তন্ময় মৃদু হেসে নিজেকে ফোন বুথের কাছ থেকে সরিয়ে আনতে আনতে বলে, তোমার কথাই ঠিক অনিমা। আমি এখন থেকে মানবজীবনের সমতার জায়গাগুলো খুঁজব। আর প্রতিদিন একটি করে চিঠি লিখব, যেমন মাকে লিখি, আমার ভবঘুরে জীবনে এতদিন মা ছিল আমার চিঠির যোগসূত্র, এখন যুক্ত হলে তুমি। আমি তোমাকে রোজ। একটি করে চিঠি লিখব অনিমা।
ছোট একটা সুটকেস ছিল সঙ্গে ইচ্ছে করে বেশি বোঝা টানেনি, ও মাকে বলে দিয়েছিল যে পরিচিত কারো কাছে আমি যাব না, আমি এখানে যেমন ঘুরে বেড়ানো দিন কাটাই তেমন করেই বিদেশেও কাটাব মা। ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিচ্ছ, দাও, কিন্তু যোগাযোগ করতে বলো না।
যদি কোনো বিপদে-আপদে পড়িস?
আচ্ছা, তেমন হলে যোগাযোগ করব, শুধু তোমাকে খুশি করার জন্য মা।
দেখো ছেলের কথা!
সাবিহা বানু ছেলের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেজন্য তন্ময়ের সঙ্গে লটবহর নেই, দেশ থেকে নানা মানুষের জন্য নানা কিছু আনার ঝক্কি-ঝামেলা নেই। নিঝঞাট অনুভবে তন্ময় খুব ফুর্তি অনুভব করে। আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থেকে রেলে উঠে ও বাইরে তাকালে জীবনের জলছবি ওকে মায়ার বাঁধনে টানে। কী অপূর্ব লাগছে চারদিক! বাড়িঘর তেমন নেই, এখন পর্যন্ত দিগন্ত-বিথারি প্রান্তরজুড়ে অজস্র রঙের বিন্যাস, মিষ্টি রোদ, নীলাকাশের প্রান্তছোঁয়া নেমে আসার সঙ্গে নিজের দেশের সাদৃশ্য পেয়ে ও ভাবে, দিনগুলো ভালোই কেটে যাবে। অনিমা আমি তোমার কাছে ফিরে আসছি।
প্রথম দিনই ডরমিটরিতে পরিচয় হয় নীলিমার সঙ্গে, ও বাংলাদেশের মেয়ে। চট্টগ্রামে বাড়ি। বাবা শিল্পপতি, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় পরে পড়তে এসেছে। বলেছে, দেশে না-ও ফিরতে পারে। কোর্স শেষ হলে ফেরার কথা ভাববে।
তনায় পরিচয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের সম্পর্কে এত কথা বলেনি। আগ বাড়িয়ে এত কিছু বলে দিলেই কি একজন মানুষের পরিচয়ের পর্ব শেষ হয়ে যায়? কত খোসা যে ছিলতে হয় তার কি শেষ আছে! তন্ময় গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। নীলিমা খানিকটা অবাক হয়। ভাবে, ছেলেটার সৌজন্য জ্ঞান কম, নাকি ও নারীর সঙ্গে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে না? নীলিমা দ্বিধা নিয়ে ক্যান্টিনে খেতে যায়।
ওদের ক্লাস শুরু হয়েছে। নভেম্বর মাস। ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছে। ছেলেমেয়েরা বলাবলি করছে যে লন্ডনে নভেম্বর মাস খুব বাজে সময়। এ সময়ে আবহাওয়া বুঝে ওঠা দায়, হাড়-কাঁপানো শীতের সঙ্গে এই বৃষ্টি এই রোদ। প্রত্যেকেরই মেজাজ খারাপ। এমন আবহাওয়া সব আনন্দ মাটি করে দেয়। ক্লাসের বাইরে ডরমিটরির টানা বারান্দায় মাঝে মাঝে নীলিমার সঙ্গে দেখা হয়, হাই-হ্যালো হয়, এ পর্যন্তই। বড়জোর। আবহাওয়া নিয়ে কথা। ও তেতেমেতে বলে, দেখেছ কাণ্ড, এখানকার আকাশ দেখে মনে হচ্ছে কালো মেঘ এই আকাশের স্থায়ী ঠিকানা। দেশে বসে বর্ষার কালো মেঘ দেখে উফুল্ল হতাম, এখানে দেখতে পাচ্ছি তার উল্টো। এই আকাশ মেজাজ ঠিক রাখতে দেয় না। তারপরও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি লেগে থাকে। যত্তসব।
আমার কিন্তু ভালোই লাগছে। নতুন কিছু যদি দেখতে না পাব তাহলে এলাম কেন? এখানে এসে যদি সেই দেশের ছবি বা আবহাওয়া পাব তাহলে–
বুঝেছি, যা কিছু উল্টাপাল্টা সেটাতেই তোমার আনন্দ। প্রথম দিনই। টের পেয়েছি যে তুমি একটা চিজ!
বাপস, চিজ! তুমি তো বেশ স্মার্ট মেয়ে। ঠাসঠাস কথা বলতে পারো। আরে বাব্বা।
হয়েছে রাখো, গেলাম।
কোথায়?
শুড়িখানায়। যাবে?
না, আমি ম্যাথুর ওখানে যাব। ও একটা দারুণ হিপ্পি। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে।
ওর ওখানে আমাকে একদিন নিয়ে যেও তন্ময়। নেবে তো?
হ্যাঁ, যেও একদিন। আপাতত গুঁড়িখানা সেরে এসো।
নীলিমা চলে যায়। তন্ময় নিজের ঘরে আসে। বাইরে বেরুলে বৃষ্টির ছাঁট বরফের ছুরির মতো এসে বেঁধে। মা ওকে শীতের পোশাক কিছুই দেয়নি, বলেছিল ওখানে গিয়ে কিনে নিবি, আসার সময় ফেলে আসবি।
সোনা মা আমার, দারুণ আইডিয়া তোমার।
আইডিয়া হবে না। আমার ছেলেকে তো আমি চিনি। বোঝা যত কম হবে ওর সুখ তত আকাশছোঁয়া হবে। ছেলেকেই যদি না চিনব তো কেমন মা আমি!
এখানে এসে ও ওভারকোট, সোয়েটার, মাফলার, মোজা, উলের টুপি সব কিনেছে ক্যামডেন থেকে। এসব কিনতে গিয়েই তো ওর ম্যাথুর সঙ্গে পরিচয় হয়। ক্যামডেন টাউন বেশ মজার জায়গা। শনি আর রবিবারে এখানে অস্থায়ী দোকানের খোলাবাজার বসে, এটা হিপ্লিদের রাজত্ব–দোকানের মালিক বেশিরভাগ ওরাই। কত বিচিত্র ধরনের পোশাকই যে ওরা পরে। জিনসের প্যান্ট বিভিন্ন জায়গায় কেটে রাখে, কখনো টেনে হেঁড়ে, সুতো বেরিয়ে থাকে, সঙ্গে টি-শার্টও ঘেঁড়ার ফ্যাশন। তন্ময়ের মনে হয় ওর সঙ্গে অনিমা থাকলে হেসে গড়িয়ে পড়ত–বলত, তন্ময় আমি তোমাকে এই পোশাকে দেখতে চাই, বুঝব তুমি কতটা অচেনা হয়ে যেতে পারো আমার কাছে।
ও নিজেকেই বলে, না আমি তোমার কাছে অচেনা হয়ে যেতে চাই না। আমি তোমার চেনা মানুষ হয়ে থাকতে চাই কুট্টি সোনা।
লন্ডনে তো কত ধরনের মানুষ থাকে, কত দেশের ছেলেমেয়ে এখানকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ওদের মতো পারিপাট্য হিপ্পিদের নেই। নিজেকে অবহেলা করে ওরা আনন্দ পায়, মনে হয় অবহেলাই ওদের ভূষণ। মাঝে মাঝে কেউ কেউ আনরুলি হয়ে যায়, তখন ওদেরকে ভয় লাগে। মারমুখী ছেলেমেয়েগুলো অনেক সময় ক্ষিপ্ত হলে আক্রমণ করে। একথা শুনে নীলিমা বলেছিল, মারপিট করতে আমার খারাপ লাগে না। এ ব্যাপারে আমি পিছিয়ে থাকার পাত্র নই।
