পাত্র বলছ কেন, ব্যাকরণের ভুল, তুমি পিছিয়ে থাকার পাত্রী নও।
এখানেই তোমার সঙ্গে আমার ভাবনার তফাত। তুমি নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি বোঝ না।
ঠিক আছে তুমি বুঝিয়ে দিও। আমি বুঝতেই চাই, যাতে অনিমা এ বিষয়ে আমাকে ঘায়েল করতে না পারে। তোমাকে দেখেই বুঝেছি সংসার একটি কঠিন ক্ষেত্র।
হো-হো করে হাসে নীলিমা। হাসতে হাসতে বলে, তোমাকে আমার কথা শোনাব। বুঝবে কীভাবে লড়াইটা হয়। তোমার সঙ্গে আজ আমি ক্যামডেন টাউনে যাব। আমার কিছু কেনাকাটা আছে। যাবে নাকি অজুহাত দেখিয়ে কেটে পড়বে?
তোমার খোঁচা হজম করতে করতে আমি অস্থির। একটুও ছেড়ে কথা বলো না। চলো যাই।
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ক্যামডেন টাউনে আসে। ওখানে একটি লেক আছে, লেককে যুক্ত করে আছে একটি সেতু। সেতুর ওপারে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে ক্যামডেন রোডের দুপাশে খোলাবাজার। নীলিমার ছেলেমানুষি উচ্ছাস উছলে পড়ে নানা জিনিসকে নিয়ে। সারি সারি লোহার স্ট্যান্ডে হ্যাঙ্গার টাঙিয়ে পুরনো কাপড় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। শত শত জিনসের প্যান্ট আর শার্ট। নীলিমা তিন-চারটে প্যান্ট-শার্ট কেনে। শার্টের রঙ বাছাই করে দিতে হয় তন্ময়কে। নীলিমা হাসতে হাসতে বলে, আমাদের বৈশাখী মেলার মতো মনে হচ্ছে।
বৈশাখী মেলা হবে কেন? বঙ্গবাজারের মতো লাগছে।
মোটেই না। বঙ্গবাজারের দোকানগুলো খোলা জায়গায় নয়।
তা ঠিক বলেছ। সামনে গেলে বৈশাখী মেলার ক্যারেক্টারটা আরো স্পষ্ট হবে।
দুজন সামনে এগিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নীলিমা তন্ময়ের হাত চেপে ধরে। ভিড় ঠেলে এগুতে হচ্ছে দুজনকে। নীলিমা হাঁটতে হাঁটতে বলে, ঢাকায় এমন ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হলে কত যে পুঁতো খেতে হতো। এখানকার ভিড় বেশ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে মানুষের শরীরের উষ্ণতার চমৎকার গন্ধ আছে। ভিড় ঠেলে দোকানগুলো দেখতে বেশ লাগছে। দেখো দেখো কাপড় দিয়ে কী সুন্দর খাপড়া তৈরি করা হয়েছে। সেখানে টেবিল পেতে নানারকম জিনিস রাখা হয়েছে।
এখানে এলে আমি উইন্ড চাইম দেখতে ভালোবাসি। দেখো বাতাসে কী সুন্দর টুংটাং বাজছে।
তুমি কি তোমার রুমের জন্য একটা কিনেছ?
না, কেনার কথা আমার মনে হয়নি, বরং এখানে এসে ওই শব্দটা শুনতে আমার ভালো লাগে। ঘরে থাকলে এখানে এসে শোনার আগ্রহ কমে যাবে।
আমি একটা কিনব।
কিনে ফেল। সারাক্ষণই শুনতে পারবে।
নীলিমা একটা উইন্ড চাইম কিনে বলে, এটা হাতে নিয়ে আমি দাঁড়াচ্ছি। তুমি এই ভিড়সহ আমার একটা ছবি তোলো তন্ময়।
তন্ময় ছবি তুলে দিয়ে বলে, একটা জিনিস আমার খুব প্রিয়। দেখো মাঝখানে সরু পথ, দু’পাশের দোকানগুলো একদম মুখোমুখি। যেখানেই যাই না কেন টুংটাং শব্দ আমার কানে পৌঁছে। এ গভীর আনন্দ আমি উপভোগ করি। আমার এখন মায়ের কথা মনে পড়ে।
অনিমার কথা মনে পড়ে না?
এই প্রসঙ্গে মাকেই মনে পড়ে বেশি। অন্য প্রসঙ্গে অনিমা আমার স্মৃতিতে আসে।
বাহ তুমি বেশ ব্যালান্স করতে পারো।
এটা আবেগের ব্যাপার নীলিমা, ব্যালান্সের ব্যাপার নয়। মাঝে মাঝে তোমার কথা শুনলে আমার খুব রাগ হয়।
ইচ্ছে করে আমাকে ছুড়ে ফেলে দিতে?
হ্যাঁ, তাও হয়।
তাহলে লেকের জলে ফেলে দাও।
একদিন কাজটা করেও ফেলতে পারি, কে জানে।
নীলিমা হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, তুমি খুব মজার ছেলে। অনিমা তোমাকে নিয়ে সুখে সংসার করতে পারবে।
হয়েছে আর জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করতে হবে না। ওই দেখো সামনে কত জিনিস মোমবাতি, ফটোফ্রেম, খেলনা, চাদর বালিশের কভার, কাঠের চেয়ার, টেবিল, হাঁড়ি-পাতিল, চামচ–
হয়েছে থামো। ওসব কেনার আমার ইচ্ছা নেই। তোমার ম্যাথু কই? ও নিজেও কি এইসব হিপ্পির মতো সাদা ধুতি আর ভারতীয় বুটিকের ঢোলা পাঞ্জাবি পরেছে? এক একটাকে কেমন ফানি লাগছে না–
আমি মজা পাই।
ছবি তোলোনি?
অনেক ছবি তুলেছি। দেশে গিয়ে দারুণ একটা এক্সিবিশন করব।
আছো ধান্দায়।
এটাকে তুমি ধান্দা বলছ? ফটোগ্রাফি আমার ক্রিয়েটিভ কাজ। বুঝতে পারছি ক্লাসগুলো তুমি ঠিকমতো ফলো করো না।
ঠিকই ধরেছ, টিচারদের কথা শুনতে শুনতে আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাই।
আমার জীবনের কথা আমি তোমাকে শোনাব তন্ময়। তাহলে হয়তো খানিকটুকু হালকা হবো। তুমি শুনবে তন্ময়?
শুনব, একশবার শুনব। এখানেই তো তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, অন্যরা তো ক্লাসের বন্ধু, কিংবা যাওয়া-আসার পথের সাথী।
থ্যাঙ্কু তন্ময়। চলো না ম্যাথুর কাছে যাই।
তন্ময় ভিড় ঠেলে নীলিমাকে ম্যাথুর কাছে নিয়ে আসে। হিপ্পিদের বিভিন্ন দোকানে ভারতীয় জিনিসে ভরা, কিংবা আফ্রিকার কোনো কোনো দেশের কিন্তু ম্যাথু বোধহয় চীনের ভক্ত, ওর দোকান চীনা জিনিসে ভরা। এছাড়াও নিজে বিভিন্ন ধরনের লকেট বানায়। তন্ময় আর নীলিমা গিয়েও দেখল যে ম্যাথু একমনে লকেট বানাচ্ছে। দুজনে প্রথমে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, ম্যাথুর মনোযোগ নষ্ট করতে চায় না–ওর গ্যাট্টাগোট্টা শরীর, রঙ করা চুল, চেহারা খানিকটা ক্লিষ্ট, যেন অভাব তাকে ছাড়ে না, কিংবা যে রোজগার করে মদ খেয়ে বা জুয়া খেলে উড়িয়ে দেয়। জামাটা মলিন এবং ছেড়া, ইচ্ছা করে ছিড়েছে তা নয়। পুরনো হাওয়ার কারণেই ছিড়েছে, তারপরও ম্যাথু হিপ্পি। ওর পুরো অবয়বে এলোমেলো জীবনের ছাপ সুস্পষ্ট। শরীরের পেশিতে যৌবনের উন্মত্ততা আছে, চেহারার সঙ্গে যার অনেক ফারাক। নীলিমা ফিসফিস করে বলে, লোকটা বেশ হ্যান্ডসাম এবং অদ্ভুত।
