আজো দুজনে ধানক্ষেতের আলের ধারে বসে গল্প করে। সামনে সোনালি ধান নুয়ে পড়েছে–দু-একদিনের মধ্যে কৃষকরা কাটবে। তন্ময়ের মনে পড়ে একদিন এই সোনালি ধানের শীষ দেখে একটি শহরের বাচ্চা মাকে বলেছিল, মা দেখো দেখো কী সুন্দর ফুল! সেদিন ওর মনে হয়েছিল মেয়েটির ফুল দেখার চোখ আছে। এ চোখ আছে অনিমারও। ও অনিমার হাত ধরে বলে, তোমার মা নেই, আমার বাবা নেই। বেশ মিল না! দুজনের বন্ধনটা গাঢ় হবে। আমরা পরস্পরকে ছেড়ে থাকব না।
পরস্পরকে ছেড়ে থাকব না! ঠিক বলেছে, জীবনের মিল দিয়ে আমরা জীবনভরের মিল বানাব। আমাদের একটু মিলের কথা বললে। আরো বাকি। আর একটু জানতে চাই। বলো আর কী মিল খুঁজতে চাও।
আমার মা পাঁচটি মৃত সন্তানের জন্ম দেন। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র জীবিত সন্তান। তোমার ভাইবোন নেই?
তন্ময় উদাস কণ্ঠে বলে, জানি না।
অনিমা অবাক হয়, মানে? ভাইবোন আছে কি নেই তা তুমি জানো না? আশ্চর্য!
তন্ময় খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, আমার একটি গল্প আছে অনিমা।
গল্প! অনিমা বিস্মিত হতেও ভুলে যায়। হাঁ করে তন্ময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তন্ময় একটি ধানের ছড়া ছিড়ে নিজের গলায় বোলাতে বোলাতে বলে, বর্তমানে যিনি আমার মা, আমি তার পালিত সন্তান। আমার জন্মের পরপরই আমার গরিব মা আমাকে তাঁর কাছে বিক্রি করে দেন। তিনি আমাকে তাঁর প্রাণের সবটুকু দিয়ে বড় করেছেন।
অনিমা অস্ফুট আর্তনাদ করলে তন্ময় মুখ ফিরিয়ে বলে, ভয় পেলে? নাকি ঘেন্না?
অনিমা জোরের সঙ্গেই বলে, ছিঃ ঘেন্না কিসের!
তন্ময় হো-হো করে হাসে। জায়গাটা খোলা প্রান্তর না হলে তোমার ভয় বা ঘেন্না উড়িয়ে দিতে আমার এক সেকেন্ড লাগত।
কীভাবে?
মাত্র একটি চুমু, গভীর এবং লম্বা চুমু।
ধ্যাৎ, কেবল বাজে মতলব।
বাজে? সত্যি বাজে, আবার বলো।
ওই প্রসঙ্গ আর নয়। তোমার বাবা কি মারা গেছেন?
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তিনি মারা যান।
তোমার নিজের বাবা-মায়ের ঠিকানা নেই?
একটা ঠিকানা আছে আমার মায়ের কাছে। আমি সেখানে খুঁজতে গিয়েছিলাম। কাউকে পাইনি। ভাসমান মানুষদের স্থায়ী ঠিকানা থাকে না অনিমা।
তোমার কি খুব কষ্ট?
কষ্ট? হ্যাঁ, কষ্ট তো থাকবেই। তবে আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি।
তুমি কী করে জানলে বিষয়টি?
আমার আট বছরের জন্মদিনের উৎসব শেষে মা আমাকে নিয়ে ছাদে গেলেন। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে মা বললেন, তোমাকে একটি গল্প বলব সোনা।
আমি খুশি হয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরিয়ে বলেছিলাম, হ্যাঁ, আমি গল্প শুনব।
মা আমাকে একটি খুব পুরনো গল্প বললেন। সাদামাটা গল্প। আমার জন্মের আগেই আমার বাবা মাকে ফেলে চলে যায়। আমাকে লালন-পালন করার সাধ্য মায়ের ছিল না। আর আমার বর্তমান মায়ের সন্তান হওয়ার আশা ছিল না। শুনেছিলাম সমস্যা ছিল আমার বাবার।
অনিমা তন্ময়ের সাদামাটা গল্পটি শুনে জিজ্ঞেস করে, গল্পটি শুনে। তুমি কেঁদেছিলে?
আমার স্পষ্ট মনে আছে যে আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, তুমিই আমার মা। আমার আর কোনো মা নেই। তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
তারপর? গল্পটা খুব সাদামাটা নয় তন্ময়।
আমার চেয়ে সেটা আর কে বেশি বোঝে! মায়ের অভাব আমি বুঝিনি। বুঝেছি মায়ের ভালোবাসার স্বাধীনতা। এই জীবনে আমার অনেক পাওয়া হয়েছে।
তন্ময় একটি উড়ে যাওয়া পাখির ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করে। অনিমা আঙুল তুলে পাখি দেখাতে দেখাতে বলে, উড়ে যাওয়া পাখি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। পাখির সারি হলে তো সেটা দারুণ দৃশ্য।
তন্ময় মুখ ফিরিয়ে বলে, আমার জীবনের গল্পে তুমি কতটুকু আহত হয়েছ?
আহত? আহত হবো কেন?
এই যে পরিচয়হীন একটি ছেলে!
তোমার পরিচয় তো তুমি নিজে তন্ময়।
আমি যদি তোমার জীবনে উড়ে যাওয়া পাখি হই?
তোমার জীবনে যেমন আমি নদী।
তন্ময় হেসে বলে, পাখি কিন্তু নীড়ে ফেরে। নদী শুধুই বয়ে যায়।
নদীরও যাওয়ার জায়গা আছে। নদী সাগরে গিয়ে মেশে। মনে করে সেটাই তার ঘর।
তন্ময় নতি স্বীকার করে বলে, নাহু, তোমার সঙ্গে কথায় পারা গেল না!
দুজনে রেললাইনের পথ ধরে বাড়ি ফেরে। অন্যদিক থেকে দুটি কিশোরী মেয়ে শাপলা নিয়ে হেঁটে আসছে। তন্ময় অনিমার হাত টেনে ধরে বলে, দেখো কী সুন্দর লাগছে ওদের।
সুন্দর! এটা আমার কাছে একটা সাদামাটা দৃশ্য। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরে অনেক গায়ে এমন দৃশ্য দেখেছি আমি। নতুন না।
তন্ময় ক্যামেরা খুলতে খুলতে বলে, দাঁড়াও ওদের ছবি তুলি। মেয়ে দুটি কাছে এলে বলে, এই যে শোনো, তোমরা একটু দাঁড়াও। তোমাদের একটা ছবি তুলি।
ছবি! ছবি ক্যান তুলবেন?
আমাগোরে একড়া ছবি দিবেন?
অনিমা ওদের পরিচয় দিয়ে বলে, এরা দুই বোন। এর নাম কলি, ওর নাম তুলি। তোদেরকে অবশ্যই ছবি দেয়া হবে। এই এখানে দাঁড়া।
আপা, ভাইজানে ছবি না দিলে আমরা কিন্তু আপনেরে ধরুম।
আচ্ছা ধরিস। ও পালালে আমি ঠিকই ওকে ধরব।
দুজনে দাঁড়ালে তন্ময় ছবি তোলে। মেয়েরা চলে যায়। তন্ময়ের ডিজিটাল ক্যামেরায় ওরা উদ্ভাসিত হয়ে আছে, কৈশোরের লাবণ্যে ওরা আশ্চর্য মধুর। তন্ময় অনিমাকে দেখিয়ে বলে, দেখো অনিমা, কী সুন্দর ছবি! মেয়ে দুটোর নিস্পাপ সরলতা–
থামো তন্ময়। এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে ছবি সব সময় সত্য প্রকাশ করে না।
বুঝিয়ে বলো, কেন তোমার এ কথা মনে হলো।
কারণ ওই মেয়ে দুটোর পরিবার এতই গরিব যে, আজ দুপুরে নাকি ওদের মা ওদের ভাত দিতে পারবে না। দেবে এই শাপলা সেদ্ধ। মেয়ে দুটো সে শাপলা কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
