সম্পূর্ণ অবান্তর নয় বলে এস্থলে আরেকটি প্রশ্ন তুলি। তবে কি আজ আর বেদাধ্যয়নের কোনও প্রয়োজন নেই? অবশ্যই আছে। ঋষি কবিরূপে বেদে যে মধুর এবং ওজস্বিনী ভাষায় তার উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন সেটি বড়ই মূল্যবান। বুদ্ধি দিয়ে যেটা বুঝেছি সেইটে কবিমনীষীর প্রসাদাৎ তখন হৃদয় দিয়ে অনুভব করে সম্যক অনুপ্রাণিত হই। অনুভূতির হৃদয়াবেগ তখন ধ্যানলোকে অগ্রসর হওয়ার শক্তি সঞ্চারিত করে।
এরই তুলনায়– যদিও এর চেয়ে অনেক নিম্নস্তরের একটি উদাহরণ দিই। তিক্ত অভিজ্ঞতার পর বুদ্ধি দিয়ে বুঝলুম, দুরাশা করে শুধু বঞ্চিত হতে হয়। তখন যদি কেউ এসে আবৃত্তি করে–
আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়, তাই ভাবি মনে।
তখন কেমন যেন সেই নিরাশার মাঝখানেও অনেকখানি সান্তুনা লাভ করি।
ফ্রান্স যখন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য দৃঢ়সংকল্প, তখন মাসে ইয়েজ গীতি কী অভূতপূর্ব অনুপ্রেরণাই না তাদের হৃদয়ে সঞ্চারিত করেছিল।
অনেকখানি দাগা খাওয়ার পর যখন মাইকেল আশার ছলনার কথা ভাবছেন তখন যদি কুরান শরীফের উষস্ সুরা পড়তেন তবে কি অনেকখানি সান্ত্বনা পেতেন না?
৯৩ অধ্যায়
ঊষস্
(অদ-দুহা)
মক্কায় অবতীর্ণা
(একাদশ পঙক্তি)
আল্লার নামে আরম্ভ–
তিনি করুণাময়, দয়ালু
ঊষালগনের আলোর দোহাই,
নিশির দোহাই ওরে,
প্রভু তোরে ছেড়ে যাননি কখনো
ঘৃণা না করেন তোরে।
অতীতের চেয়ে নিশ্চয় ভালো
রয়েছে ভবিষ্যৎ
একদিন তুই হবি খুশি লভি
তাঁর কৃপা সুমহৎ।
অসহায় যবে আসিলি জগতে
তিনি দিয়েছেন ঠাঁই
তৃষ্ণা ও ক্ষুধা দুঃখ যা ছিল
মুছায়ে দেছেন তাই।
পথ ভুলেছিলি তিনিই সুপথ।
দেখায়ে দেছেন তোরে।
সে কৃপার কথা স্মরণ রাখিস।
অসহায় জন, ওরে–
–দলিস নে কভু। ভিখারি-আতুর
বিমুখ যেন না হয়।
তাঁর করুণার বারতা যেন রে
ঘোষিস জগন্ময় ॥
—সত্যেন দত্তের অনুবাদ
সত্যেন দত্তের অনুবাদে আরম্ভ, মধ্য দিনের আলোর দোহাই নিশির দোহাই ওরে। অথচ আরবিতে অদ-দুহা অর্থ উষা। ইংরেজি অনুবাদের সর্বত্রই আর্লি আওয়ার অব দি মর্নিং। হয়তো সত্যেন দত্ত ভেবেছিলেন আরবের মধ্যাহ্নসূর্য অতুলনীয়। আল্লা যদি কোনও নৈসর্গিক বস্তুকে সাক্ষী ধরে দোহাই দেন, তবে তিনি মধ্যাহ্ন-সূর্যকেই নেবেন। আমাদের মনে হয় ঊষা নেওয়া হয়েছিল এই অর্থে যে, রাত্রির অন্ধকার যতই সৃচিভেদ্য এবং নৈরাশ্যজনক হোক না কেন, ঊষার আলো প্রভাসিত হবেই হবে। আল্লা এস্থলে বলেছেন, সেটা যে রকম সত্য, আমার বাক্যও তেমনি ধ্রুব।
যারা কুরান শরীফকে মেটাফরিকালি ও সিম্বলিকালি (অর্থাৎ দ্বিতীয় পক্ষে) রূপকে ব্যাখ্যা করেন (যেমন পরবর্তী ওমর খৈয়ামের মদকে ভগবৎপ্রেম অর্থে ধরেন, কিংবা ভারতচন্দ্র চৌরপঞ্চাশিকা কালী-পক্ষেও অনুবাদ করেছেন। তাঁরা বলেন এখানে প্রভাতসূর্য (ঊষস্, অ-দুহা) হজরত মুহম্মদের (দ) প্রেরিত-পুরুষরূপে আগমনের সূচনা করেছে। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমান কিন্তু কুরান শরীফকে এ রকম রূপক অর্থে নেন না।
নব-হিটলার
আত্তিলা, চেঙ্গিস, নাদির যখন রক্তের বন্যায় পৃথিবী ভাসিয়ে দিয়েছেন তখন অসহায় মানবসন্তান কাতরকণ্ঠে রুদ্রকে স্মরণ করে তার দক্ষিণ মুখের কামনা করেছে, কিংবা হয়তো ভগবানকে অভিসম্পাত দিয়েছে। কিন্তু সাহস করে এ আশা করতে পারেনি, ভবিষ্যতের আত্তিলা-নাদিরকে ঠেকানো যায় কী প্রকারে?
আজ কিন্তু মানুষের চিন্তা, এমন কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে যাতে করে আবার যেন আরেকটা হিটলার দেখা না দিতে পারে? কারণ এই সুসভ্য বিংশ শতাব্দীতে হিটলার যে রক্তপাত করে গেলেন, তার সামনে খুব সম্ভব চেঙ্গিস-নাদির হার মানেন। তাই আমি যে হিটলার নিয়ে আলোচনা করি সেটা কিছু একাডেমিক ইনট্রেসট নয়– অর্থাৎ অমাবস্যার অন্ধকার অঙ্গনে অন্ধের অনুপস্থিত অসিত অশ্বডিম্বের অনুসন্ধান, সমস্যাটা শত লক্ষ নিরীহ মানুষের জীবনমরণ নিয়ে!
হিটলারকে আমি যে বিশেষ করে বেছে নিয়েছি তার দুটি কারণ আছে। প্রথমত তিনি এমন সব কীর্তিকর্ম করে গেছেন যা আত্তিলা-চেঙ্গিসের পক্ষে সম্ভব হয়নি। (সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বোধহয় রুদ্রের নবমাবতার হিটলারের পর দশমাবতার চীনের গোকুলে বাড়ছেন নেফার সংবাদ থেকে আমার এই অনুমানটি হয়েছে। এখানে সামান্য একটি উদাহরণ দিই। পাঠকদের আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি–অপরাধ নেবেন না–এটা অন্ধের অশ্বডিম্বের অনুসন্ধান* [*আমার শব্দগুলো ঠিক মনে নেই তবে শোপেনহাওয়ার দর্শনচর্চার বর্ণনা দিতে গিয়ে বোধহয় মোটামুটি এই বলেছেন : The search of a blind man in a dark night for a black cat, which is not there.] নয়। চেঙ্গিস-নাদির যখন কোনও শহর দখল করে পাইকারি কচুকাটার হুকুম দিতেন তখন দেখা যেত তাদের সৈন্যরা তলোয়ার দিয়ে যুবা-বৃদ্ধ-শিশুর গলা কেটে কেটে শেষটায় হয়রান হয়ে গিয়ে ক্ষান্ত দিত, শুধু তাই নয়, যুদ্ধের উত্তেজনাহীন আপন-জীবনমরণ-সমস্যাবিহীন এরকম একটানা কচুকাটা কেটে কেটে তাদের এক অদ্ভুত মানসিক অবসাদ দেখা যেত, যার ফলে নিষ্ঠুর রক্তপিপাসু–পিপাসারও তো একটা সীমা আছে–বর্বরও নিস্তেজ হয়ে যেত। এ তত্ত্বটি বুঝতে হিটলারের বেশি সময় লাগেনি। হিটলার, হিমলার, হাইড্রিষ… আইষম্যান গোড়ার থেকে লক্ষ করলেন যদিও বাছাই বাছাই ব্ল্যাক-কোট পল্টনের পর-পীড়ন-উল্লাসী (স্যাডিস্ট)-দের ওপর ভার দেওয়া হয়েছিল বালবৃদ্ধবনিতা ইহুদিদের গুলি করে মারার– তারাও শেষ পর্যন্ত মানসিক অবসাদের স্নায়বিক জটিলতায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন হিটলার-হিমলার বের করলেন এক নয়া কল– যে কল চেঙ্গিস-নাদিরের পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব ছিল না, কারণ সে যুগের বিজ্ঞান তার বাল্যাবস্থায়। বিরাট একখানা অ্যারটাইট ঘরে ইহুদিদের ঢুকিয়ে দিয়ে ছাতের উপর থেকে ভেন্টিলেটারপনা ছিদ্র দিয়ে ছোট্ট একটি বিষে-ঠাসা গ্যাস ফেলে দেওয়া হত–দশ মিনিটেই ঘরের সব-কুছ বিলকুল ঠাণ্ডা। এতে করে যে গ্যাসের টিনটা ফেলল তার কোনও মারাত্মক স্নায়বিক ঝামেলা হওয়ার কথা নয়।
