লোকধর্মের গুরু গোঁসাইরা চৈতন্যদেবের থেকেও নিত্যানন্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। চৈতন্যের মতো এখানে দেহগত নিত্যানন্দের জায়গাটি অবশ্য আরওই মারাত্মক। বাউল মহাজন ‘নিত্যানন্দ দ্বার’ বোঝাতে সাধন সঙ্গিনীর যোনিটিকেই বুঝিয়েছেন। এতে নিষ্ঠাবান বৈষ্ণবদের বৈষ্ণব ভাবনায়, তত্ত্ব ভাবনায় আঘাত লেগেছে ঠিকই। লোকধর্মের গুরু-গোঁসাই-উদাসীন-বৈরাগীদের তারা চিরকালই হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, দাবিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন; তাঁদের জাতপাত ধর্মবর্ণহীন নারী পুরুষের যুগল সাধনার উদার সমীকরণটিকে বুঝতে চাননি। অবশ্য এ বোঝাতে প্রথম থেকেই গোড়ায় গলদ ছিল। সেই গলদই চৈতন্যদেব–নিত্যানন্দ–অদ্বৈত–গদাধর–শ্রীবাস পর্বের পর বৃন্দাবন সংযোগের শ্রীজীব গোস্বামী পরম্পরার নরোত্তম শ্রীনিবাস শ্যামানন্দ এবং আরও পরের কৃষ্ণদাস কবিরাজ, নরহরিদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলার বৈষ্ণবতার বিচ্ছিন্নতাটিকে রুখে দিতে পারেনি।
চৈতন্যদেব জাতিবর্ণের ভেদাভেদ ঘোচাতে চেয়েছেন। পরবর্তীতে নিত্যানন্দ, নরোত্তম, শ্যামানন্দ ছাড়া সকলেই ব্রাহ্মণত্বের প্রভাব ও প্রতিপত্তির সঙ্গে সমঝোতা করে গেছেন। বিমানবিহারী মজুমদার আরও এক মারাত্মক সংবাদ দিয়েছেন। চৈতন্যদেবের ৪৯০ জন প্রত্যক্ষ শিষ্যের তালিকা করে ‘শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান’ নামক আকর গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্য সংখ্যা ৪৯০ জন, যাঁদের মধ্যে ২৩৯ জন ব্রাহ্মণ শিষ্য, ২৯ জন কায়স্থ, বৈদ্য শিষ্য সংখ্যা ৩২, ২ জন মুসলমান শিষ্য, মহিলা শিষ্য ১৬ আর ১১৭ জন শূদ্র। আচণ্ডলে কোল দেওয়া ঠাকুরের ব্রাহ্মণ শিষ্য সংখ্যাই বলে দিচ্ছে যে, চৈতন্যদেব গোস্বামীদের শাস্ত্রীয় বৃন্দাবনীয় ভক্তিধারায় বর্ণাশ্রমী সমাজ জমির দিকেই শেষমেশ ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা শেষ জীবনে হিতাহিত শূন্য দশায় তিনি সম্পূর্ণ বৃন্দাবনীয় গোস্বামীদের শাস্ত্রিক খপ্পরে। যেখানে উচ্চবর্ণের আনাগোনা আর ক্ষমতাবৃত্তের ভক্ত পরিকর খালি, নিম্নবর্গীয় জনতার ঠাঁই নেই না নীলাচলে, না বৃন্দাবনের শাস্ত্রীক তর্ক ও জ্ঞানগরিমায়। বাংলার নিষ্পেষিত জনগনকে তখন কোল দিলেন নিত্যানন্দ প্রভু। নিত্যানন্দ হলেন তখন আমজনতার ত্রাণকর্তা। ফকির লালন সাঁই নিত্যানন্দের এই মহিমা উপলব্ধি করেই কিন্তু গান বেঁধেছিলেন–
দয়াল নিতাই কারো ফেলে যাবে না
চরন ছেড়ো না রে ছেড়ো না
নিত্যানন্দের এই জনাকর্ষী ক্ষমতাই বাংলার ফকির বাউল সহজিয়াদের আকৃষ্ট করেছিল চৈতন্যদেবের থেকেও বেশি লোকধর্ম তাই দয়াল নিতাই কেই কাণ্ডারী করেছে–
দৃঢ় বিশ্বাস করি এখন
ধরো নিতাইচাঁদের চরণ
এবার পার হবি পার হবি তুফান
অপারে কেউ থাকবে না।
*****
লোকধর্মের ভেতরে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্ম হল গিয়ে বাউল ধর্ম। দেহকেন্দ্রিক ইহবাদের ছায়াঘেরা লোকধর্মে বরাবরই শরিয়তপন্থী মুসলমান ও শাস্ত্র ও পুরোহিত তন্ত্র মানা হিন্দু ধর্মাচারীদের কাছ থেকে অনাদৃত ও নিগৃহীত হওয়ার কলরব উঠেছে। পনেরো ষোলো শতক থেকে শুরু করে বিশ শতক পর্যন্ত বাংলায় নানা বৈষ্ণবীয় উপসম্প্রদায় সহ। বেশকিছু লোকধর্মের উদ্ভব হয়েছে। যার ভেতর বৃহত্তর হিসাবে চিহ্নিত বাউল ফকিরদের কায়াবাদী আচরণ আর অবশ্যই কর্তাভজা ধর্মমত। এ ধর্মের প্রবর্তক আউলেচাঁদ আঠারো শতকের দ্বীতিয়ার্ধে সম্প্রদায়ের প্রধান গুরু রামচরণ পাল সহ ২২ জনকে দীক্ষা দিয়ে এ ধর্মের সূচনা করেন। পরবর্তীতে রামচরণ পালের স্ত্রী সরস্বতী পাল কর্তাভজা সম্প্রদায়ের কত্রীর ভূমিকাতে অবতীর্ণ হন। তাঁর সরস্বতী পাল থেকে সতী মা হয়ে ওঠাটাই প্রমাণ করে যে নদিয়ার ধর্ম বরাবরই মাতৃকামণ্ডলের আধারিত। নদিয়া পালন করেছে বৃন্দাবনের ধর্ম যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মর্ত্যবাসিনী সাধারণ নারী রাধিকার জায়গা হয়েছে। তবে কৃষ্ণের সিংহাসন উচ্চকোটির সংস্কৃতিতে বরাবরই উজ্জ্বল শাস্ত্রকারদে টাকাভাষ্যের কল্যাণে। সংস্কৃত ভাষার দখলদারিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জায়গা পেয়েছেন এমন এক সমাজে, যেখানে গণমানুষদের কোনও প্রবেশাধিকারই ছিল না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য পরিশেষে বৃন্দাবনের গোস্বামীদের খপ্পর থেকে আর বেরোতেই পারলেন না। এই দু’জনের অস্তিত্বের যা কিছু জায়গাজমি লোকধর্মে, লোকায়ত মানুষদের মনে, সবটুকুই নিত্যানন্দ প্রভু ও প্রেমময়ী শ্রীরাধিকার কল্যাণেই। রাধা কোনোদিনই দেবীত্বের মর্যাদা অর্জন করতেই পারেননি শাস্ত্রমান্যতার পুরুষতন্ত্রের ধাঁচায়। তাঁর যেটুকু যা স্বীকৃতি আর সম্মান সবই কিন্তু প্রাদেশিক ভাষায়। কোনও সন্দেহেরই জায়গা নেই শ্রীমতি শ্রীরাধিকা বৃন্দাবনে একটি মাতৃকামণ্ডল গড়ে নিতে পেরেছিলেন। এই মাতৃকামণ্ডলীর প্রধানাকে শেষপর্যন্ত স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বৃন্দাবনের গোস্বামীরা। রাধার একটি শাস্ত্রীয় জায়গা তাই তৈরি হচ্ছিল কৃষ্ণের সাজুয্য মেনে। কৃষ্ণকে প্রাধান্য দিয়ে রাধা সংস্কৃত সাহিত্যে প্রতিষ্ঠাতা। অথচ লোকধর্ম, সহজিয়া বৈষ্ণব সাধনার কড়চায় তাঁর মস্ত সিংহাসন:
সিদ্ধি ধর্মের গুরু শ্রীরাধাসুন্দরী।
ইহার কৃপা বিনে নাহি মিলে ব্রজপুরী।।
