আমি হামেহাল জেন্টিলম্যান। শাস্ত্রসম্মত কায়দায় পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু দুশমন অস্কারকে চেঁচিয়ে বললে, তুমি বাইরে থাকো ছোকরা। এর সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে।
অস্কার প্রথমটায় এরকম মোগলাই মেজাজ দেখে একটুখানি থতমত খেয়ে গেল। খালি বোতলটায় একটা টান দিয়ে অতি ধীরে ধীরে মিনিটে একটা শব্দ উচ্চারণ করে বলল, এরসঙ্গে—আমার—বোঝাপড়া—আছে? কেন বাবা, এত রাগ কিসের? এই পরবের বাজারে? তা ইন্ডারটা ঝগড়াটে বটে। হলেই বা। এস, বেবাক ভুলে যাও। খেয়ে নাও এক পাত্তর। মনে রঙ লাগবে, সব ঝগড়া কঞ্জুর হয়ে যাবে।
বলে জুড়ে দিল গান। অনেকটা রবিঠাকুরের ‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে’ গোছের।
দুশমন ততক্ষণে আমার দিকে ঘুষি বাগিয়ে তেড়ে এসেছে।
হাঁ হাঁ করো কী, করো কী?’ বলে অস্কার তাকে ঠেকালো। অস্কার আমার সপত্নের চেয়ে দুমাথা উঁচু। আমাকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? নাৎসিদের ফের গালাগাল দিয়েছিস বুঝি?
আমি যতটা পারি বোঝালুম। শেষ করলুম, কী মুশকিল! বলে।
অস্কার বলল, তা আমি কি তোর মুশকিল আসান নাকি, না তোর ফুরার? আর দেখছিস না ও আমার পার্টির লোক। আমি হাল ছেড়ে দিলুম।
কিন্তু অস্কারকে বোঝা ভার।
হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে সেই ষাঁড়কে জিজ্ঞেস করল, ইন্ডারটা তোমার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরেছিল?
আমি বললুম, ছিঃ অস্কার।
সপত্ন বলল, ‘চোপ!
অস্কার শুধাল, চুমো খেয়েছিল?
আমি বললুম, অস্কার!
সপত্ন বলল, শাট আপ!
তখন অস্কার সেই সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েটিকে দুহাত দিয়ে চেয়ার থেকে দাঁড় করাল। বললে, ‘খাসা মেয়ে। তারপর বলা নেই কওয়া নেই তাকে জড়িয়ে ধরে কমশেলের মতো শব্দ করে খেল চুমো।
সবাই অবাক। আমিও। কারণ অস্কারকে ওরকম বেহেড মাতাল হতে আমিও কখনো দেখিনি।
কিন্তু আমারই ভুল।
আমাকে ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে ফেলে সে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল সেই ছোকরার। একদম সাদা গলায় বলল, ‘দেখো বাপু, আমার বন্ধু ইন্ডারটি তোমার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরেনি, চুমোও খায়নি। তবু তুমি অপমানিত বোধ করে তাকে ঠ্যাঙাতে যাচ্ছিলে। ও রোগা টিঙটিঙে কিনা। ওঃ, কী সাহস! কিন্তু আমি তোমার বান্ধবীকে চুমো খেয়েছি। এতে তোমার জরুর অপমান বোধ হওয়া উচিত। আমিও সেই মতলবেই চুমোটা খেলুম। তাই এসো, পয়লা আমাকে ঠ্যাঙাও, তারপর না হয় ইন্ডারটাকে দেখে নেবে।
হুলুস্থুল পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে কথা কয়, কিছু বোঝবার উপায় নেই। ছোকরা পড়ে গেল মহা বিপদে। অস্কারের সঙ্গে বক্সিং লড়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। গেল বছরই এ অঞ্চলের চেম্পিয়ন হয়েছে এ সামনের শরাবখানাতেই। হোকরা পালাতে পারলে বাঁচে, কিন্তু অস্কার নাছোড়বান্দা। আর পাঁচজনও কথা কয় না—এ রকম রগড় তো পয়সা দিয়েও কেনা যায় না। সব পার্সনাল ম্যাটার কি না!
কিন্তু আমি বাপু ইন্ডার, কালা আদমী। আমি ছুটে গিয়ে ডাকলুম পুলিশ। ফিরে দেখি ছোকরা মুখ বাঁচাবার জন্য মুখ চুন করে কোট খুলছে আর শার্টের আস্তিন গুটোচ্ছে।
অস্কার যেন খাসা ভোজের প্রত্যাশায় জিভ দিয়ে চ্যাটাম দ্যাটাস শব্দ করছে।
পুলিশ নিত অনিয় বাধা দিল। ট্যাক্সি ডেকে কপোত কপোতীকে বিদেয় করে দিল।
অস্কার বললে, ওরে কালা শয়তান, কোথায় গেলি? আমার বান্ধবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
বান্ধবী সোহাগ ঢেলে শুধালেন, আপনি কোন দেশের লোক? পয়লা কপোতও ঠিক এই প্রশ্ন দিয়ে আরম্ভ করেছিল।
আমি দিলুম চম্পট। অস্কার চেঁচিয়ে শুধালো, যাচ্ছিস কোথায়? আমি বললুম, আর
না বাবা! এক রাত্তিরে দু-দুবার না।
মা-জননী
যুদ্ধের পূর্বে লন্ডনে অগুনতি ভারতীয় নানা ধান্দায় ঘোরাঘুরি করত। তাদের জন্য হোটেল, বোর্ডিং হৌস তো ছিলই, ডাল-রুটি, মাছ-ভাত খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁও ছিল প্রয়োজনের চেয়ে অধিক।
বাদবাকি সমস্ত কন্টিনেন্টে ছিল মাত্র দুটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। প্যারিসের রু দ্য সমোরারের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ ও বার্লিনের ‘হিন্দুস্থান হৌস’।
লন্ডন ভারতীয় ছাত্রদের সম্বন্ধে উদাসীন কিন্তু বার্লিন ভারতীয়দের খাতির করত। তাই অর্থাভাব সত্ত্বেও ‘হিন্দুস্থান হৌস’ কায়ক্লেশে যুদ্ধ লাগা পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছিল। একদিক থেকে দেখতে গেলে হিন্দুস্থান হৌস’ নাৎসি আন্দোলনের চেয়েও প্রাচীন, কারণ ১৯২৯-এ হৌসের যখন পত্তন হয় তখনো হিটলার বার্লিনে কল্কে পাননি।
সেই ‘হিন্দুস্থান হৌসে’র এক কোণে বাঙালিদের একটা আড্ডা বসত। সে-আড্ডার ভাষাবিদ সূয্যি রায়, লেডি-কিলার পুলিন সরকার, বেটোফেনজ্ঞ মদনমোহন গোস্বামী বার্লিন সমাজের অশোক-স্তম্ভ কুতুবমিনার হয়ে বিরাজ করতেন। আড্ডার চক্রবর্তী ছিলেন চাচা। হিন্দুস্থান হৌসের ভিতরে বাহিরে তার প্রতিপত্তি কতটা তা নিয়ে আমরা কখনো আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করিনি, কারণ চাচা ছিলেন বয়সে সকলের চেয়ে বড়, দানে-খয়রাতে হাতিম-তাই, আর সলা-পরামর্শে সাক্ষাৎ বৃহস্পতি।
এঁদের সকলকেই লুফে নেবার জন্য বার্লিনের বিস্তর ড্রইংরুম খোলা থাকা সত্ত্বেও এরা সুবিধে পেলেই হিন্দুস্থান হৌসে’ এসে আড্ডা জমাতেন। এ-স্বভাবটাকে বাঙালির দোষ এবং গুণ দুইই বলা যেতে পারে।
আড্ডা জমেছে। সূয্যি রায় চুকচুক করে বিয়ার খাচ্ছেন। লেডি-কিলার পুলিন সরকার চেস্টনাট ব্রাউন আর নেট চুলের তফাৎটা ঠিক কোন জায়গায় তাই নিয়ে একখানা থিসিস ছাড়ছে, চাচা গলাবন্ধ কোটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে আপন ভাবনা ভেবে যাচ্ছেন, এমন সময় আড্ডার সবচেয়ে চ্যাংড়া সদস্য, রায়ের প্রতেজে’ বা ‘দেশের ছেলে’, গ্রাম-সম্পর্কে ভাগ্নে গোলাম মৌলা এসে তার মামার পাশে বসল। তার চোখেমুখে অদ্ভুত বিহুলতা লাস্ট ট্রেন মিস করলে কয়েক মিনিটের তরে মানুষ যে-ভাব নিয়ে বোকার মতো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকটা সেই রকম।
