তোমার কথার আরো ব্যাখ্যা আছে আমার। মেয়ে দুটোর আকার, পোশাক, স্বাস্থ্যহীনতা এবং শাপলার বোঝা বলে দেয় সমাজে তার অবস্থান কী। সে ভাত খাবে না শুধু শাক খাবে, একজন অর্থনীতিবিদ বা রাজনীতিবিদকে তা বুঝতে হবে। যদি তিনি এমন একটি গ্রামের কথা নাও জানেন তবু এই ছবি কিন্তু সত্যই প্রকাশ করছে অনিমা। আর ওদের ওই স্নিগ্ধ নিস্পাপ সরলতা আমাদের জীবনে সত্য। আমরা এটা ধরে রাখতে চাই। একজন অর্থনীতিবিদ বা রাজনীতিবিদকে এই হাসি ধরে রাখার অঙ্গীকারে কাজ করতে হবে। এই সত্যি কি জীবনের সত্যি নয়?
বাব্বা, খুব সুন্দর বুঝিয়েছ, কেন যে তুমি শিক্ষকতা করলে না!
দুজনে রেললাইন পেরিয়ে প্লাটফর্মে ওঠে।
তৌফিক অফিসের কাজে ব্যস্ত। টেলিফোনে জংশন স্টেশনে কথা বলে ফোন রেখে দিয়ে ড্রয়ার থেকে অনিমার মায়ের একটি ছবি বের করে। ছবির দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, তোমার মেয়ে একটি ছেলেকে পছন্দ করেছে। ছেলেটিকে আমারও খুব পছন্দ হয়েছে। ওর বিয়ে দিতে পারলে আমার শান্তি হয়। ওকে একা রেখে আমি তো মরতে পারব না।
নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চোখের জল মোছে। দিন যত যাচ্ছে, বয়স যত বেড়েছে, মানসিক স্বস্তি ততই কমছে। তৌফিকের মনে হয়, এখনই মেয়েটার বিয়ে দেয়া উচিত। ওর জীবনও তো স্থির হতে হবে–মানুষের জীবনচক্রের স্থিরতা।
তখন ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢোকে মাসুম।
স্যার।
কী হয়েছে রে?
সিগনালটা ডাউন হচ্ছে না স্যার। বোধহয় কোনো সমস্যা হয়েছে।
আমি জংশন স্টেশনে ফোন করে দিচ্ছি। বিকেলের আগে তো কোনো ট্রেন আসবে না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
মাসুম স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পরে তন্ময়ের মুখোমুখি হয়। তন্ময়ের মনে হয় ও কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত। ও আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছ মাসুম?
মন খুব খারাপ তন্ময় ভাই।
গাঁয়ের একজন চাচি শহরে গিয়েছিল কাজ করতে। পাগল হয়ে ফিরে এসেছে।
পাগল হয়ে?
যাবেন দেখতে? আমি ওই বাড়িতে যাচ্ছি। মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে।
আমিও যাব তোমার সঙ্গে।
যেতে যেতে মাসুম তার চাচির অনেক গল্প বলে, কিন্তু সেই চাচি যে তাহেরা এটা তন্ময়ের জানা ছিল না। বাড়িতে ঢুকে তাহেরাকে দেখে ও স্তম্ভিত হয়ে যায়। তাহেরাকে বারান্দার খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। আলুথালু চেহারা। দৃষ্টিতে অসীম শূন্যতা সামনে এক থালা ভাত। ও মাসুমকে জিজ্ঞেস করে, উনি কবে শহর থেকে ফিরেছে মাসুম?
সাত দিন হলো। তাকে স্টেশনে দেখে আমি তো অবাক। তারপর বাড়িতে নিয়ে আসি। কীভাবে যে ঢাকা থেকে এসেছে আল্লাহই জানে।
ওদের গলা পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ফজর আলি ও হনুফা। ফজর আলি ওদের দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, আপনারা?
তন্ময় ফজর আলির বিরক্তি টের পায়। তারপরও সহজ কণ্ঠে বলে, ওনাকে দেখতে এসেছি। উনি শহরে আমার মায়ের বাড়িতে ছিলেন।
হনুফা খুশি হয়ে বলে, আপনের মা খুব ভালো মানুষ। বুজানরে মেলা টেকা দিছে। বুজান সব টেকা আমারে দিছে। আপনার মা একটা চিঠিতে লিখছেন যে, আপনাদের বাড়ির দারোয়ান ওনাকে ট্রেনে তুলে দিয়েছে। ওনার গলায় একটা কাগজ লাগায়ে দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন, ওনাকে য্যান ফুলমসি স্টেশনে নামায়ে দেওয়া হয়। আহা রে কত দরদ!
তন্ময় রাগত স্বরে বলে, ওনাকে বেঁধে রেখেছেন কেন?
ফজর আলি বিরক্ত কণ্ঠে বলে, খুব পাগলামি করে। বাড়ি ছাইড়া চইলা যায়।
হনুফা তড়িঘড়ি বলে, ওনারে মারতে যায়। একদিন দা নিয়া তাড়া করছিল। ক্যাবল আমারে কিছু কয় না। দিন দিন ক্যাবল পাগলামি বাড়তাছে। একদিন আমারেও মারতে আসবে।
ফজর আলি রেগে উঠে বলে, হইছে থাম। মাগির বেশি কথা। য্যান মায়ের প্যাডের বইন পাইছে একড়া। আপনেরা অহন যান। দেখলেন তো, আর কত দেখবেন।
তন্ময়ও রেগে বলে, রেগে যাচ্ছেন কেন? উনি আমার মায়ের যত্ন করেছেন। ওনার জন্য আমার দরদ আছে। আমি ওনার একটা ছবি তুলব।
তাহেরা কী বুঝল কে জানে? তন্ময়ের ক্যামেরা দেখে হি-হি করে হাসতে হাসতে ছবি তোলার জন্য পোজ দেয়। তন্ময় অনেকগুলো ছবি তোলে। ওর হঠাৎ মনে পড়ে যে ও আগে তাহেরার একটি ছবি তুলেছিল। ও ব্যাগ খুঁজে ছবিটা বের করে তাহেরার দিকে এগিয়ে দেয়। বলে, খালা আপনার মনে আছে কি যে আমি আপনার ছবি তুলেছিলাম? আপনি বলেছিলেন আপনাকে এক কপি দিতে। এই যে দেখেন, কী সুন্দর ছবি।
তাহেরা খপ করে ছবি নেয়। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে। তারপর টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ছুঁড়ে ফেলে। মাসুম টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বলে, চাচি এইগুলা জোড়া লাগাইয়া আপনেরে দিমু। আমাগো বেবাকেরই তো জোড়া লাগানো বাঁইচা থাকা।
মাসুমের কথাগুলো তন্ময়ের বুকের ভেতর ধাক্কা দেয়। ও নিজের দিকে ফিরে দেখতে গেলে সামনের দৃশ্যটা উলটেপালটে যায়। তারপর বিষণ্ণ হয়ে যায় ওর দৃষ্টি। ও তো জানে নিজেকে আড়ালে রেখে হেঁটে যাওয়া কত কষ্টের। তবু সত্যটা বুকের ভেতর খলবলিয়ে উঠলে ও জীবন খোঁজে, বেঁচে থাকার অর্থ খোঁজে এবং অর্থবহ জীবনের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তোলে। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে ফজর আলি ও হনুফার দিকে তাকিয়ে বলে, আপনাদের একটা ছবি তুলি?
হনুফা মহাউৎসাহে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, হ-হ তোলেন। তাহেরার পাগলামি পেছনে রেখে ফজর আলি ও হনুফার ছবি তোলে তন্ময়। তাহেরা তখন দু’হাতে চুল টানছে। চুল ছেড়ার চেষ্টা করছে এবং নিজেকে বেঁধে রাখার অবস্থান থেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টায় শরীর মোচড়াতে থাকে।
