তাহলে বোঝ আমি কেন ওকে পছন্দ করি।
তোমার পছন্দ আর আমার পছন্দ একরকম হবে না।
সে তো অবশ্যই, তুমি তো নারী, তুমি ওর বাহুবন্ধনে ধরা দিতে চাইতে পারো।
তুমিও পারো। গে-রা কী করে জানো না!
তখন নীলিমার হাতে কষে একটা চাপ দিয়ে বলে, এখানেই তোমার বৈশিষ্ট্য। জুতসই জবাব দিতে তোমার জুড়ি নেই নীলিমা।
তখন ম্যাথুজ কুঁচকে চোখ তোলে। তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে।
তন্ময় নীলিমাকে দেখিয়ে বলে, আমার বন্ধু নীলিমা।
ম্যাথু ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, নাইস টু মিট ইউ।
নীলিমা টের পায় ম্যাথু ওর হাতে বেশ জোরে চাপ দিয়েছে। চাপটা শুধুই হ্যান্ডশেকের নয়, আর একটু অন্যকরম। ও সরাসরি ম্যাথুর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়, সে গোঁফের নিচে ম্যাথুর ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা এবং সঙ্গে সঙ্গে ও এমনটা ভাব দেখায় যেন কাস্টমার রিসিভ করছে। নীলিমা বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য কথা বাড়ায় না, এমনকি তন্ময়ের কাছেও বিষয়টি এড়িয়ে যায়। ম্যাথু চেয়ারে বসতে বসতে নীলিমাকে বলে, এগুলো সব আমার নিজের হাতে বানানো।
খুব সুন্দর! নীলিমার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস।
লকেটগুলো নানা আকৃতির স্ফটিকের পাত। একটিও আকারে এক ইঞ্চির বেশি নয়। গাঢ় উজ্জ্বল রঙ যেন ছিটকে বেরুচ্ছে। গাঢ় গোলাপি, সমুদ্র নীল, মিশমিশে কালো, অনন্য বেগুনি, না বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। ছোট ছোট পাথরের ওপর ম্যাথু নানা ভঙ্গির পরী, টিকটিকি, ফুল, ব্যাঙ, পাখি ইত্যাদি বসিয়ে দিয়েছে। এগুলো রুপোর তৈরি, আকারে এক ইঞ্চির চার ভাগের এক ভাগ। একটা গোল পাথরের ওপর পরী বসানো লকেটটা তন্ময়ের খুব পছন্দ হয়। পরীর পা জোড়া বাঁকানো, বুকের কাছে হাত জড়ো করা, ডানা দুটো দেখে মনে হয় আকাশে বুঝি উড়ে যাচ্ছে। তন্ময় নীলিমাকে দেখিয়ে বলে, এই লকেটটা সুন্দর না? অনিমার জন্য কিনতে চাই।
হ্যাঁ, খুবই সুন্দর, কিনো ফেল।
তন্ময় নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, আমি জানি ওকে খুব মানাবে, ও আমার শ্যামল পরী।
হা-হা করে হাসে নীলিমা। বলে, অনিমা তোমাকে বেশ পাগল বানিয়ে ফেলেছে।
নীলিমার কথা শুনে তন্ময় বলে,মায়ের কাছে শুনেছি কামরূপ। কামাখ্যায় নাকি পরীরা থাকে, ওরা পৃথিবীতে এসে বেছে বেছে সুন্দর ছেলেদের ধরে নিয়ে যায়। তারপর ওদেরকে পাগল বানিয়ে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিয়ে যায়। বলো তো কেমন অদ্ভুত কাণ্ড!
কিন্তু ছেলেরা যদি পাগল হয়েই ফিরবে তবে পরীদের কথা বলে কী করে? সমাজটাই এমন। পুরুষের তৈরি তো, নিজেদের ইচ্ছেমতো গল্প বানায়।
শুরু হয়ে গেল তোমার নারী-পুরুষ আলোচনা।
শুরু তো হবেই, তোমাদের অত্যাচারে যে আমরা অতিষ্ঠ। শোনো, একটা ছেলে পাগল হলে সেটা অসুস্থতা, আর একটি মেয়ে পাগল হলে তাকে ভূত বলা হয়। চিন্তা করো পরী আর ভূতের পার্থক্য। ছেলেরা ভালোবাসলে মেয়েটি হয় পরী, আর মেয়েটির কোনো দোষ পেলে তাকে বানায় ভূত। গায়ে ভূত ছাড়ানোর পদ্ধতি দেখেছ? কী বীভৎস। যে অত্যাচার মেয়েটিকে সহ্য করতে হয় তার কণামাত্র ছেলেটিকে করতে হয় না।
ম্যাথু হাসতে হাসতে বলে, তোমরা কি কোনো ইস্যুতে ডিবেট করছ?
নীলিমা গলা ভারী করে বলে, করছি। জেন্ডার ইস্যুতে ডিবেট।
জেন্ডার ইস্যু আমি বুঝি না। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করিনি।
ঠিক আছে, আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেব।
তুমি একটাও লকেট নেবে না?
নেব, তবে আর একদিন আসব, একা। তন্ময় আমার সঙ্গে আসবে না।
খুব ভালো, ম্যাথু হাসতে হাসতে মাথা ঝাকায়। ওর রঙিন চুলের গুচ্ছ এলোমেলো হয়ে যায়, দারিদ্র সত্ত্বেও ওকে বেশ সুখী মানুষই মনে হয়। ও আবার নিজের কাজে মন দেয়।
দুজনে অন্যদিকে যেতে যেতে বলে, একটা জিনিস খেয়াল করেছ যে আমাদের দেশের দোকানদারের মতো ওরা ডাকাডাকি করে না। যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
নিরক্ষর, প্রায়-নিরক্ষর, তারপর গরিব দেশের মানুষেরা পরিশীলিত হতে সময় লাগবে নীলিমা।
যাক এসব। চলো তোমাকে নান্দোস চিকেন খাওয়াই। খেয়েছ?
না, এই প্রথম তোমার কাছে নাম শুনলাম।
এটা একটি পর্তুগিজ রেস্টুরেন্ট। চিকেনের জন্য বিখ্যাত। অসম্ভব ঝাল মুরগি ভাজা হয়, পেরিপেরি সস দিয়ে খেতে হয়। ঝাল খেতে পারবে তো?
খুব পারব। তুমি পারলে আমি পারব না কেন?
ও আচ্ছা, প্রতিযোগিতা ভাবছ। ঠিক আছে ধরলাম বাজি।
দুজনে নান্দোসে ঢোকে। দুজনের ক্ষিদে পেয়েছে। নীলিমা ঝাল পেরিপেরি মুরগির অর্ডার দেয়। যে ছেলেটি অর্ডার নিচ্ছিল দুবার জিজ্ঞেস করে সবচেয়ে ঝালটাই চাচ্ছে কি-না। নীলিমা বিরক্তির ভাব দেখিয়ে মাথা ঝাকায়। টেবিলে বসতে বসতে নীলিমা বলে, কত আর ঝাল দেবে, দেখিই না। সঙ্গে তো ভাত আছে। জিহবা বেশি পুড়লে কোক খেতে থাকব। কী বলো? তন্ময় কথা বলে না। বাড়িতে ওর মা মাঝে মাঝে ঝাল দিয়ে রান্না করে। বেশি ঝালের তরকারি খাওয়ার অভ্যেস ওর নেই। সেজন্য ভেতরে ভেতরে তন্ময় একটু দমে থাকে। বেশ সময় নিয়েই ওরা খাবার সার্ভ করে। চমৎকার ভাজা মুরগি, ভাতের রঙ হলুদ, ঘ্রাণে জিভে জল আসে। কিন্তু এক টুকরো মুখে দিতেই দুজনের নাক-চোখ দিয়ে দরদরিয়ে পানি ঝরে। পর্তুগিজ ছেলেটা কাছাকাছি কোথাও ছিল, দ্রুত এসে মিষ্টি জাতীয় কিছু একটা সামনে দিয়ে চলে যায়। নীলিমাও ঝালে কাবু হয়ে গেছে, এত ঝাল ও আন্দাজ করতে পারেনি। কোক আর পর্তুগিজ পিঠা খেয়ে জিহ্বা সামলায়। তন্ময় সামলে নেয় নিজেকে, কিন্তু দেখতে পায় নীলিমার চোখের পানি আর ফুরাচ্ছে না। তন্ময়ের মনে হয় নীলিমা কাঁদছে, কিন্তু কেন? ও প্রবল অস্বস্তিতে নীলিমার বাম হাতের ওপর চাপ দিয়ে বলে, তুমি কি কাঁদছ?
