শুনেছি রুশের সংবিধানে নাকি আছে, ধর্মনিরপেক্ষ কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করার অধিকার সর্ব কম্যুনিস্টের আছে। ফলে ওই সময়কার একখানা রুশভাষায় লিখিত ইংরেজি শিক্ষার দ্বিতীয় সোপানের পাঠ্যপুস্তকে নিম্নলিখিত কথোপকথন :
প্রথম ছাত্র : ঈশ্বর নেই।
দ্বিতীয় ছাত্র : ওটা একটা বুর্জোয়া কুসংস্কার– ভূতেরই মতো। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
কাবুলে থাকাকালীন সিয়েশকফ নামক একটি পরিবার বাপ, মা, ছেলে– তিনজনাই আমার কাছে ইংরেজি পড়ত। যখন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ওই জায়গাটি এল, তখন সিয়েশকফ একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, এটা থাক। ব্যাপারটা ১৯২৭ সালের। তখনও কম্যুনিস্ট রেভলুশন হার্ডবইলড এগ হয়নি। জোয়ানদের সকলেই ইকনের সামনে বিড়বিড় করে বড় হয়েছে। আমি বললাম, থাকবে কেন? আমি তো বৌদ্ধধর্মের বই পড়ি, সেখানেও ঈশ্বরকে অস্বীকার করা হয়।
তার পরে ১৯৪১-৪২ সালে রুশ যখন হিটলারের হামলায় যায়-যায়, তখন স্তালিন খুলে দিলেন বেবাক চার্চ, বিস্তর মঠ, নিমন্ত্রণ করলেন মিত্র ইংল্যান্ডের ডাঙর পাদ্রিকে। আবার গির্জায় গির্জায় প্রার্থনা উঠল, হে ঈশ্বর, হোলি রাশাকে (হোলি?– তওবা, তওবা) বাঁচাও।
সেই অরণ্যের মতো জনসমাগম, ধর্মোচ্ছ্বাস দেখে স্তালিন খুশি হয়েছিলেন, না পাড় কম্যুনিস্টের যা হওয়া উচিত– ব্যাজার হয়েছিলেন, জানিনে। হয়তো-বা বিষাদে হরিষ, কিংবা হরিষে বিষাদ। কে জানে!
আমার মনে হয়, ১৭ থেকে ৪১ পর্যন্ত যদি ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা না করে তাকে অবহেলা করা হত, তবে বোধহয় ঠিক এতটা হত না।
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা
শুধু এ দেশে নয়, সব দেশেই ধর্ম তার তালুক-মুলুক হারায় যখন তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যায়। আসলে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা তার প্রকৃত পরিচয় বাতলায় না। ধর্মনিরপেক্ষ আমরা সেকুলার শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ হিসেবে নিয়েছি, এবং সেই সেকুলার শব্দের অন্য অর্থ প্রোফেন- হিরেটিক্যালও বলা যেতে পারে। অর্থাৎ সেকুলার শিক্ষাপদ্ধতি ধৰ্মবৈরী, এমনকি ধর্মাঘ্নও হতে পারে।
কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্যায়তন ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে না। করলে বরঞ্চ ভালো হত। ধর্ম তা হলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে হয়তো-বা জিতে যেত। কিন্তু সে সুযোগ ধর্ম পায় না–তার জয়াশা অতি অত্যল্প হলেও কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, সে ধর্মকে তাচ্ছিল্য করে, অবহেলা করে, এমনকি তার অস্তিত্ব পর্যন্ত স্বীকার করে না। তার ভাবখানা অনেকটা এই : ধর্ম বাদ দিয়ে শিক্ষাদীক্ষা সবকিছুই হয়, ছাত্রেরা পরীক্ষা পাসের পর যদি কাজকর্ম করে দু-পয়সা কামাতে পারে তবে ধর্ম অপ্রয়োজনীয় অবান্তর।
এক ইয়োরোপীয় বৈজ্ঞানিক যখন আঁক কষে ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিলেন সৌরজগৎটা কীভাবে চলে তখন কে এক ধার্মিকজন শুধাল, কিন্তু তোমার সিস্টেমে তো ভগবান নেই।–উত্তরে বৈজ্ঞানিক বলেছিলেন, ওঁকে বাদ দিয়েই যখন সিস্টেমটা নিটোল ত্রুটিহীন, তখন তাকে লাগাবার কী প্রয়োজন? কিন্তু ওই বৈজ্ঞানিকটি ব্যক্তিগত জীবনে কিঞ্চিৎ ধর্মভীরু ছিলেন বলে আস্তে আস্তে যোগ করলেন, কিন্তু দরকার হলে তাকে টেনে আনতাম বইকি। সে দরকার অদ্যাবধি হয়নি। সেকুলার শিক্ষাপদ্ধতি ধর্মের সেই কাল্পনিক প্রয়োজনীয়তাটুকু স্বীকার করে না।
বেদের বড় বড় দেবতা ইন্দ্র-বরুণ, এরা যে লোপ পেলেন তার কারণ এ নয় যে, কোনও বিশেষ যুগে এদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ধর্ম-সংস্কারকগণ জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আসলে মানুষ আস্তে আস্তে দেখতে পেল, প্রকৃতি তার নিয়ম অনুযায়ী চলেছে। বৃষ্টি-বর্ষণ, ফসল উৎপাদন, গোধনবৃদ্ধি ইত্যাদি যাবতীয় প্রয়োজন এঁদের না ডেকেও সমাধান হয়। তবে বিশ্বাসীজনের কথা স্বতন্ত্র। দীর্ঘদিনব্যাপী অনাবৃষ্টি হলে এখনও তারা হোমযজ্ঞাদি করে থাকেন, বিশ্বাসী মুসলমান এখনও মোকদ্দমা জেতার জন্য মৌলা আলীর দর্গায় গিয়ে ধর্না দেয়*।[দক্ষিণ মিশরে ক্রমাগত কয়েক বৎসর বৃষ্টি না হওয়াতে একবার বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়। শহরের কাজি (চিফ জাস্টিস) সে নামাজের ইমাম (প্রধান) হবেন। ইনি ছিলেন মারাত্মক ঘুষখোর। নামাজে যাবার পথে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। কাজি যখন আল্লাকে শুকরিয়া (ধন্যবাদ) জানাবার জন্য মিম্বরে (পুলপিটে) উঠলেন তখনই, সঙ্গে সঙ্গে, বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। টীকাকার বলছেন, টিটকারির ভয়ে কাজি মসজিদের পিছনের দরজা দিয়ে পালালেন।] ভলটেয়ারকে কে যেন শুধিয়েছিল, মন্ত্রোচ্চারণ করে একপাল ভেড়া মারা যায় কি না? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, অবশ্যই যায়। তবে প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিক খাইয়ে দিলে সন্দেহের আর কোনও অবকাশই থাকে না।
তা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে, ইন্দ্র-বরুণ চলে যাওয়ার পরে কালী-হনুমান এলেন কী করে? কুরান হদীসে যখন স্পষ্ট লেখা রয়েছে, আল্লা, মানুষকে তার ন্যায্য হক্কাহ (হ+ন+হ, অ+হক) ইনসাফের সঙ্গে বিতরণ করেন, মধ্যস্থতা করার জন্য উকিল ধরে কোনও লাভ নেই, তখন মানুষ নৌকা ছাড়ার পূর্বে বদরপীর কিংবা পুত্রলাভের জন্য সোনা গাজীর শরণাপন্ন হয় কেন?
উত্তরে পণ্ডিতেরা বলেন, অনার্যদের স্বধর্মে আকর্ষণ করার জন্য আর্যরা অনার্যদের অনেক দেবদেবীকে আপন ধর্মে স্থান করে দেন। অনার্যরা অনুন্নত। তারা ওইসব দেবীর সহায়তায় তখনও বিশ্বাস করে। যারা করে করুক, ক্ষতিটা কী? বদর পীর মৌলাআলীর বেলাও তাই। এবং সবচেয়ে মোক্ষম যুক্তি–পুরুত-মোল্লাদেরও তো খেয়ে বাঁচতে হবে। পরমে ব্রহ্মণি যোজিত চিত্তঃ তো আর পূজাপাটা করেন না, আল্লাকে যে-সাধক নূর বা জ্যোতিরূপে অনুভব করে আপন ক্ষীণ জ্যোতি-শিখা তার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন–কোণের প্রদীপ মিলায় যথা জ্যোতিঃসমুদ্রেই তিনি তো আর মোল্লা ডেকে শিরনি চড়ান না। তাই ঘেঁটু-মনসা মৌলাআলী সোনা গাজীর দরকার। সত্যপীর তো আরও শহর-পসন্দ, জনপদবল্লভ–উভয় ধর্মেরই বিশ্বাসীজনকে পাওয়া যায়। মোল্লা-পুরুত দুজনারই সুবিধা।
