*****
মুসলমানদের নজরে ফকির বাউলরা বেদাতী, বেশরা, ন্যাড়ার ফকির আর হিন্দুদের চোখে তারা কায়াবাদী, কদাচারী, ভ্রষ্ট, পাষণ্ড, জাত খোয়ানো, পতিত, ব্রাত্য, একঘরে। মুসলমানদের ফতোয়া, হিন্দুদের বিধানে এরা শরিয়ত, বেদবিধির বাইরে বেরোনো লোকায়ত সম্প্রদায়। মূল ধর্মের উপহাসের পাত্র। শুধুমাত্র তোতারাম বাবাজির বয়কট তো নয়, তার আগে তো কবিরাজ গোস্বামী মশাইও তোতারামের কায়দাতে নিদান হেঁকেছেন ‘চৈতন্য চরিতামৃত’তে–
বাউল্যা বিশ্বাসেরে না দিবে আসিতে।
বাউল ধর্ম যে চৈতন্যপন্থী বৈষ্ণবতায় বেগ দিচ্ছে তাঁর মস্ত প্রমাণ তোতারাম বাবাজির দুই শতক আগে গোস্বামী বাবাজির বিধান। তবে গোস্বামী বাবাজিকে লোকধর্ম আপন করেছে চৈতন্যদেবের মতই। সহজিয়া, বাউল, দরবেশ, সাঁইরা পুঁথি লিখে কৃষ্ণদাস কবিরাজের নামে অহরহ চালিয়ে দিয়েছেন। বিমানবিহারী মজুমদার এমন পুথির হদিশ জানিয়েছেন আমাদের। দরবেশের পুঁথি ‘বীরভদ্রের শিক্ষা মূল কড়চা’ বইটি বের হয়েছিল ১৩২৮ সনে। বইটির রচয়িতার নাম কৃষ্ণদাস কবিরাজ। বিষয়বস্তু যুগল দেহসাধনার নির্দেশ। পিতা নিত্যানন্দ পুত্র বীরভদ্রকে শিক্ষা নিতে পাঠাচ্ছেন মাধববিবির কাছে–
শ্রীঘ্র করি যাহ তুমি মদিনা সহরে।
যথায় আছেন বিবি হজরতের ঘরে।।
তথা যাই শিক্ষা লহ মাধব বিবির স্থানে।
তাহার শরীরে প্রভু আছেন বর্তমানে।।
মাধব বিবি বিনে তোর শিক্ষা দিতে নাই।
তাহার শরীরে আছেন চৈতন্য গোঁসাই।।
বীরভদ্র এরপর মদিনা রওনা হলেন। মাধববিবির কাছে শিক্ষা চাইলেন। বিবি তাঁকে কায়াবাদী ভজনের স্বরূপ চেনাতে গিয়ে দেহতেই বৃন্দাবন দেখিয়ে বসলেন–
মনে মনে মাধববিবি ভাবিতে লাগিল।
বীরভদ্রে মন করি উলঙ্গ হইল।।
উলঙ্গ দেখিয়া বীরের আনন্দিত মন।
রূপের তুলনা দিতে নাহি ত্রিভুবন।।
বিবি কহে শুন কথা ইহার কারণ।
সাক্ষাতে দেখহ এই করহ ভজন।।
কে কোথায় আছে দেহে কর দরশন।
গোপ গোপী সাথে দেখ নন্দের নন্দন।।
শ্রীরাধিকার দেহ দেখ সখীগন সহ।
এই দেহে বর্তে তাহা তুমি নিরিখহ।।
রসময়ী শ্রীরাধিকা দেহ ভিন্ন মন।
গোপী তার অনুচারী বিযুক্ত না হন।।
আরোপ সাধনা, পরকীয়াবাদ, সহাজানন্দের ভজন নিয়েই তো বাউলদের সাধনা। গৌরাঙ্গ সেখানে নারী সাধনায় রত। ফকির বাউল সহজিয়া বৈষ্ণবদের অটল সাধনা করছেন তিনি। মহাপ্রভুর সেই পরকীয়া সংবাদের পুথির হদিশ দিয়েছেন আমাদের সুধীর চক্রবর্তী। মুকুন্দ দাসের লেখা সেই পুঁথিতে রয়েছে মহাপ্রভুর দেহসাধনার খবর–
সন্ন্যাস করিয়া প্রভু সাধে পরকীয়া।
সার্বভৌম নন্দিনী শাটি কন্যাকে লইয়া।।
মহাপ্রভুর পরকীয়া শাটি কন্যা লইয়া।
অটল রতিতে সাধে সামান্য মানুষ হইয়া।।
চৈতন্যদেবের এই সহজ সাধনার ভজন ফকিরিবাদেও ছায়া ফেলেছে। লালন শাহের শিষ্য দুদ্দু শাহ মারফতি সাধনাতেও চৈতন্যদেবের দেহসাধনাকে স্থান দিয়েছেন–
শাটি যে গোবিন্দচাঁদের পরকিয়া কয়।
কোন চাঁদ সাধিতে গোরা শাটির কাছে যায়।।
ধরে শাটির রাঙা চরণ।
সেধে নেয় সহজ সাধন।।
সহজ সাধনার আরেক পুথির হদিশ দিয়েছেন রমাকান্ত চক্রবর্তী। সতেরো শতকের সেই পুঁথিতে রয়েছে আবার বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ এর প্রভাব। সেখানে রাধাকৃষ্ণের গান্ধর্ব বিবাহ দিয়েছেন রচয়িতা নৃসিংহ। লক্ষ্মীর সঙ্গে বিয়ের পর গৌরাঙ্গের সম্পর্ক হচ্ছে নবদ্বীপের গোয়ালার মেয়ে মালতীর সঙ্গে। রাধাভাব চলছে গৌরাঙ্গের। চৈতন্যদেব মদ পান করছেন। রতিলীলা করছেন কৃষ্ণেরই অসংখ্য নায়িকার মতই। ‘রাধাতন্ত্রম’এর পরোক্ষ প্রভাবই রয়েছে এই পুথিতে। বৈষ্ণব তান্ত্রিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়েই নৃসিংহ গৌরাঙ্গলীলার দেহবাদ রচনা করছে। আবার বৈষ্ণবীয় রাধা, ভগবান, মহাপুরুষ–সকলেই ফকির বাউল সাধনায় শরীরী জায়গা পেয়েছেন, অনুমান নয় বর্তমানের ধর্ম মেনে। বর্তমানের পথে এই শরীরের ধর্ম নিয়েই যত গোল বেঁধেছে। নৈষ্টিক গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা যেমন মেনে নেননি রাধাকৃষ্ণের শরীরী আরোপ, তেমন চৈতন্যদেব নিত্যানন্দ-নবী মহম্মদের শরীরী ব্যাখ্যা নিয়েই মারফতি পথের প্রয়োগে গোল বাঁধিয়েছেন শরিয়তপন্থী সাচ্চা মুসলমান, গোঁড়া ব্রাহ্মণ পুরোহিত, রক্ষণশীল বনেদী হিন্দু।
মারফতি সাধনায় নামাজ, রোজা অনাবশ্যক বলে মনে করেন মুর্শিদ। তারা বলেন, প্রকাশ্য নামাজের তো কোনো দরকারই নেই। শরীরটাই হল গিয়ে মসজিদ। সেখানে সবসময়ই দায়েমি নামাজ চলছে। আর কায়মনবাক্যের সংযমটাই হল গিয়ে ফকিরের মারফতি পথের রোজকার কাজ। সেটাই তো রোজা। তাই আলাদা করে হজ করতে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। শরীরটাই তো মক্কা। ফকিরের করণ কৃত্যে ‘আলেখ’ বলার রীতি। আলেখ হলেন অলক্ষ্যের আল্লা। আল্লাহ হলেন ‘রহমন’। মানে হল দয়ালু। আল্লা ‘কুদ্দুস’ পবিত্র, ওদুদ প্রেমময়, বসির স্রষ্টা, জাহির প্রকাশিত, বাতিন প্রচ্ছন্ন, কাইউম নিরপেক্ষ, একরাম সম্মানিত,ওয়ালি বন্ধু, নূর জ্যোতি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শতনামের মতো আল্লাতালারও শতাধিক নাম আছে। ফকিরি ঘরের দীক্ষাশিক্ষায় প্রবর্তক স্তরের সাধক বা কাঁচা মুরিদের আল্লাহর নামগুলো মুখস্থ রাখাই প্রাথমিক শিক্ষা। শরীরের মধ্যেই আছে। প্রশস্ত চিদাকাশ। বাউল ফকিরি মতের ঘরের খবর মানে হল তো সেই শরীরের তত্ত্ব জানা। আল্লাহ আছেন শরীরে, দেহযন্ত্রে। বাউল দেহযন্ত্রকেই বাজানোর কথা বলেছেন। এই দেহের ভেতরই আল্লাহ, দেহেই আকাশের অবস্থান। ‘আপন ঘরে’তাই খোদাকে না খুঁজে আসমানে। তাকিয়ে কোনো লাভ নেই। মুর্শিদই চিনিয়ে দেন আপন ঘর, ঘরের গঠন। অন্তদৃষ্টির এই ঘরে নেহার করলে রূপের মধ্যে স্বরূপকে দেখা যায়। মারফত কথার একটি অর্থ জ্ঞান, আর এই জ্ঞান আদতে দেহঘরের গঠন প্রকৃতি, তাঁর পুব দক্ষিণ, সেই ঘরে কার কার বসত সে সব বুঝবারই জ্ঞান। মুর্শিদ গুরু তাই দেহঘরের আসমান আর খোদাকে খুঁজে দেওয়ার প্রধান ভরসা।
