তন্ময়ের মনে হয় অনেক দিন হলো এখানে। এবার মায়ের কাছে। যেতে হবে। মাকে অনিমার কথা বলতে হবে। বিয়ের আয়োজন করতে হবে। অনিমাকেও সে কথাই বলে।
আমার মাকে তোমার কথা বলার জন্য ঢাকায় যেতে হবে অনিমা। মা ভীষণ খুশি হবেন। তারপর আমি আবার ফিরে আসব।
কবে আসবে?
যত দিন না আসি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে অনিমা।
অপেক্ষা! অনিমার জ কুঁচকে চায়–বিষণ্ণ হয়ে যায় দৃষ্টি।
এই শব্দটা কি তোমার কোনো দুঃখের কারণ?
অনিমা মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। আসবে বলে ফিরে আসেনি। দুর্ঘটনায়–
থাক, আর জানতে চাই না। আমি ঠিকই ফেরত আসব অনিমা। দাও, তোমার হাত ধরি। দেরি হলে ভেব আমার ঘুরে বেড়ানো স্বভাবের কারণে দূরে কোথাও চলে গেছি কিংবা মায়ের কোনো কাজে যদি আটকে যাই তাহলে দেরি হতে পারে। কিন্তু ফিরব, তোমার কাছে আমাকে ফিরতেই হবে।
শুধু জেনো যত দিন না আসসা, তত দিন ট্রেন এলেই আমি প্লাটফর্মে এসে দাঁড়িয়ে থাকব তোমার জন্য।
থেকো। ফিরে এসে অন্য কাউকে দেখার আগে আমি তোমাকেই দেখতে চাই।
চলে যায় তন্ময়।
অনিমার দিনগুলো আবার আগের মতো হয়ে যায়। ঘর-স্কুল-স্টেশন–একই মানুষ চারদিকে। একদিন বাবাকে তন্ময়ের জন্মের কথা বলতেই ক্রোধে ফেটে পড়ে তৌফিক। ঘরময় পায়চারি করে। অনিমা চুপ করে বসে থাকে। ওর মাথা কাজ করে না। বাবাকে তো গোপন করার কিছু নেই। বাবাকে বলতেই হতো। কিন্তু ওর ভাবনা ওলটপালট করে দিয়েছে ওর বাবা। যে ছেলেটিকে কয়েক দিন ধরে তিনি এত কাছ থেকে দেখলেন, পছন্দ করলেন, এখন তার জন্মের পরিচয় বড় হয়ে গেল তার কাছে? অনিমার বুক ভেঙে যায়। রাগারাগি করে এক পর্যায়ে তৌফিক ঘোষণা দেয়, তোমার সঙ্গে তন্ময়ের বিয়ে আমি কিছুতেই মেনে নেব না। যে ছেলের জন্মের ঠিক নেই তার সঙ্গে বিয়ে!
বাবা জন্মের ঠিক নেই নয়, গরিবের ঘরে জন্মেছে।
ওই একই কথা হলো। অবৈধ সন্তান কি না তাইবা কে জানে!
বাবা, বাবা তুমি—
চুপ করো।
তোমার মতো এত খারাপ চিন্তা আমি করি না বাবা!
তৌফিক ধমক দিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে, তোমার মা নেই বলে ভেব না আমি তোমার সব আবদার মেনে নেব। আমি অনেক দিন সহ্য করেছি। আর করব না। আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলেটি তোমাকে পছন্দ করে। আমার কাছে ধমক খেয়ে ও আর আসে না, কিন্তু সেদিনও ওর বাবা আমাকে ফোন করে বলেছে, তার ছেলেটি তোমার অপেক্ষায় আছে।
অপেক্ষা!
হ্যাঁ, অপেক্ষা, অপেক্ষা। ওর বাবা ওকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে পারছে না। ওর বাবা আমার সঙ্গে রাগারাগি করছে।
অন্য একজন রাগারাগি করলেই তুমি তোমার মেয়েকে বলি দেবে!
তৌফিক রেগে ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, এটা বলি দেয়া হলো। একটি ছেলের ভালোবাসার মূল্য নেই তোমার কাছে? রাজিবের দুর্ঘটনার পরে আমি তোমাকে জোর করিনি। কিন্তু আমি আর একদিনও অপেক্ষা করব না। আমি সাদেক আলিকে বিয়ের কথা পাকা করার জন্য আসতে বলব। অনিমা অনুনয়ের স্বরে বলে, বাবা, আমার সোনা বাবা, তুমি আমাকে আর একটা বছর সময় দাও।
তৌফিক বিস্ময়ে চেঁচিয়ে ওঠে, এক বছর।
বাবা তোমাকে একা রেখে চলে যাওয়ার জন্য আমাকে তৈরি হওয়ার সময় দাও। বাবা আমার এই একটি কথা রাখো।
তৌফিক কেঁদে ফেলে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুই যা চাস তার বাইরে তো আমি যেতে পারব না। তবে মনে রাখিস এক বছর। এর একদিনও বেশি চাইতে পারবি না।
দিন গড়ায়। তন্ময়ের কোনো খবর নেই। অনিমার দিনগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। দিনগুলো ও ছাড়তে চায় না, ছেড়ে দিতে চাইলেই যে পাগলের মতো দৌড়াবে, সেজন্য ও দমবন্ধ করে দিনের গতি আটকে রাখে।
০৩. অন্যদিকে ঢাকায় এসে
অন্যদিকে ঢাকায় এসে মায়ের অসুস্থতায় আটকে পড়ে তন্ময়। সাবিহা বানু জরায়ু অপারেশনে এবং পরবর্তী জটিলতায় কয়েক মাস বিছানায় থাকে। একরকম যমে-মানুষে টানাটানি হয়। তন্ময় দূরে সরিয়ে রাখে নিজের প্রয়োজনীয় কথাটুকু। মা সুস্থ হলে আবার বাইরের টানে। ওর বেরিয়ে পড়ার তাড়না শুরু হয়। একদিন ভোরে মাকে চিঠি লেখে, মা, আমার পাগল করা মাগো, আমি আবার বের হচ্ছি। এবার একটু দূরেই যাব ভাবছি। তবে যেখানেই থাকি তুমি আমার চিঠি পাবে। তুমি ভালো করে সুস্থ হও। আমি ফিরে এলে আমার সঙ্গে ফুলমসি স্টেশনে যাবে। অনিমাকে নিয়ে আসব তোমার কাছে। তখন আমাদের জীবনের নতুন সূচনা হবে মাগো। তখন তোমার চেয়ে সুখী মানুষ এই পৃথিবীতে আর কে হবে! ইতি তোমার সোনালি ঈগল তন্ময়।
ঘুম ভেঙে ছেলের চিঠি পেয়ে সাবিহা বানু মৃদু হাসে। অসুখের পুরো সময়টা ও মায়ের যত্ন করেছে। খুব প্রয়োজন না হলে বিছানার পাশ থেকে নড়েনি। সাবিহা বানু ছেলের যত্নে ভীষণ খুশি। এমন ছেলে। পাওয়া ভাগ্য ছাড়া আর কি। বউ ঘরে এলে ও নিজেকে আটকাতে পারবে তো? সাবিহা বানু নিজেই চিন্তান্বিত হয়। ছেলেকে ভরসা করতে পারে না। মনে হয় তখনো ও মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যাবে।
মাকে চিঠি লিখে রেখে বেরিয়ে ফুল-বিক্রেতা ছোট সখিনার সঙ্গে ফুটপাথে দেখা হয় ওর। মেয়েটি পেছন থেকে দৌড়ে এসে ওর হাত ধরে।
আমার ছবি কই? দিলেন না তো?
ছবি তো আমার কাছেই আছে। আমি তো তোমাকে খুঁজতেই এই ফুটপাতে এসেছি। তুমি কেমন আছ সখিনা?
সখিনা ম্লান মুখে বলে, ভালা নাই। আমার মা মইরা গেছে।
তুমি আমার মায়ের কাছে থাকবে?
থাকুম। আমি একডা বাসায় থাইকা কাম করতে চাই।
গুড। তুমি একটা লক্ষ্মী মেয়ে।
