চাচা বললেন, আমি তখন মরমর। ক্ষীণ কণ্ঠে বললুম, আপনি ভুল করেছেন। আমায় মাপ করুন। মেয়েটা তখন একটু যেন বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার এই প্রাচ্যদেশীয় টানা-ঠ্যালা, টানা-ঠ্যালা কায়দা থামাও। আমার সময় নেই। হয়তো এতক্ষণে আমার বন্ধুর সন্দেহ হয়েছে আর হঠাৎ এখানে এসে পড়বে। তাহলে আর রক্ষে নেই। তোমার ফোন নম্বর কত বলল। আমি পরে কন্টাক্ট করবে। তখন তোমার সবরকম খেলার জন্য আমি তৈরি হয়ে থাকবা।
বাঁচালে! নম্বরটা দিলেই যদি মেয়েটা চলে যায় তাহলে আমিও নিষ্কৃতি পাই। পরের কথা পরে হবে। নম্বর বলতেই মেয়েটা দেশলাইয়ের পোড়াকাঠি দিয়ে চট করে সিগারেটের প্যাকেটে নম্বরটা টুকে নিল।
সঙ্গে সঙ্গে সেই দুশমন এসে ঘরে ঢুকল।
তার চেহারা তখন কপোতের মতো তো নয়ই, বাজপাখির মতোও নয়, মুখ দিয়ে আগুনের হা বেরহে, যেন চীনা ড্রাগন।
আর সে কী চিৎকার আর গালাগালি। আমি তার বান্ধবীকে বদমায়েশি করে, ধড়িবাজের ফেরেব্বাজি দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে এসেছি। একই টেবিলে ওয়াইন খেয়ে, বন্ধুত্ব জমিয়ে এরকম ব্ল্যাকমেলিং, ব্যাকস্ট্যাবিং—আল্লা জানেন, আরো কতরকম কথা সে বলে যাচ্ছিল। সমস্ত বিয়ারখানার লোক তার চতুর্দিকে জড়ো হয়ে গিয়েছে। আমি হতভম্বের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে। মেয়েটা তার আস্তিন ধরে টানাটানি করে বার বার বলছে, ‘হানস, হানস, চুপ করো। এখানে সীন করো না। ওঁর কোনো দোষ নেইআমিই
কনুই দিয়ে মেয়েটার পেটে দিল এক গুত্তা। চেঁচিয়ে বলল, ‘হটে যা মাগী’— অথবা তার চেয়েও অভদ্র কী একটা শব্দ ব্যবহার করেছিল আমার ঠিক মনে নেই। চটলে নাৎসিরা মেয়েদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করে সেটা না দেখলে বোঝবার উপায় নেই। হারেমে বুখারার আমীর তাদের তুলনায় কলসী কানার বোষ্টম। তঁতো খেয়ে মেয়েটা কোঁক করে, অদ্ভুত ধরনের শব্দ করে একটা চেয়ারে নেতিয়ে পড়ল।
‘এই বকাবকি আর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে ড্রাগন আস্তিন গুটোয় আর বলে, ‘আয়, এর একটা রফারফি হওয়ার দরকার। বেরিয়ে আয় রাস্তায় বাইরে।’
চাচা বললেন, আমি তো মহা বিপদে পড়লুম। অসুরের মতো এই দুশমনের হাতে দুটো ঘুষি খেলেই তো আমি উসপার। ক্ষীণকণ্ঠে যতই প্রতিবাদ করে বোঝাবার চেষ্টা করি যে ফ্রলাইনের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র অনুরাগ নেই, আমার মনে কোননারকম মতলব নেই, ছিল না, হওয়ার কথাও নয়, সে ততই চেঁচায় আর কাপুরুষ’ বলে গালাগাল দেয়।
আড্ডার চ্যাংড়া সদস্য গোলাম মৌলা শুধাল, আর কেউ মূখটাকে বোঝাবার চেষ্টা করল না যে আপনি নির্দোষ?
চাচা বললেন, তুই এদেশে নতুন এসেছিস তাই এসব ব্যাপারের মরাল অথবা ইমরাল কোডের খবর জানিসনে। এদেশে এসব বর্বরতাকে বলা হয়, অন্যলোকের ঘরোয়া মামলা’, personal matter। এরা আসলে থাকে বিনটিকিটে মজা দেখবে বলে।
চাচা বললেন, ততক্ষণে অসুরটা আবার নাৎসি বক্তৃতা জুড়ে দিয়েছে যত সব ইহুদি আর বাদ বাকি কালা-আদমি নেটিভরা এসে এদেশের মানইজ্জৎ নষ্ট করে ফেললো। এই করেই বর্ণসঙ্কর (অবশ্য একটা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছিল) হয়, এই করেই দেশটা অধঃপাতে যাচ্ছে, অথচ জর্মনির আজ এমন দুরবস্থা যে এরকম অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে পারছে না। বিশ্বাস করবে না, দু-একজন ততক্ষণে তার কথায় সায় দিতে আরম্ভ করেছে আর আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি দুনিয়ার সব চেয়ে মিটমিটে শয়তান, আর কাপুরুষস্য কাপুরুষ।
মাপ চেয়ে নিলে কী হতো বলতে পারিনে, কিন্তু মাপ চাইতে যাব কেন? আমি দোষ করিনি এক ফোঁটা, আর আমি চাইতে যাব মাপ? ভয় পাই আর নাই পাই, আমিও তো বাঙাল। আমার গায়ের রক্ত গরম হয় না? দুনিয়ার তাবৎ বাঙালদের মানইজ্জৎ বাঁচাবার ভার আমার উপর নয় জানি, কিন্তু এই বাঙালটাই বা এমন কী দোষ করল যে লোকে তাকে কাপুরুষ ভাববে?’
চাচা বললেন, আমি বললুম, এসো তবে, যখন নিতান্তই মারামারি করবে বলে মনস্থির করেছ, তবে তাই হোক! মনে মনে বললুম, দুটো ঘুষি সইতে পারলেই চলবে, তারপর তো নির্ঘাৎ অজ্ঞান হয়ে যাব।
এমন সময় হুঙ্কার শুনতে পেলুম, এই যে! সব ব্যাটা মাতাল এসে একত্তর হয়েছে হেথায়। এসো, এসো, আরেক পাত্তর হয়ে যাক, মেলার পরবে’।
চাচা বললেন, ‘তাকিয়ে দেখি অস্কার। একদম টং। এক বগলে খালি বোতল, আরেক বগলে ডানাকাটা পরী। পরীটিও যেন শ্যাম্পেনের বুদ্বুদে ভর করে উড়ে চলেছেন। সেই উৎকট সঙ্কটের মাঝখানেও না ভেবে থাকতে পারলুম না, মানিয়েছে ভালো।
অস্কারকে দুনিয়ার কুল্লে মাতাল চেনে। আমার কথা ভুলে গিয়ে সবাই তাকে উদ্বাহু হয়ে আসতে আজ্ঞা হোক, বার’-এ দাঁড়াতে আজ্ঞা হোক’ বলে অকৃপণ অভ্যর্থনা জানালো।
ওদিকে আমার মোযটা বাধা পড়ায় চটে গিয়ে আরো হুঙ্কার দিয়ে বলল, তবে আয় বেরিয়ে।
তখন অস্কারের নজর পড়ল আমার দিকে। আমাকে যে কী করে সে-অবস্থায় চিনতে পারল তার সন্ধান সুস্থ লোক দিতে পারবে না। পারবেন দিতে অস্কারের মতো সেই গুণী, যিনি মৌজের গৌরীশঙ্করে চড়ে জাগরণসুষুপ্তিস্বল্পতুরীয় ছেড়ে পঞ্চমে পৌঁছতে পারেন। কাইজারের জন্মদিনের কামানদাগার মতো আওয়াজ ছেড়ে বললে, ঐ রেঃ! ঐ ব্যাটা কালা ইভার, মিশ শয়তানও এসে জুটেছে। যেখানেই যাও, শয়তানের মতো সব জায়গায় উপস্থিত। বিয়ার ধরেছিস নাকি? এক পাত্তর হয়ে যাক। আজ তোকে খেতেই হবে। মেলার পরব।
ষাঁড় আবার হুঙ্কার ছেড়েছে। অস্কার তার দিকে তাকিয়ে, আর তার আস্তিন-টানা মারমুখো তসবির দেখে আমাকে শুধালো, ইনি কিনি বটেন?
