হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। সে নদীর নাম অনিমা। নদীর মতো মেয়ে।
তাই! বেশ সুন্দর উপমা। প্রকাশটা দারুণ হয়েছে। দুজনে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, কয়টা মেয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে?
পরিচয় অনেকের সঙ্গে আছে। তবে কারো সঙ্গে প্রেম নেই। ঘুরে বেড়ানোর এই নেশা আমাকে সুস্থির রাখে না। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে অনিমা। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
অনিমার দৃষ্টি বিষণ্ণ হয়ে যায়। তন্ময় ওর জীবনে থাকবে তো? না–ও আর ভাবতে চায় না। অন্যদিকে তাকায়। তনায় খানিকটা দমে গিয়ে বলে, অনিমা, আমি কি–।
অনিমা বাম হাত দিয়ে তন্ময়ের মুখ চেপে ধরে ডান হাতটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ধরো।
তন্ময় দুহাতে অনিমার হাত ধরে বলে, তুমি একবার বলো, ভালোবাসি।
অনিমা প্রবল উচ্ছ্বাসে ভালোবাসি বলে, গানের সুরে বলে এবং বলাটাকে আকাশ-প্রকৃতির পটভূমিতে বাঅয় করে তোলে।
আবেগ থিতিয়ে এলে তন্ময় স্টেশনে সিগনাল স্ট্যান্ডের ওপর লেখার প্যাড রেখে মাকে চিঠি লেখে।
সাবিহার বাড়িতে তখন মধ্যদুপুর। ডাকপিয়ন চিঠি দিয়ে গেছে। চিঠির খাম দেখেই বোঝা যায় যে কোনটা তন্ময়ের চিঠি। মায়ের জন্য ও বিশেষ খাম এবং প্যাড ব্যবহার করে। সেটা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হয় না। এটা সাবিহা বানু জানে এবং এই ভেবে স্বস্তি বোধ করে যে তার প্রতি ছেলেটা যত্নশীল এবং মায়ের জায়গাটুকু একদম আলাদা। সেখানে আর কারো প্রবেশ নেই। তন্ময় লিখেছে, মা, আমার সোনা মাগো, তুমি এবার জেনে খুশি হবে যে আমি অনিমা নামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছি। তুমি বলো যে তোমার ছেলের ঘরের টান নেই। তুমিই তো আমার সবচেয়ে বড় টান। তার সঙ্গে যুক্ত হবে আর একজন। হাঃহাঃহাঃ। তোমার ছেলে সূর্যরথী তন্ময়।
সাবিহার মনে হয় এতদিনে তন্ময় একটি অন্যরকম চিঠি লিখেছে। ও এবার ঘরমুখো হবে। এই খুশিতে সাবিহা বানুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাহেরা বেগম সাবিহার মুখ দেখেই বুঝতে পারে যে ঠিকই ছেলের চিঠি পড়ছে। এতে কোনো দ্বিধা নেই। তারপরও জিজ্ঞেস করে, কী হইছে আম্মা?
আমার ছেলে এবার সংসারী হবে, আমার ঘরে বৌমা আসবে। তারপর নাতিপুতি। আমার ঘরে মানুষ বাড়তে থাকবে তাহেরা। ভাবতেই আমার হাতে চাঁদ এসে ঢুকেছে এমন মনে হচ্ছে।
আপনের অ্যাত্ত বড় বাড়ি–কেমুন মাইয়া জানি আনে আপনের পোলায়–
এসব নিয়ে আমি ভাবি না তাহেরা–আমার ছেলে যাকে ভালোবাসবে সে আমারও ভালোবাসার মেয়ে হবে। আমার ছেলের খুশি আমারও খুশি।
তাহেরা বিস্ময়ে একটুখানি তাকিয়ে থেকে বলে, আল্লাহ আপনার মেলা ধৈয্য দিছে আম্মা।
সাবিহা নিজেকে শুনিয়ে বলে, কেউ জানবে না ও যে আমার জীবনের কত বড় সম্পদ। তন্ময়ও বোঝে আমি ওর জীবনের কতটা জায়গা নিয়ে আছি।
সাবিহা উঠে ঘরের কোনায় রাখা তন্ময়ের ছবিটা হাতে নিয়ে দেখে। চিঠির বাক্সটা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দেয়। ঘরের অন্যান্য জিনিসগুলো ডাস্টার দিয়ে ঝেড়েমুছে রাখার সময় শুনতে পায় তাহেরা বিড়বিড় করছে, আল্লাহ আমারে ক্যান পোলাপান দিল না। আমি ক্যান একড়া মাইয়াপোলা পাইলাম না। পরক্ষণে চিৎকার করে ডাকে, আম্মা!
সাবিহা ওর বিড়বিড় শুনতে পাচ্ছিল, ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। রেগে গিয়ে বলে, কী হয়েছে তাহেরা?
আমি আর আপনের এইহানে থাকুম না। দ্যাশে যামু। আমার টাকা-পয়সা দিয়া দ্যান। আমার ভালো লাগতাছে না। আপনেরে দেইখলে আমার বুক পুইড়া যায়। এই বাড়িতে থাইকলে আমি পাগল হইয়া যামু।
এসব কী বলছ তুমি? আমি কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি?
এত কথা কইয়েন না আম্মা। আমার টেকা দিবেন কি-না কন।
কেন দেব না। তোমার টাকা তুমি পাবে। আমার ছেলে তোমাকে। এনেছে। আমি তোমাকে একটু বেশি টাকাই দেব। কিছু ভেব না। যখন বলবে তখনই দেব।
দিবেন না ক্যান, একশ বার দিবেন। আমার পোলা থাকলে ওহ আল্লাহরে আমি ক্যান আপনের মতো ভাইগ্য পাইলাম না–
ও দরজার সামনে ঘুরপাক খেতে থাকে রান্নাঘরের দিকে যায়, আবার ফিরে আসে, সাবিহর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে। সাবিহা বানু ওকে হাত ধরে উঠিয়ে বলে, আমি তোমাকে একজন ডাক্তারের কাছে পাঠাতে চাই তাহেরা।
ক্যান, ডাক্তারের কাছে পাঠাঁইবেন ক্যান। আমার টাকাগুলো মাইরা খাইতে চান? হইব না, হইব না, টাকা নিয়া আমি ওই মাইয়াডারে দিমু–মাইয়াডা আমার সতীন হইলে কী হইবে, আমারে মান্য করে–টাকা দিলে ও আমারে দুই মুঠা ভাত দিব–ও আবার ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, অস্বাভাবিক আচরণ করে–লাফায়, দাঁড়ায়, অদৃশ্য কাউকে ঘুষি দেখায় আর বলতে থাকে, ভাত খামু, মাছ খামু, নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমামু–ওই বেডার গায়ে থুতু দিমু।
সাবিহা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। তাহেরার সঙ্গে কথা বলে। ওকে ওর মতো থাকতে দেয়। ভাবে এই মুহূর্তে তন্ময় বাড়ি এলে ও তাহেরাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠাবে কি-না, নাকি ওকে অন্য কিছু করা হবে তা জানতে পারব। তাহেরার পরিবারের সিদ্ধান্ত ছাড়া ওর কি কিছু করা উচিত? সিদ্ধান্ত কি একতরফা নেবে ও? সাবিহা ভাবনায় পড়ে।
তন্ময় তখন অনিমার সঙ্গে গাঁয়ের মেঠোপথে হেঁটে যায়। ধানক্ষেতের আল দিয়ে হাঁটতে ওর ভালো লাগে। আলের ধারে শামুকের ডিম দেখা যায়, বাইত্যা ইঁদুরের গর্ত দেখে ইঁদুরের লেজ নড়তে দেখার জন্য মুখোমুখি উবু হয়ে বসতে পারে, ঘাসফড়িং ধরার জন্য ছেলেমানুষি আচরণ করা যায়, আর বুনো ফুল ছিড়ে তন্ময় বলতে পারে, ফুলটা তোমার চুলে রাখো। অনিমা খিলখিলিয়ে হেসে বলতে পারে, আমার চুল কি ফুলদানি? তন্ময়ের উচ্ছ্বাস, তার চেয়েও বেশি। এমন প্রাকৃতিক ফুলদানি তো ফুলের প্রকৃত জায়গা। অনিমার অনুরাগ-মিশ্রিত হাসি তন্ময়কে মুগ্ধ করে দেয়। দুজনেই ভাবে, কী দারুণ সময় কাটানো। এমন সময় যেন জীবনভর থাকে।
