যাইবি যদি মুরাকিবায় দেখবি রে নূরের খেলা
গুরু মৌল বসাইছে প্রেমের মেলা।
মনকে একাগ্র করে নিয়ে সুফি সাধক মুরাকিবায় বসে আল্লাহর জ্যোতিতে ফানা ফিল্লাহ বা বিলীন হয়ে যান। তাঁরই কারণে প্রথমে জিকর করতে হয়। অর্থাৎ কিনা আল্লাহর নামকে ক্রমাগত জপ করা। জিকর মানে সংযোগের দশাপ্রাপ্তি। এই সংযোগ ঘটান মুর্শেদ। তিনিই বায়েতকে উপদেশ দেন, পদ্ধতি শেখান। সুফি মতের এই সাধন পদ্ধতি নিয়েও ফকির বাউলদের মতই অসংখ্য দেহতত্ত্বের গান আছে। চট্টগ্রামের মাইঝভাণ্ডারি গান সুফি সঙ্গীত হিসেবে বাংলায় প্রসিদ্ধ। জিকর শেষে মুরাকিবায় বসার জন্যই রাবিতার কথা নিয়ে অসংখ্য সাধন সঙ্গীত রচনা করেই বাংলার সুফিরা শরিয়তবাদীদের কাছে ফকির বাউলদের মতই বেশরা সুফি আখ্যা পেয়েছেন।
পারস্য থেকে এসেছিল সুফিদের সাধনার ঘরানা। ভারতে এদের আবির্ভাব পারস্য হতেই। সুরাবর্দিয়া, চিস্তিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া, মাদারিয়া, আহমদিয়া, কলন্দরিয়া–এই সাত গোষ্ঠীর সুফির খোঁজ মিলেছে ভারতবর্ষে, বাংলায় মাদারিয়া গোষ্ঠীর বিশেষ প্রাধান্য। ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর, চট্টগ্রামের মাদারশা ও মাদারবাড়ি এখনও এই তরিকার ঐতিহ্য বহন করছে। বাংলার সুফি তরিকা বেশ ভালোরকম রপ্ত করেই ফকিররা এখানে ফরিরালি পথে নেমেছেন তা আজ যথেষ্টই প্রামাণ্য। জেলাওয়ারি বাংলাদেশ বা ওপার বাংলা ছেড়ে এপারের দাতাবাবার আখড়া বিখ্যাত ফকিরি মক্কা পাথরচাপড়িতেও রয়েছে এখনও মাদারি গোষ্ঠীর ফকির। বজবজের প্রসিদ্ধ দম্মাদার ফকির, গোরভাঙ্গার আরমানরাও একই গোষ্ঠীভুক্ত।
বঙ্গের সুফিপন্থাও দরবেশী পথ বা সহজ ধর্ম, বাউল, বাংলার ফকির বাউলদের ভেতর সুফি ধর্মের প্রাধান্য নিয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজটিই ছিল মুহম্মদ এনামুল হক সাহেবের। ইসলামের লৌকিক ছায়া নিয়ে তাঁর গবেষনাই দেখিয়ে দেয় যে, সাধারণ শ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যে শরিয়ত বা শাস্ত্রীয় ইসলাম কোনোদিনই গুরুত্ব পায়নি। আদতে শরিয়তিরাই মারফতিদের কলকে দেননি। ব্রাত্য, অন্তজ করে রেখেছেন। বাংলার সুফি মত ফকির বাউলদের মতই নিষ্পেষণের ইতিহাসে সমৃদ্ধ। সুফিদের দমন–পীড়নও আঠারো শতকের ফকির বাউলদের উৎখাতের মতো বাংলার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাই ছিল।
শরিয়তপন্থা ও রক্ষণশীল হিন্দুআনায় প্রথম বেগ দিয়েছিলেন পাগলা করিম শাহ। আঠারো শতকের শেষে তিনি ময়মনসিংহের সুসঙ্গ পরগনার গারো, হাজং নিম্নবর্গীয়দের বাউলধর্মে দীক্ষিত করেন। সুফিপন্থার আল্লাহর সঙ্গে বিভোর মরমিয়া চিন্তার উদ্দীপ্ত পীর তিনি। আস্তে–ধীরে শেরপুরের সাতসিকা ও সুসঙ্গ সীমান্ত এবং পাহাড় সন্নিহিত অঞ্চলে তিনি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা অলৌকিক ক্ষমতার দাবীদার হয়ে গারো, হাজং মুসলমানদের রোগব্যধি ও ধর্মপথের উপায় বাতলিয়ে আল্লাহ রাসুলের মরমিয়াবাদ প্রচার করে বৃহত্তর পাগলাপন্থী সম্প্রদায়েরই জন্ম দিয়ে বসেন। যে সম্প্রদায় পরবর্তীতে পাগলা করিম শা ও তাঁর বায়েত টিপু শাহের নেতৃত্বে জমিদারবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। শেরপুর, ঘোষ গাঁও, নেত্রকোনা, সুসঙ্গ, গোটা ময়মনসিংহ জুড়ে গারো-হাজং আদিবাসীদের জনজাগরনের ভেতর ধর্মীয় আলোড়ন তোলেন করিম শাহ। মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি, তাঁর উচ্চ নীচ প্রভেদ নয়। এই ভেদহীন সমাজের কথা বলেছেন করিম ও টিপু শাহ। জমিদার গোষ্ঠীর সামাজিক ভেদাভেদের নিষ্পেষণের কারণে গারোরা করিম-টিপুদের সকল মানুষ সমান–এর ধর্মে ছুটে এসে শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বল পায়।
ময়মনসিংহে এই পাগলপন্থা বিকাশের অনেক পরে উনিশ শতকের শেষভাগে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার লালনশাহী আখড়া গড়ে ওঠে। যশোরের হরিশপুরে পাঞ্জু শাহ, দুদ্দুশাহের মত প্রাধান্য পেতে থাকে। একে একে আরও লোকধর্মের প্রবর্তক, লোকনেতার দেখা মিলতে থাকে এদিকে। পীর জালাল নুরুল্লাপুরে, চট্টগ্রামে মাইজভাণ্ডারি আস্তানার পীর আহাম্মদুল্লা শাহ, মহম্মদ জান শরীফ ফরিদপুরে, রাজশাহিতে পাগলা কানাই, ঘোষদাড়ি কুষ্টিয়াতে পাঁচু শাহ, গোপাল শাহ পাবনায়, জঙ্গীপুর মুর্শিদাবাদে সৈয়দ মর্তুজা, ঘোষপাড়ায় আউলেচাঁদ-দুলালচাঁদ-সতী মায়ের কর্তাভজা ঘর, মাইজপাড়া বাউদিয়াতে উজল শাহ, নাজিরপুর নদিয়ায় গোপাল শা, নদিয়ার ভাগা গ্রামে খুশি বিশ্বাস, বৃত্তিহুদায় চরণ পাল–কুবির গোঁসাই–এভাবেই অকুলীন দরিদ্র মুসলমান। সদগোপ, গোয়ালা, হাড়ি, যুগী, চামারদের ধর্মমতের আকস্মিক সন্নিপাত ঘটে যায় আঠারোর শেষ থেকে উনিশের বিস্তৃত সীমানায়। বঙ্গ জুড়ে শা, শাহ, চাঁদ, দরবেশ, সাঁই, নেড়া, খ্যাপা, পাগল, আউল, বাউল, ফকিরদের বৃহত্তর জনতা। শরিয়তের বেশ, খাদ্য, সংস্কৃতি, ভাষা থেকে যাঁদের অনেকখানি পার্থক্য। পার্থক্য একেবারে সরাসরি আচরণবাদেও নাম, জপ, জিকির, চন্দ্রভেদ, রসরতি, রজঃ সাধনা, তন্ত্র সাধনা নিয়ে এখানেও তারা খাদ্য, পোশাক, চন্দ্রভেদের তারতম্যে, চারচন্দ্র ভেদ, দ্বিচন্দ্রভেদ, একচন্দ্র ভেদ, রসরতি যুক্ত ও বিহীন–অর্থাৎ শরীরের মল-মূত্র-শুক্র-রজের একত্র, একটি, দুটির ব্যবহারে, সন্তানের জন্ম দিয়ে বা যোনি অযোনি দেহসাধনা দিয়ে লুঙ্গি পাজামা পরে, গোঁফ হেঁটে, সর্বকেশ, দীর্ঘকেশ, গোঁফ রেখে, খত্ন বা ত্বকচ্ছেদ করে বাহ্যিক আচরণেও এরা বিচিত্রধারী। বৈদিক শরিয়তের প্রচলিত বিধান থেকে সরে আসার কারণেই এদের অণৈশ্রমিক লৌকিক আচরণ ও প্রথাকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যই ‘বাউল ধ্বংসের ফওয়া’ ওঠে। মুর্শিদই খোদা, বিবাহ আবশ্যক নয়, বায়েতদের ভ্রাতা ভগ্নীদের মধ্যে দেহ মিলন, চারচন্দ্র, নেশা–এসব ইসলাম বিপন্নতার নজির। তাই উঠে পড়ে লেগে পড়লেন ফতোয়াধারী দলের সম্পাদক আলী আহাম্মদ।
