আছে, ফটোগ্রাফির নেশা তেমন আছে বলে মনে হয় না, সময় কাটানোই লক্ষ্য। আমার কাছে নিজের জীবনের কথা বলেছে। নীলিমা বেশ স্ট্রং মেয়ে। নীলিমা আমাকে ওর কথা যেভাবে বলেছে আমি অনেকটা ওর জবানিতেই তোমাকে জানাতে চাই অনিমা, হয়তো একটু হেরফের হতে পারে ভাষায়, কিন্তু মূল বিষয়টা আমি বুঝেই লিখছি। নীলিমার কথা শুনতে শুনতে নিজের দিকে তাকিয়েছি, নিজেদের সংসারের কথা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে, তোমাকে যোগ্য মর্যাদা দিতে পারব তো, নাকি পুরুষ হিসেবে নিজের আধিপত্য দেখাতে চাইব, যেটা নীলিমার স্বামী করেছে! এখন পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছি না, কারণ সংসারে তো এখনো ঢকিনি, কিন্তু প্রভু হওয়ার বাসনা নিজের ভেতর কতটা সেই দাঁড়িপাল্লায় এখন পর্যন্ত নিজের ওজন ভারী দেখছি না অনিমা, ট্র, একটুও মিথ্যে না। ভরসা করতে পারছি নিজেকে, কারণ নীলিমার একটি তীব্র কথা প্রকটভাবে আমার ভেতর গেঁথে আছে। ও বলেছে, গত পঁচিশ বছর ধরে জেন্ডার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে নারী-পুরুষদের সমতার প্রশ্নে মানুষ’ করা হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষিত ছেলেগুলোকে মানুষ করবে কে? সামাজিক ধারণায় এবং শ্ৰেণীগত অবস্থানে আমি তো শিক্ষিত এবং আরো একটু বেশিও নিশ্চয়, আমিও কি মানুষ হতে পেরেছি! লন্ডনের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে এই প্রশ্নের সুযোগটি রেখেছি অনিমা।
নীলিমা কী বলেছে শোনো, আমার চৌদ্দ মাসের সংসার জীবনে আমি আমার স্বামীর কাছে অর্থ কিংবা বিলাস চাইনি, চেয়েছি নারী হিসেবে পুরুষের চোখে আমার মর্যাদা-সম্মান–এককথায়, সমতা–বলেছি, তুমি আর আমি সমান। ও মানতে পারেনি, ও আমার ওপর প্রভুত্ব ফলিয়েছে। ও তো পুরুষ হয়ে জন্মেছে, প্রভুগিরি করার অধিকার নিয়ে–সুতরাং এই জাতাকলের নিয়মে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে সে। আমার অফিসে সন্ধ্যায় মিটিং থাকলে রেগে যেত ও ঘরে ফিরলে হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো, তাও আবার এমন সব প্রশ্ন যে শুনলে ঘেন্নায় মাথায় রক্তের ঘূর্ণি উঠত; অথচ ও নিজে রাত বারোটায় ফিরলে জিজ্ঞেস করা যেত না যে কোথায় ছিল। সংসারে সব সিদ্ধান্ত দেয়ার অধিকার ছিল ওর, আমার না। গানের কোন ক্যাসেটটা শুনব সেটাও ওর ইচ্ছের ওপর নির্ভর করত, তারপরও চালিয়েছিলাম অনেক দিন। কিন্তু যেদিন ঝগড়ার মুহূর্তে রাতদুপুরে ঘর থেকে বের করে দরজা লাগিয়ে দিল সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আর নয়, অনেক হয়েছে। আমিও যে মানুষ, আমারও যে ভালোমন্দ বোধ আছে, চিন্তা আছে–ইচ্ছে-অনিচ্ছে আছে সেটা আমি ওকে বোঝাতে পারিনি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে সংসারের ইতি টানার জন্য আমি তৈরি হয়ে গেলাম। বুঝলাম সংসার ভাঙার জন্য অনেক সময় বিশাল কোনো কারণ লাগে না, ছোট ছোট ঘটনার সমষ্টি এত মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয় যে তার ওপর আর অন্য কথা চলে না। এই বিষয়টুকু বুঝেও কোনো নারী সিদ্ধান্তে নেয়। ছয় মাসে, কেউ পাঁচ বছরে, কেউ সিদ্ধান্ত নেয়ই না, একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন কাটায়। স্বামীর সঙ্গে মনের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েও দিন কাটায় সামাজিকতার নামে, সন্তানদের দায়ে। আমি চাইনি এসব দায় টেনে দিন কাটাতে। যদি কোনো ভালো মানুষ খুঁজে পাই তবে আবার সংসার করব, আমি ঘর চাই, সন্তান চাই–এই সম্পর্কের আনন্দ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাই না। নীলিমার কথা আজ এতটুকু, আরো কথা হলে পরে লিখব। অনেক ভালোবাসা, তোমার তন্ময়।
খামটায় গাম লাগিয়ে স্কুলের ব্যাগের ভেতর রাখে, কাল পোস্ট করবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে, রাত আড়াইটা। সকালে ক্লাস আছে। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে যাওয়ার চেয়ে ও বাসে যেতে ভালোবাসে, কারণ নিচ দিয়ে গেলে শহরটা দেখা হয় না, শহর দেখার চমকই ভিন্ন—মানুষ, প্রকৃতি, ভৌত কাঠামো এবং রাস্তাঘাটের শত রকম যানবাহন মিলে একটি শহরের চরিত্র তৈরি করে। লন্ডন ওর বেশ ভালো লাগার শহর হয়ে উঠেছে। শীতে কাবু হয়ে গেছে শহর। বাসস্ট্যান্ডে বাসগুলো বেশ দেরিতে আসে। মাঝে মাঝে শীতে জমে যাওয়ার জোগাড় হয়, এ এক ভারি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা–দেশে এই অভিজ্ঞতা হতো না। বরফের ছবি তুলে মাকে পাঠিয়েছে। সাবিহা বানু প্রায়ই ওকে ফোন করে। নিজের কথা বলে, ওর কথা জানতে চায় বাতি বন্ধ করে লেপের নিচে শুতে শুতে ওর মনে হয় শহরটাকে ও বেশ চিনেছে–কোথায় সেলুন, কোথায় বইয়ের দোকান, অ্যান্টিক্স কোথায় পাওয়া যায়, কোথায় রানির বাড়ির লোকেরা শপিং করে কোথায় নেপালি রেস্তোরাঁয় ছেলেরা কপালে সিঁদুর লাগিয়ে খাবার সার্ভ করে, কোথায় নাইট ক্লাবের আলো সারাক্ষণ জ্বলে অথবা পুরনো রেকর্ড আর ক্যাসেটের দোকানের গান ভেসে আসে, সিনেমা, থিয়েটার দেখা, বড় শপিং সেন্টারে ঢুকে অকারণে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে সময় কাটানো–এসব এখন নখদর্পণে। হাইড পার্ক, মাদাম তুসো, সোয়াস, টেট গ্যালারি, কিউই গার্ডেন, টেমস নদী, আর্ট গ্যালারি–নইলে দূরে কোথাও, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, লিডস, বার্মিংহাম, ব্রাইটন, ডোভার–নাহ, অনেক কিছুর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যদিও সাবিহা বানু ফোনে সব সময় বলে, শেখার জন্য যা লাগে খরচ করবি, আমার মেধাবী ছেলেটি কোথাও আটকে যাবে এটা আমি ভাবতেই পারি না। সোনা আমার, অনেক বড় হবি। অনেক কিছু শিখতে হবে তোকে। হায়, মায়ের কত স্বপ্ন ছেলেকে নিয়ে! মানুষ’ হওয়ার শিক্ষাটাও তো এর মধ্যেই পড়ে। মা তো আলাদাভাবে মানুষ হওয়ার কথা বলে না। মা তো জানে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া কি। কিন্তু খটকা লাগে তন্ময়ের, ও ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে কি মা এভাবেই লালন-পালন করত, এভাবে স্বাধীনতা দিয়ে নিজের মতো করে বড় হওয়ার স্বাধীনতা? তন্ময় দুচোখ এক করার আগে ভাবে, বোধহয় না। এজন্যই তো নীলিমাদের চোখে এত জল।
