সেই হল মুখ্য কথা! আমরা মূর্খ।
এখন তো আর ইংরেজ নেই, কেউ ওস্কাচ্ছে না, আমরা তবু লড়ে মরছি!
তা হলে প্রশ্ন– এই মূর্খতা ঘুচাই কী করে?
বিদ্যাদান করে, ধর্মবুদ্ধি জাগ্রত করে, রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য সম্বন্ধে তাকে সচেতন করে।
এইখানেই অধীনের সবিনয় নিবেদন– সেটি মাতৃভাষার মারফতেই করতে হবে, অন্য কোনও পন্থা নেই, নেই, নেই।
ভ্যাকিউয়াম
কবি এবং বৈজ্ঞানিকে প্রায়ই বিরোধ উপস্থিত সেকথা আমরা জানি। কবি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, অহে-হে! কী সুন্দর সূর্যোদয়। বৈজ্ঞানিক গম্ভীর কণ্ঠে টিপ্পনী কাটলেন, হস্তীমূর্খ। সূর্যের আবার উদয়-অস্ত কী? পৃথিবীটা ঘুরে যাওয়াতে মনে হল সূর্যোদয় হয়েছে।
কিন্তু কোনও কোনও স্থলে উভয়েই একমত পোষণ করেন।
কবি গাইছেন,
কে বলে সহজ, ফাঁকা যাহা তারে
সহজ কাঁধেতে সওয়া
জীবন যতই ফাঁকা হয়ে যায়
ততই কঠিন বওয়া ॥
বৈজ্ঞানিকও উচ্চকণ্ঠে বলেন, প্রকৃতি শূন্যতাকে ঘৃণা করে
নেচার এবরজ ভ্যাকিউয়াম।
ধর্মের উচ্ছেদ যারাই কামনা করেন তারাই এ তত্ত্বটি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারেন। প্রাচীন যুগের চার্বাকপন্থী বা তার পরবর্তী যুগের মক্কার কাফিরদের কথা হচ্ছে না। এ যুগের কথা বললেই এ যুগের লোক সাড়া দেয়। এ যুগে ধর্মের প্রধান শত্রু টোটেলিটেরিয়ান স্টেট, একচ্ছত্র রাষ্ট্র জগদ্দল রাষ্ট্র বললে জিনিসটা আরও পরিষ্কার হয়। তা সে রাষ্ট্র ফাঁসিস্টই হোক আর কমুনিস্টই হোক।
হিটলার বা স্তালিনের ভাবখানা অনেকটা এই : কী! আমার রাষ্ট্রে আমি ভিন্ন অন্য কার মুরদ যে আমার কথার ওপর কথা কইতে যাবে? আপন রাষ্ট্রের প্রতি, ভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি অবশ্য আখেরে সেটাও আমি দখল করব– তোমার আচরণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, কলা-দর্শনে তোমার আদর্শ ঠিক করে দেব আমি। এ যেন বাইবেল বর্ণিত যেহোভার তীব্র তীক্ষ্ণ আদেশ, আমা ভিন্ন তোর অন্য কোনও উপাস্য দেবতা থাকবে না।
এর বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ উঠল সেটা প্রধানত ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠান থেকে। শিল্পী-দার্শনিকের সেরকম কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। আর বৈজ্ঞানিক অর্থনৈতিক পণ্ডিতেরা জীবনদর্শন চিন্তা করেন কমই। গবেষণার ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ স্বাধীনতা পেলেই তারা সন্তুষ্ট। আইন-আদালত নিয়ে যাদের কারবার তারা গোড়ার দিকে কিছুটা আপত্তি জানান বটে, কিন্তু দেশের ডিক্টেটর একবার জোর করে, ভয় দেখিয়ে, যে করেই হোক– যদি আইন পাস করিয়ে নিতে পারেন যে তিনিই সর্ব আইনের মূলাধার, তা হলে এদের আর আইনত কোনও আপত্তি থাকতে পারে না। মিলিটারির বেলায়ও হুবহু তাই। ডিক্টেটর যখন দেশের সর্বোচ্চ সামরিক উর্দি পরে তার সেনাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়ান তখনই সেনানায়করা শপথ নেন যে, তাঁর কোনও আদেশ তারা ভঙ্গ করবেন না। সকলেই জানেন, হিটলারকে নিধন করার জন্য বড় বড় সেনাপতিরা যখন ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেন তখন তাঁদের প্রধান অন্তরায় ছিল এই শপথ।
শেষ পর্যন্ত যখন অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতনের ফলে ধর্ম ভূগর্ভে আশ্রয় নেয়, তখন ধৰ্মবৈরী ডিক্টেটররা সম্মুখীন হয় পূর্ববর্ণিত ওই ভ্যাকিউয়ামের সম্মুখে। এতদিন ধরে ধর্ম মানুষের জীবনে বৃহৎ এক অংশ জুড়ে বসে ছিল, এখন ধর্ম চলে যাওয়াতে সে জায়গাটা যে ফাঁকা হয়ে গেল সেটা পূর্ণ করা যায় কী প্রকারে?
হিন্দুর ধর্মজীবনে বাধ্যবাধকতা অত্যল্প (তা-ও ব্রাহ্মণের); তার বাধ্যবাধকতা সামাজিক জীবনে। মুসলমান এবং খ্রিস্টানের ঠিক তার উল্টোটা। তারা সমাজে স্বাধীন। কিন্তু ধর্মে প্রচুর বাধ্যবাধকতা*। [*স্বামী বিবেকানন্দ তাই আমেরিকা থেকে তাঁর শিষ্যদের একাধিক চিঠিতে লেখেন, হিন্দুর ধর্ম ও খ্রিস্টানদের সমাজ নিয়ে নতুন হিন্দু-জীবন গড়তে হবে। বঙ্কিমও এই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বিদ্যাসাগরকে বহু-বিবাহনিরোধ ব্যাপারে বলেছেন, এ জিনিস খারাপ, ধর্ম দিয়ে প্রমাণ করেই-বা লাভ কী? হিন্দু চলে সামাজিক লোকাচার মেনে।] ডিক্টেটর বনাম ধর্মে যে দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয় এবং এখনও চলেছে, সেটা প্রধানত খ্রিস্টান দেশেই সীমাবদ্ধ বলে আমরা সেইটে নিয়ে আলোচনা করব। তবে এ দেশের হিন্দু পাঠকেরা খ্রিস্টধর্মের চেয়ে ইসলামের সঙ্গে বেশি পরিচিত বলে তার থেকেও কিছু কিছু দৃষ্টান্ত নেব।
খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের সর্বপ্রথম মূল সিদ্ধান্ত–ইমান। অর্থাৎ তোমার বিশ্বাস– faith কী? তুমি যদি বল, ঈশ্বর নেই– জৈন ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা যে-রকম বলে, কিংবা বল, ঈশ্বর আছেন বটে কিন্তু দেবদেবীও আছেন অসংখ্য কিংবা বল যিশুতে বিশ্বাস না করেও মোক্ষলাভ সম্ভবে– তা হলে তুমি শুধু পাপী না, তুমি অখ্রিস্টান (খ্রিস্টান দৃষ্টিবিন্দু থেকে কাফির) হয়ে গেলে। ডিক্টেটররা এ সবেতে যে খুব বেশি আপত্তি করেন তা নয়, তাদের আপত্তি, তুমি যখন বল, কর্তব্য নির্ধারণার্থে তুমি ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের ওপর নির্ভর কর, তখনই তাদের আপত্তি। হিটলার-স্তালিন বলেন, তোমার কর্তব্য নির্ধারণ করে দেব আমি। বাইবেল কুসংস্কারাচ্ছাদিত, বুর্জয়ানির্মিত, প্রলেতারিয়া-শোষক গ্রন্থ। আসল কেতাব মাইন কাম্পফ কিংবা ডাস ক্যাপিটাল। বিশ্বাসী খ্রিস্টান যেরকম স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেন না, যিশু কোনও ভুল করে থাকতে পারেন, বিশ্বাসী কম্যুনিস্ট ঠিক তেমনি কিছুতেই স্বীকার করবেন না, মার্ক্স-লেনিন প্রচারিত ডাইলেক্টিক্যাল মেটিরিয়ালিজমে কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে।
