বাউল ফকিররা মাংস ডিম খান না। গোমাংস গুরুর নিযেধ। তবে মাছটা খান। মীনের মধ্যে আছে সাধকের সুলক্ষণ। কারণ মাছের চোখের পলক পড়ে না। সাধককেও দেহঘরে অন্তদৃষ্টি দিয়ে সর্বক্ষণ পলকহীন চোখেই তাকিয়ে থাকতে হয়।
ফকির বাউলের পথে আসা মানেই হল কামের ঘরে কপাট দিয়ে দেওয়া। বাউল ফকিরেরা জন্মদ্বারকে ঘৃণার চোখে দেখেন। সন্তান কামনার সঙ্গম এ পথের নয়। ফকিরালি পথে দীক্ষা, বাউল পথে দীক্ষা হলে পর কামের পথকে চিরতরে বিদায় দিয়ে দিতে হয় বলেই সন্তান জন্ম একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে এই নিয়ে এখন অবশ্য বাদবিবাদ তুঙ্গে। এখনকার মহাজনেরা বলেন, সন্তান না এলে সিদ্ধ ফকির বাউলের জন্ম হবে কেমন করে? কেমন করেই বা হবে ‘ঘর রক্ষা’।
সহজিয়া বৈষ্ণবদের শাখা উপশাখা, স্রোতের মতোই মারফতি পথেও আছে। নানান ঘরের হদিশ। কালার ঘর, নেড়ার ঘর, কাদের ঘর–প্রচ্ছন্ন নানান ঘরানা সব। রীতি রেওয়াজে বিচ্ছিন্ন হলেও সব ঘরেরই মূল বিষয় কিন্তু আবার লালন ঘরানার সেই ‘আলেখ’। অর্থাৎ কিনা গোপ্ত বা বাতুন। সাহেবধনীরা বলেন ‘গোপ্তবাবাজি’র কথা। ঘরের মুর্শেদ গোপ্তবাবাজির দেখা পেয়েছিলেন মুরিদ চরণ পাল চৈতি একাদশীর অগ্রদ্বীপের মেলায়। আবার চরণ পালের মুরিদ কুবির গোঁসাইও চৈতি একাদশীর ফালি চাঁদের আলোয় নিশুত রাতেই গোপ্তবাবাজির কৃপা পেয়েছিলেন। সেই পরম্পরাতেই এখনও একই প্রত্যাশায় কাঁথা সুজনি দিয়ে বালিশ দিয়ে দু’দুখানা বিছানায় চরণচাঁদ, কুবিরচাঁদ আর তাঁরই মাঝে হাপিত্যেশ দশার সাহেবধনী ঘরের দর্শনপ্রার্থী মুরিদ। আসলে তিনি ঘর মুর্শিদ। এ দিন কৃপাপ্রার্থী হয়ে বায়েত সাজেন দর্শন প্রত্যাশায়। অগ্রদ্বীপ গেলে এখনও এই দৃশ্য চোখে পড়বেই। বাতুন পথের এই হল গিয়ে দশা। এখানে সবটাই ‘দিলের পথ’, ‘রসের পথ’। জ্ঞানের বালাই নেই, তাই ফকির পড়েন ‘দেলকেতাব’। তাঁর ছাপা বই নেই। এই দেলকেতাব আসছে মুর্শেদ থেকে মুরিদ হয়ে। এর কোনও লয়-ক্ষয় নেই। তরিকা ভেদে ঘরে ঘরে পার্থক্য থাকলেও মূল ব্যাপারটা হল গিয়ে দৈন্যদশায় খোদা বা ঈশ্বরের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো। তাঁর জন্যই যাবতীয় এবাদত। আর এই ফকির বাউলদের এবাদতের প্রধান তারিকাটাই হল গিয়ে সঙ্গীত। অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত ফকির-বাউল গান এবাদতের মাধ্যমেই দেলকেতাব বা মৌখিক বাণী রেখে যান। যা আবর্তিত হয় শিষ্য পরম্পরায়। আর এই গানই, এবাদতই শরিয়ত বা খাঁটি ইসলামীপন্থায় হল গিয়ে নাজায়েজ। শরিয়তপন্থায় কেউ মারা গেলে গোর বা কবর দেওয়া হয়। যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় বলে, দাফন। দাফনের সময় মৃতদেহ গোসল করে দেওয়া হয় কাফন। স্নান করিয়ে বস্ত্র পরিয়ে কাফন দিয়ে দোয়া বা মঙ্গলের জন্য জানাজার নামাজ পড়া হয়। আর সেই নামাজ পড়া নিয়েই ফকিরালি পথে বাঁধে ঘোর বিপত্তি। বিশ শতকের শেষেও কিংবদন্তি হয়ে ওঠা বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের পত্নী সরলা যখন দেহ রাখেন, তখন উজানধল গ্রামের ইমাম সাহেব বাউলের স্ত্রীর জন্য বেশরা, ইসলামবিরোধী কাজ। এই অপরাধেই বাউল ফকিরেরা আবহমান কাল ধরেই মূল ধর্মচর্চার বাইরের লোক। তারা নিজেদের কবর। নিজেরাই দেন। মুর্শেদ কবর করেন, জানাজা পড়েন মুরিদের ইমাম সাহেব ঘুরেও তাকান। না এদের দিকে। কবরস্থানকেই ফকির বাউলেরা পবিত্র মনে করে ধোয়া পাখলা করেন। কবর প্রদক্ষিণ করে দোয়া মাগেন। সন্ধেবেলা ধূপ, চেরাগ জ্বালেন। জানাজা-জিয়ারত মুর্শেদের কাজ। মোল্লা মৌলবিরা বেশরাদের দিকে ফিরে দেখেন না।
মারফতি পথ মীনরূপী সাঁইয়ের কথাই বলে। সহজিয়া বৈষ্ণবরাও বলেন যে, মাছের চোখ পেলে পলকহীন চোখে রাধাকৃষ্ণের বিচ্ছেদলীলা তো আর দেখতে হতো না–
কেন মীনের নয়ন নাহি দিলে
রাধাকৃষ্ণলীলা মধুরলীলা
পলকে কেন ছেদ হানিলে
সহজিয়া বৈষ্ণব সাধক, মারফতি মতের ফকির বাউলরা তাই মীনের স্বভাব ধর্ম নিয়েও ভাবেন। বলেন, ডিমে, মাংসে কামভাব আসে, মাছে তামসিক ভাবটা কম থাকে। পুকুরের তলায় যে মাছ থাকে তারা দেহতত্ত্ব জানে। তল থেকে তাই শ্বাস নেয় যোগী মৃগেল মাছ আর ওপরে কুম্ভক, রেচকের জোরে বুরবুরি ওঠে। ফকির বাউল বৈষ্ণবরা তাই মৃগেল মাছ খান, অল্প জলের মাছ খান না, জিওল মাছও খান না। কেননা জিওল মাছ ভোগী স্বভাবের মাছ। পুকুর-বিল-দিঘি থেকে তোলার পর গৃহস্থের ছোট পাত্ৰতেও তারা বাঁচে। বড় মাছ হল ত্যাগী। জলই আশ্রয়। আশ্রয়হীন হলে আর বাঁচে না। মারফতি পথে তাই সব সময় গুরুর আশ্রয়েই থাকতে হয়। বাতুন শ্বাস জানতে হয়, মৃগেল–কাতলা–রুইয়ের মতো সাত্ত্বিক মাছের সেবা নিতে হয়। এতে বড় মাছের কুম্ভক, রেচকের গুণও শরীরে এসে লাগে। মারফতি পথ তাই দম জিকিরের। দমের কাজ জপতপের কায়দা মুর্শেদ গুরুই শিখিয়ে দেন। চিনিয়ে দেন তন বা শরীরের মধ্যস্থ আল্লাহ বা ঈশ্বরকে। সেই চেনানোর তরিকা নিয়েই বিবাদ বা গোলযোগ। কেননা ছেউড়িয়া, পাথরচাপড়ি যেখানে। ফকির বাউলদের মক্কা, দেবতার মূর্তি ঈশ্বর নন, ঈশ্বর মানুষরত্ন; সাঁই, সেখানে স্বভাবতই তাই রক্ষণশীল ইসলাম-হিন্দুর কশাঘাত পড়াটাই তাৎপর্যপূর্ণ।
*****
ইসলামীয় এলাকায় নানা গোষ্ঠীর প্রাদুর্ভাব ঘটে নবী মহম্মদ দেহ রাখার পর। একই প্রাদুর্ভা দেখা যায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবতার ভেতরে চৈতন্যদেবের অন্তর্ধানের পর। মারফতি সাধকরা চৈতন্য প্রভুর অন্তর্ধানেই বিশ্বাস করেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবতার বিশ্বাসটাও তাই। তবে শাস্ত্রীয় বৈষ্ণব এলাকায় চৈতন্যদেব ফিরেছেন আউলচাঁদ হয়ে, চরণচাঁদ, কুবির চাঁদের পরম্পরাও চৈতন্য সকাশেই রয়েছে। আবার বৈষ্ণবতার উপস্রোত মতুয়া ধর্মের। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদও চৈতন্যাবরেই সামিল। চৈতন্যদেব ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরিকরেরা। শাস্ত্রীয় এবং অশাস্ত্রীয় বৈষ্ণব দেহসাধনার কড়চায় অহরহ অবতারবাদে সামিল হয়েছেন। এর অসংখ্য নজির রয়েছে সব বাংলার গুরুত্বপূর্ণ পুঁথিশালায়। লোকধর্মে চৈতন্যাবতারের জন্ম ধর্মীয় কর্তৃত্বের হাত থেকে নিষ্কৃতির কারণে, সেই একই কারণটিই বলবৎ হয়েছিল ইসলামীয় পরিমণ্ডলে হজরত মহম্মদের দেহত্যাগের পর পরই। মসজিদের ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়েই তৈরি হয়েছিল সুফি মত নামাজ, রোজা, কালেমা, হক, যাকাত–পঞ্চাচারের শরিয়ত ইসলামকে অগ্রাহ্য করতেই সুফিদের ইমান–অদৃষ্ট বস্তুতে বিশ্বাস, তলব–বস্তুর অনুসন্ধান, ইরফান–বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানতত্ত্ব, ফানা ফিল্লাহ–বস্তুতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পথ ও পন্থাটি তৈরি। সাধক গায়েবি বস্তুতে বিশ্বাস রাখবেন। সেই ইমানের জোরেই দৃশ্যমান জগৎ সম্পর্কে তলব আসবে মনে। গায়েবি বা অদৃষ্ট বস্তুকেই খুঁজে মরবেন সাধক। খুঁজতে খুঁজতেই ইরফান হবে–জ্ঞানচক্ষুর বিকাশ। জ্ঞানের চরম সীমায় পৌঁছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির তফাৎ হারিয়ে ফানা হবেন সাধক। সুফি সাধনার মূল জায়গাটি কিন্তু মারফতি দেহতত্বের বা লৌকিক ইসলামের। আল্লাহর পথে স্থিতি লাভ–মোকাম। সেই স্থিতির জন্যই তাঁর ধ্যানে আত্মস্থ হওয়া–তরিকত। তারপরই জাগতিক জ্ঞান হারানো–হকিকত দেহ মন প্রাণ সমর্পণ মারফত। এই করণদশাগুলো হল গিয়ে সুফি সাধকের চক্র পেরোনোর মতই মোকাম দশা–মোকাম মঞ্জিল। প্রথম মঞ্জিল শরিয়ত, দ্বিতীয় লাছুত, তৃতীয় জবরুত, চতুর্থ লাহুত। সমস্তটাই আদতে হল গিয়ে দেহসাধনার সেই অহংবোধের শূন্যতা।
