ব্যাগ হাতড়ে সখিনার ফুল নিয়ে তোলা ছবিটা ওর হাতে দেয়। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছবিটাও।
সখিনা ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, এইডা আমার ছবি না। আপনে এইডা ফেরত লন।
ও স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছবিটা ফেরত দেয়। তন্ময় ছবিটা না নিয়ে বলে, আমার মায়ের কাছে থাকলে তোমার ছবিটা এমনই হবে। চলো। সখিনাকে নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে চিঠি লেখে মাকে, মা, আমার ধরিত্রী মা, আমি খুব ভালোভাবে জানি যে সখিনা তোমার কাছে আশ্রয় পাবে। ওকে তুমি পড়ালেখার সুযোগ করে দেবে ওকে নিজের পায়ে। দাঁড়ানোর তৈরি হওয়ার সুযোগ। এটুকু করতে তোমার একটুও কষ্ট হবে না মা। ওর দিকে তাকাও, দেখো ঘুটে কুড়ানি মায়ের সঙ্গে তোমার তন্ময়ের শৈশব খুঁজে পাও কি-না, মনে করো আমিই সখিনা, একদিন যাকে তুমি বুকে তুলে নিয়েছিলে। তোমার ঝোড়কাক তন্ময়।’
সখিনার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে সাবিহা বানু পাগল ছেলেটার জন্য ভীষণ মমতা অনুভব করে। পড়া হলে সখিনাকে বলে, পড়ালেখা শিখবি?
সখিনা ভয় পেয়ে যায়। ভীষণ ভয়ে মাথা নেড়ে বলে, না, পড়ালেহা শিখুম না। আমি আপনের কাম কইরা দিমু, আপনে আমারে ভাত-কাপড় দিবেন।
কিন্তু তোকে যে লেখাপড়া শেখাতে বলেছে আমার ছেলে।
ও খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলে, সত্যি, তাইলে আমি লেখাপড়া শিখমু। স্কুলে যামু।
সাবিহা ওর মাথায় হাত রেখে বলে, তাই হবে। যা গোসল করে আয়।
সখিনার দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সাবিহার মনে হয়, তন্ময় ওকে নানাভাবে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করে, এটা যেমন নিজের দায়িত্ববোধ থেকে, তেমন মায়ের কথা ভেবেও, জানে মা এসব ভালোবাসে। দু’জনে মিলেই জগৎটা গড়তে চায়।
অনিমার সেদিন স্কুল বন্ধ। বাবা,অফিসে। ও এক টুকরো কাগজে লেখে। আর কত দিন অপেক্ষা কর? কবে আসবে তুমি! নাকি কোনো। দূর এলাকায় গিয়ে ভুলেই গেছ আমাকে। কাগজটা পাখির আকারে ভজ করে দেয়ালে টাঙানো ছোট একটি সুচের কাজ করা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। পাখির আকারে চিঠিতে ব্যাগটা ভরে উঠেছে। হঠাৎ ট্রেন আসার শব্দে চমকে ওঠে। ছুটে আসে প্লাটফর্মে। মাসুম সবুজ পতাকাটা ভাঁজ করে এগিয়ে আসে।
আপা, আপনি বসেন। আমি দেখি।
না, আমি দেখব। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকো।
অনিমা এগিয়ে গিয়ে ট্রেনের কামরায় উঁকি দেয়। ট্রেন চলে যায়। ট্রেনের শেষটুকু অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বলে, কী পাগলামি! তন্ময় এলে তো ও নিজেই ট্রেন থেকে নামবে। আমার খুঁজতে হবে কেন? মাসুম পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে, আপা বাড়ি চলেন। অনিমা বিরক্ত হয়ে বলে, বাড়িতে কেন যাব? বাড়িতে কে আছে? আমার তো বাড়ি ভালো লাগে না।
মাসুম মনে মনে বলে, ভালো তো লাগবেই না! তন্ময় ভাইয়ের মতো মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তার না থাকাটা যে কী কষ্টের তা আমিও বুঝি। আপনি তো আরো বেশি বুঝবেন আপা।
অনিমা বাড়ি যাবে না ভেবেই বাবার অফিস ঘরের দিকে যায়। শুনতে পায় তৌফিক ফোনে জোরে জোরে কথা বলছে তার চাচাতো ভাই সাদেকের সঙ্গে। অনিমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবার প্রতিটি শব্দ যেন এক এক খণ্ড পাথরের টুকরোর মতো ওর বুকের ওপর চেপে বসে।
সাদেক তুমি কেমন আছ ভাই? না, আমার শরীর বেশি ভালো না। কেবলই মনে হয় কখন আছি, কখন নেই। আমি না থাকলে মেয়েটার আর কে থাকবে। হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি তো জানি তোমরা আমার মেয়েটাকে তোমাদের কাছে নেয়ার অপেক্ষায় আছ। তারেক এখন কি ঢাকায়? ভালো চাকরি করছে? শুনে খুব খুশি লাগছে। যাহোক, তোমরা একবার আসো। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য কথাবার্তা বলি।
অনিমার আর বাবার অফিসে ঢোকা হয় না। ও বাড়ি ফিরতে থাকে। যেন প্রবল ঝড় মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে, ও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, এত অন্ধকার নেমেছে পথে। ওর পথ আটকায় তুলি আর কলি।
আপা সেই ভাইজান আমাদের ছবিগুলো দ্যায় নাই?
তোমাদের ভাইজান তো এখনো ফিরেনি। যখন ফিরবে তখন ঠিকই তোমাদের ছবিগুলো আনবে।
এতদিনে যহন আসে নাই, আর বোধঅয় আসবে না। শহরের মানুষগুলোই এমুন। যাই আপা।
অনিমার মনে হয় ঝড় থেমে গেছে। থমথম করছে চারদিক। ও বুকভরা শূন্যতা নিয়ে বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ায়। তালা খোলে। স্টেশনের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি আমাকে চিঠি লেখো না কেন তন্ময়?
তন্ময় এখন লন্ডনে।
হঠাৎ করেই এসে পড়েছে, অনিমাকেও বলার সুযোগ হয়নি। সাবিহা বানুই ছেলেকে ফটোগ্রাফিতে একটি কোর্স করানোর জন্য নিজের উদ্যোগেই ব্যবস্থা করেছে। ছয় মাসের কোর্স। বলেছে, দেখতে দেখতে কেটে যাবে বাবা। তাছাড়া ইচ্ছে করলে তুই আরো ছয় মাস বেশি থেকেও আসতে পারিস। তন্ময় মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, এত দিন আমাকে না দেখে থাকতে পারবে তুমি?
দেশে থাকলেই কি তুই আমার চোখের সামনে সারাক্ষণ থাকিস? ঘুরে বেড়াস না?
বেড়াই তো। ঘুরতে না পারলে আমার দম আটকে আসে। আমি তোমার ভবঘুরে ছেলে।
হিথ্রো বিমানবন্দরে সব কাজ চুকিয়ে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস নাক-মুখ ছুঁয়ে যায়। হালকা তুষার ঝরে পড়ছে। বেশ লাগছে ওর। প্রথমে টাকা ভাঙায়, তারপরে মায়ের সঙ্গে কথা বলে। ফোন বুথের সামনে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, অনিমার জন্য বুকের ভিতর টান ওঠে, কিন্তু অনিমাকে ফোনে যোগাযোগ করা যাবে না। ও একটি চমৎকার রেল স্টেশনে বাবার সঙ্গে থাকে, বাবা স্টেশন মাস্টার, যেখানে হুইসেল বাজিয়ে দারুণ শব্দ করে রেলগাড়ি ঢোকে, সেই শব্দের সঙ্গে ও নিজের বুকের ভালোবাসার ধ্বনি এক করেছে, অনিমা এখন ওর সবচেয়ে প্রিয় নারী, যার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে, চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলবে, দাও তোমার হাতটা ধরি। আমাদের যাত্রা শুরু। ভেব না তুমি আমার প্রভু, আমরা ভালোবাসার কাঠগড়ায় দুজনে একসঙ্গে দাঁড়াব। জানবে, জীবনের সত্যে নারী-পুরুষের অবস্থানগত ভেদ নেই।
