মহাপ্রভু রাধার সেই প্রেমময়ী সত্তাটিকেই ব্রজ থেকে নদিয়ায় নামিয়ে এনেছিলেন, নদিয়া থেকে গোটা বাংলায় শ্রীরাধিকার সেই সত্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন লোকায়ত সাধকরা তাঁদের করণকেন্দ্রিক গুহ্য ধর্মে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই লোকায়ত এলাকায়, লোকধর্মে বিন্দুস্বরূপ,বস্তু বা বীর্যতে রূপান্তরিত হয়েছেন। কৃষ্ণ যদি বিন্দু বস্তু বীর্য হয়ে ওঠে তবে তাঁকে ধারণ করছে সাধক শরীরের স্থূল দশা; যা প্রকৃতিতে সামিল–
কোন কৃষ্ণ হয় জগৎপতি
মথুরার কৃষ্ণ নয় সে সে-কৃষ্ণ হয় প্রকৃতি।
জীব দেহে শুক্ররূপে এ ব্রহ্মাণ্ড আছে ব্যেপে
কৃষ্ণ তারে কয় পুরুষ সেই হয় সেই রাধার গতি।।
রাধাকে সেই কৃষ্ণের স্বকীয়া হিসেবে তৈরি করে নেওয়ার বৃন্দাবনীয় জায়গা ছেড়ে বের করতে পেরেছিলেন নদীয়ার নিরক্ষর ফকির। লোককবিদের হাতে পরে রাধা কলঙ্কী হয়েছেন, অসতী হয়েছেন। বৃন্দাবনের শিক্ষিত গোস্বামীরা তখন লোকধর্মের হাতে পরা রাধার কলঙ্ক মোচনে উদ্যোগী হলেন। ‘স্বরূপত স্বকীয়া’, ‘পরকীয়া’-এইসব তত্ত্বত্ত্ব চাপিয়ে শেষমেশ সাবধানবানী পর্যন্ত জুড়ে দিলেন–
পরকীয়া বিনা নাহি রসের উল্লাস।
ব্রজ বিনা ইহার অন্যত্র নাহি বাস।।
অথচ রাধা ব্রজ ছেড়ে দিব্ব্যি নদিয়ায় এলেন চৈতন্যের ভাব ও আরোপ সাধনায়। সহজিয়া বৈষ্ণব শাখায়, বাউল শাখায়, ফকিরিপন্থায় তাঁর একটি সম্মাননীয়ার জায়গাও হল।
ফকির সাঁই বললেন–
রাধারানির ঋণের দায় গৌর এসেছে নদিয়ায়
গৌর-গৌরাঙ্গের রাধাবাহিত হয়ে এই আসাটিকেই নদিয়া তথা বাংলার লোকধর্ম সম্মান করেছে, মর্যাদা দিয়েছে। সেই মর্যাদা, সম্মানের কারণেই নদিয়ার মাতৃকামণ্ডলে বৈষ্ণবাচার্য অদ্বৈত আচার্যের সহধর্মিনী সীতা দেবীর সীতা মা হয়ে ওঠা এবং নিত্যানন্দ প্রভুর সহধর্মিনীর স্বামীর অবর্তমানে দিশাহীন বাংলার বৈষ্ণবধর্মকে পথ দেখাতে জাহ্নবী মা হয়ে ওঠার মতই কর্তাভজা ধর্মগুরু রামচরন পালের অবর্তমানে সরস্বতী পাল হয়ে উঠলেন ধর্মগুরু, সতী মা। লোকধর্মে এও এক নারীর প্রাধান্যের দিক। আর তাঁর করণ দিকে তো অনবদ্য নারী বা মাতৃবন্দনারই আধার–
নিগম বিচারে সত্য গেল তাই জানা
মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা
লোকধর্ম এই ঠিকানার সন্ধানে ঘুরতে ফিরতে গিয়েই তো কলঙ্কিত হয়েছে, নিষ্পেষিত হয়েছে। তবে এই নিষ্পেষণের বড় কারণটি কিন্তু শাস্ত্রশাসনের বাইরে নিজেদেরকে নিয়ে যাওয়াটা। মানুষের মধ্যে খোদা বা ঈশ্বরকে খুঁজে ফিরে, মৃত্যুর পর দেহ আকাশ মাটি আগুন বায়ু জলে ফিরে যাওয়াটাকে মেনে, পূর্বজন্ম–পুনর্জন্মকে নষ্যাৎ করে, ব্রত পুজো রোজাকে উপেক্ষা করে দেহধর্মের রজবীজের করণে মেতে থাকা একটা সমাজ শাস্ত্রীয় প্রনালীবদ্ধ ধর্মাচারীদের কাছ থেকে তাঁদের দেহ বেদ-কোরান বলে প্রচারের জন্য কোনও সংঘাতের মুখোমুখিই হবে না, এটা কী কোনওভাবেই সম্ভব?
সাম্প্রদায়িক সীমানা অস্বীকার, জাতপাত বর্ণে লিঙ্গে অগ্রাহ্যতা,মানুষের সেবাপুজো খালি ধর্মাচারের মূল প্রতিপাদ্য, মানুষ অন্বিষ্ট, সেই অন্বেষণে দেহের রজঃ বা বর্জ্য ব্যবহার, তাঁর ভেতর করণকে গুপ্ত করে সাধনার মহামন্ত্র গানে ধরে রাখা, যতই সেটা হোক না কেন সমাজ শাসনের ভয়–এতে শাসকরা, মোল্লা মৌলবী পুরোহিতরা তাঁদের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি ক্ষয়ের বিরুদ্ধে বিরোধিতা ও সামাজিক নিগ্রহ। করবে, এটা কিন্তু একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই বাংলায় বাউলবিরোধী আন্দোলন, বাউল-ফকির ধ্বংসের ফতোয়া একেবারেই অনভিপ্রেত ঘটনাই নয়, এ হল শাস্ত্রশাসিত ধর্মাচারীদের ভিত নড়ে যাওয়ার অস্বাভাবিক ভয়। অসহায়, বঞ্চিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত, নিরক্ষর মানুষরা মূল সমাজ পরিমণ্ডলে অন্তজ হওয়ার কারণেই ব্রাত্য হয়েছে, উচ্চবর্গের ধর্মে, বর্ণে, সমাজে জায়গা পায়নি বলেই তাঁদেরই কোনও কোনও প্রতিনিধিরা সাহস করে, আশা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেই নির্ভীক মানুষগুলির কাছে তখন পিলপিল করছে জনতার স্রোত। এই মানুষগুলি তাঁদের বুঝিয়েছেন, কৃষ্ণ, শিব, ব্রহ্মা, মহম্মদ ব্যক্তিনাম। বৃন্দাবন, মথুরা, মক্কা, কাশী হল গিয়ে জায়গা বেদ, কোরান হল গিয়ে কেতাব, শাস্ত্রের বাণী মৌলভী, পুরোহিত, নবী, মুনি, পণ্ডিতদেরই রচনা। এখানে ভগবান বা আল্লাহর কোনও হাত নেই। যারা এগুলো লিখেছেন বলছেন তারা সকলেই দেহসাধনার অর্জিত ফলাফলই ঘোষণা করেছেন। তাই তোমরা দেহকে জানো, করণ দিয়ে; শ্বাস দিয়ে, দম দিয়ে, রজঃ, বর্জ্য দিয়ে তাঁকে ব্যবহার করো স্কুল ও সূক্ষ্মতে; স্কুলের সেই ব্যবহারেই মদ-মাংস-মৎস্য-মুদ্রা-মৈথুন। আর সেই মৈথুন ঘেরা লোকধর্ম, যুগল সাধনা তাই আক্রমণের শিকার। এই আক্রমণে যেমন দেহগন্ধী ব্যভিচারের ইঙ্গিত আছে, তেমনই আবার মোল্লা-মৌলবী-পুরোহিত-ব্রাহ্মণদের আধিপত্য হারানোর ভয়টাও আছে। লোকধর্ম কতখানি আড়ে বহরে বাড়লে এই ভয় আসতে পারে উনিশ শতকের বাংলার বাউল বিরোধী আন্দোলন বা বাউল ধ্বংস ফতোয়া থেকে তা তো সহজেই অনুমেয়।
*****
মুসলমান ধর্ম সম্প্রদায়ের মোল্লা মৌলবিরাই বাউল বিরোধী আন্দোলনে সব থেকে বেশি অংশগ্রহন করেছেন। উনিশের বাউলধর্মে বাউল গুরু-মুর্শিদের সংখ্যাধিক্য, জনপ্রিয়তা, বয়াতি বৃদ্ধিই মোল্লা মৌলবীদের টনক নড়িয়ে দিয়েছিল। তবে হিন্দু পুরোহিত ব্রাহ্মণ গোস্বামীরাও এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেননি এরকম ভাবার কোনও কারণই কিন্তু নেই। একদিকে ছেউড়িয়ার আখড়া যেমন আক্রান্ত হয়েছে লালনের জীবদ্দশাতেই; ফকির সাঁই মুসলমান হিন্দু দুই সম্প্রদায়েরই আক্রমণ সহ্য করেছেন অপরদিকে ঘোষপাড়ার কর্তাভজা ধর্ম নিয়ে দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ ঠাকুর পর্যন্ত আক্রমণ শানিয়েছেন। বাউলধর্মকে পায়খানার দরজা দিয়ে ঢোকার পথ বলে তীর্যকতাও ছুঁড়েছেন তিনি। ‘কর্তাভজা মাগীদের নিয়ে রীতিমত তিনি চিন্তিত। অথচ এই ধর্মমতে ব্যাপক জনজোয়ার দেখে উনিশের প্রথমেই ঘোষপাড়া ছুটেছিলেন শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনারী উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যানরা। উনিশের মধ্যভাগে মিশনারীদের সাথে কর্তাভজা সংযোগ আরও বেড়েছে কেবল একটি মাত্র উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করে। বর্ণহীন শ্রেণিহীন দরিদ্র অশিক্ষিতদের যদি কর্তাভজাদের কর্তা ভজনার একেশ্বরবাদ দিয়েই ধর্মান্তরিত করে নেওয়া যায়, ইংরেজ মিশনারী বিশপ উইলস, জে.জে ওয়েট ব্রেখটদের এই উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। উনিশের মধ্যভাগে কর্তাভজা খ্রিষ্টান হয়েছে ঘোষপাড়ার মতের অনেকেই। এই ধর্ম আখড়া নিয়ে কম তো আঙুল ওঠেনি। অক্ষয়কুমার দত্ত পেছনে লেগেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত কলম শানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তৎকালীন শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবিরা দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন কর্তাভজা ধর্ম বা সতী মায়ের। মত নিয়ে। যে কারণে রামমোহন রায়, ভূকৈলাশের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, সন্তদাস বাবাজি, নবীনচন্দ্র সেনদের মতো সমাজ সংস্কারক, রাজা সম্রান্ত, আধ্যাত্মিক পথসন্ধানী, কবি প্রশাসকদেরও যাতায়াত ঘটেছে নিজ নিক প্রয়োজনেই। পাদ্রী, সাধু সন্ত, তান্ত্রিক-বৈদান্তিক, ফকির-সন্ন্যাসী সকলেই এসেছেন সতীমায়ের অঙ্গনে প্রাণের টানে কিংবা কৌতুহলে। সংবাদপত্র, সাময়িকীতে কর্তাভজা ধর্মের বিরূপ সমালোচনা, টিপ্পনীসহ দাশরথি রায়ের গান, দোলমেলাতে বাবু-বেশ্যার সমাহার সবই এটাই আদতে প্রমাণ করে যে, উনিশ শতকের সবচেয়ে বৃহত্তর লোক সম্প্রদায়টিই ছিল কর্তাভজা ধর্ম। আজও এই বিশ পেরিয়ে একুশ শতকেও কিন্তু কর্তাভজা ধর্ম সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকসম্প্রদায়। ছেউড়িয়ার ধর্ম, লালন সাঁই পপুলার কালচার হয়েছে ঠিকই বিশের শেষ থেকে শুরু করে এই ভরা একুশে; যার চর্চা অবশ্য শুরু হয়েছিল শিলাইদহে ঠাকুরবাড়ির বদান্যতায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সরলা দেবী, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’ পেরিয়ে দেশভাগে ফকির সাঁইয়ের পাকিস্তানি আমল থেকে ছেউড়িয়া বাংলাদেশে মোল্লা মৌলবীদের ইসলামীকরণের পরিসর টপকিয়ে, চেকনাই লালনের মাজার, বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অর্থানুকুল্যে ‘লালন কমপ্লেক্স’, শ্বেতশুভ্র প্রাসাদ পেরিয়ে লালন এখন দুই বাংলা পেরিয়ে বাউল ফকিরদের কণ্ঠ নির্গত হয়ে বিনোদনকামী বিশ্বনাগরিক। অথচ আজও, একুশ শতকে বাউলপন্থীরা আক্রান্ত হন বাংলাদেশে, চুয়াডাঙ্গার গোবিন্দপুরে আখড়ায় ঢুকে বাউলদের মারধর করা হয়, আখড়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, প্রতিরোধে নামে চুয়াডাঙ্গা জেলার বাউল সংঘ। লালন ফকিরের দেশে বাউল হামলা আজও বলবৎ, আখড়া ভাঙা, পোড়ানো, একতারা-দোতারা-ডুবকি নষ্ট; আখড়াবাসীদের চুল দাড়ি কেটেকুটে নির্যাতন এ তো বিশের শেষদিকে বাউল সঙ্গীত পপুলার কালচার হয়ে ওঠার পর এ বঙ্গেও কম ঘটেনি। নদিয়া মুর্শিদাবাদের তেহট্ট, করিমপুর, বেলডাঙ্গা, নওদা, জলঙ্গি, ডোমকল, হরিহরপাড়াতে সংখ্যাগুরু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বাস। এইসব এলাকার বাউল ফকিরদের ওপর তাই শরিয়তবিধি পালনের নির্দেশ আছে। সভা করে সমঝোতায় না আসায় বাউলদের দীর্ঘ চুল কেটে নেওয়া হয়; ফকিরদের জোর করে গো মাংস খাইয়ে দেওয়া হয়। সত্তর দশকের এই ঘটনার পর নব্বই দশকে ফকিরি গানের জলসা বা সম্মেলনগুলিকে হারেম আখ্যা দেওয়া হয়। মুসলমানদের নামাজ না পড়া নিয়ে, রোজা, শরিয়ত ইসলাম মেনে না চলার কারণে আক্রমণ আসে ফকিরি ধর্মে,বাউল মতে। থানা-পুলিশ-প্রশাসন-সংবাদপত্র বাউল-ফকির সংঘ সবই ধর্মীয় নিপীড়ন নিয়ে বিরুদ্ধাচারে নামে। গ্রামত্যাগে বাধ্য করা, আশ্রম ভাঙা, আখড়া পোড়ানো, গান বন্ধ, সেচ বন্ধ, মিথ্যা মামলা, মাঠ বন্ধ,জরিমানা, সাধুসভা বন্ধ, ঘর পোড়ানো, চুরি, লুঠ, ফসল নষ্ট, গৃহপালিত পশুপাখি চুরি, প্রাণনাশের হুমকি, হিন্দুকে গুরু করার অপরাধে বয়কট, স্ত্রী কে তালাকে বাধ্য করা, লাঞ্ছনা, তোবা করানো, এমনকি গলা কেটে নৃশংস হত্যা–সব রকমের সামাজিক নিষ্পেষণ বিশের শেষ তিন দশক ধরে বাউল সঙ্গীত পপুলার কালচার হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জে ঘটেছে। ফকির বাউলদের এই নিপীড়ন, লোকধর্মের সাধুগুরুদের বিরতিহীন বিরোধিতা এটাই তো প্রমাণ রাখে যে, বিশ–একুশের বাউল ফকিরদের সংস্কৃতি সঙ্গীতের ঐতিহ্য এখন পপুলার কালচার হলেও শাস্ত্রবাদী শরিয়ত ভাবনার সেই উনিশের প্রভাব প্রতিপত্তি ক্ষয়ের চিন্তাধারাটা আজও একই মানচিত্রেই আছে। হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীদের দ্বারাই নিগৃহীত হয়েছে, হচ্ছে, হবে বাউল ফকিরের মত। কেননা এ মতেই রয়েছে বেদ, কোরান, পুরাণ, বাইবেল কিছুই না মানার অভিমত। যা চিরকালই প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়া রক্ষণশীল ধর্মাচারীদের চিন্তায় ফেলেছে, ফেলছে, ফেলবে। লোকধর্ম তাই মূল ধর্ম ও সমাজের বিরাগভাজন ও শত্রু বলে বিবেচিত যে হবেই, তাতে খুব একটা আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
