শুনে অজানা এক মানুষের কথা
গৌরচাঁদ মুড়ালেন মাথা।
ফকির-বাউল-দরবেশদের সেই অদৃশ্য প্রভু, অলক্ষ্য স্বামী, পরমাত্মা, মানুষ, আল্লাহ, আলেখ সাঁই, সহজ মানুষ, ভাবের মানুষ, রসের মানুষ–সবই এভাবেই বসে গেল শ্রীচৈতন্যদেবেরই সাজুয্যে। চৈতন্যদেব এভাবেই হয়ে উঠলেন দিব্য যুগের কারিগর। শাস্ত্রীয় সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি’র মাঝখানে অশাস্ত্রীয় লালন সাঁই এভাবেই চৈতন্য সকাশে গিয়ে তাঁকে দিয়েই দিব্যযুগ আনালেন–
সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি হয়
গোরা তার মাঝে এক দিব্যযুগ দেখায়।
চৈতন্যদেব শুধু দিব্যযুগ দেখিয়েই ক্ষান্ত হলেন না ফকিরিপন্থায়, তিনি নবীন আইন’ও আনলেন লালন শাহের ভাষায়—
গোরা এনেছে এক নবীন আইন দুনিয়াতে
বেদপুরাণ সব দিচ্ছে দুষে
সেই আইনের বিচার মতে।
এভাবেই চৈতন্যদেবের ভেদাভেদহীন সমাজ ব্যবস্থায় আর শাস্ত্র টপকানো নাম গানের ভাষাতে জুড়ে গেল বেদপুরাণকে অস্বীকার করা নিরক্ষর, নিষ্পেষিত, ব্রাত্য, সমাজ বিচ্ছিন্ন কুষ্টিয়ার ফকিরের মত। তিনি তাঁর কায়াবাদী গুহ্য সাধনার ভেতর চৈতন্যদেবকেও রেখে দিলেন নতুন আইনের প্রবর্তক হিসেবে, বাংলার লোকধর্ম এভাবেই চৈতন্যদেবের সঙ্গে গাঁটছড়াটি বেঁধে নিয়ে তাঁকেই দ্রষ্টা ও প্রদর্শকের ভূমিকাতে দিব্যি ঠেলে তুলে বলহীন, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত, সমাজছিন্ন, নিরক্ষর মানুষদেরই শক্তি হয়ে উঠলেন। গৌরজন্মের সঙ্গে জুড়ে গেল লোকধর্মে ব্রজ ও নদিয়া–
ব্রজ ছেড়ে নদেয় এল
তার পূর্বান্তরে খবর ছিল
এবে নদে ছেড়ে কোথা গেল
যে জানো বলো মোরে।।
চৈতন্যদেবের এই অন্তর্ধানের কাহিনীটিই আদতে জুড়ে গিয়ে লোকধর্মে হয়ে উঠল প্রবর্তকদের আসারই মধুস্রাবী সঙ্গীত।
সহজিয়া বৈষ্ণবরা গড়লেন গৌড়ীয় সাজুয্যে একেবারে ধ্বনিবহুল সংস্কৃত পয়ারঃ
শ্রীচৈতন্যং প্রভুং বন্দে প্রেমামৃতরসপদং।
শ্ৰীবীরচন্দ্ররূপেণ প্রকটিভূত ভূতলং।।
কর্তাভজারা বললেন–তিন এক রূপ।
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগৌরচন্দ্র ও শ্রীদুলালচন্দ্র
এই তিননাম বিগ্রহস্বরূপ।।
সাহেবধনীরা বললেন–
ওরে বৃন্দাবন হতে বড় শ্রীপাট হুদা গ্রাম
যথা পিবানিশি শুনি দীনবন্ধু নাম
হেরি নীলাচলে যেমন লীলে
এখানে তার অধিক লীলে
হিন্দু যবন সবাই মিলে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম।
বলরামীরা বললেন–
নিত্য চৈতন্য পুরুষ হাড়িরাম উদয় মেহেরপুর
যে জানতে পারে তারই নিকট নইলে বহুদূর।।
বৈষ্ণবের জন্য কাঁদে নিতাই আর গৌর
আবার এই বৈষ্ণব গোঁসাই ঠাকুরের ঠাকুর।।
পাটুলি-কাটোয়া-অগ্রদ্বীপের আস্তানায়, ঘোষপাড়া–হুদা–মেহেরপুর নদীয়ায় এভাবেই লোকধর্মের প্রবর্তকদের ভেতর চৈতন্যাবতার নেমে এলেন। চৈতন্যদেবই হয়ে উঠলেন বাংলার বাউল, ফকির, কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলরামী, সহজিয়া সহ নানা উপসম্প্রদায়েরই প্রধান পুরুষ। বাংলার বাউল ফকির লোকসাধনার ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটে চৈতন্যদেব আবারও যেন জুড়ে গেলেন আঠারো উনিশ শতকের লোকধর্মে–
যাঁদের আছে সুসঙ্গ
দেখে গঙ্গা গৌরাঙ্গ
সময় সময় সুরধনীর বাড়ে তরঙ্গ।
*****
লোকধর্ম চৈতন্যদেবকে আদতে নিয়েছে কায়াবাদী দেহসাধনায়। বৈষ্ণবদের। পঞ্চতত্ত্ব তাই অনায়াসেই ঢুকে যেতে পেরেছে বাউলের সাধনায়। পঞ্চতত্ত্বে শরীরের গঠন বোঝাতে গিয়েই বাউল গুরু বলছেন, চৈতন্য একটা ভাবান্তরিত চেতনারই নাম; তিনি মূর্তিতে, মন্ত্রতে নবদ্বীপ, শান্তিপুর, খড়দহ, বাগনাপাড়া, অগ্রদ্বীপ, কাটোয়া, আদি সপ্তগ্রামের বৈষ্ণবতীর্থে, শ্রীপাটের সিংহাসনের শোভায় বিরাজিত নন। তিনি হলেন বাউল গুরু, সহুজে আখড়ায় কায়াবাদী সাধকদের প্রেমস্বরূপ একটা স্তরান্বিত সত্তা। তিনি আছেন কায়াবাদী সাধকের কামের রঙে, ঘোর কৃষ্ণ হয়ে। সেই কামের শরীরে ঝাঁপ দিয়েই সাধক সাধন সঙ্গিনীর শরীর শোধন করে দেন। নিজের দেহকেও করে তোলেন প্রেমের বরণ কাঞ্চন। চৈতন্য হল সাধক ও সাধন সঙ্গিনীর বীজ ও হলাদিনী সত্তারই সমন্বয়াবস্থা একটা। চূড়ান্ত দেহগত দশা। প্রকৃতি, সাধন সঙ্গিনী ছাড়া এই চৈতন্যসত্তাকে বোঝা খুব মুস্কিল। আনন্দস্বরূপ রসের সন্ধানেই সাধকের প্রকৃতি সাধনা। চৈতন্য লাভের জন্যও প্রকৃতি সাধনা। ব্রজজমির কৃষ্ণলীলায় রাধার জায়গা কৃষ্ণের হৃদয়ে আর নবদ্বীপলীলা বাউল সহজিয়াদের মতে সেই ‘উল্টা স্রোতে নৌকা বাওয়া’–রাধার অন্তরে শ্রীকৃষ্ণ। সেই কারণেই আসলে তিনি গৌরাঙ্গ; গৌরাঙ্গ প্রেমস্বরূপ, হেমবর্ণ। লালন ফকির সাঁই তাঁর সাধন সঙ্গীতে, দেহতত্ত্বে চৈতন্যতত্ত্বেরই কিন্তু ইঙ্গিত রেখেছেন–
ও না ব্রজে ছিল জলদ কালো
জানি কি সাধনে গৌর হলো
এই গৌর হয়ে ওঠাটাই তো ফ্যাঁকড়া-ফকির, বাউল-বয়াতির সাধনা। বাংলার আউল-বাউল, ফকির-ফ্যাকড়া, দরবেশ, উদাসীন, বয়াতিরা চৈতন্যের সেই গৌরতত্ত্বের সাধনার ভেতর দিয়ে যেতে গিয়েই চৈতন্যদেব ও তাঁর পরিকরদের পঞ্চতত্ত্বকে দেহ। গঠনের মধ্যেই এনে তুলেছেন। ব্যোম মানে তাঁদের চৈতন্য, মরুৎ নিতাই, তেজ অদ্বৈত, ক্ষিতি গদাধর আর অপ হল শ্রীবাস। শরীরের গঠন প্রক্রিয়ায় শ্বাস হল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই শ্বাস চলাচলেরই ভেতরই রয়েছে কায়াবাদী সাধকের বিন্দুর চলাচল। শ্বাস। নিয়ন্ত্রণ যেমন এই সাধনার মুখ্য একটি বিষয়, তেমনই শ্বাসক্রিয়ার সমতায় বিন্দু নিয়ন্ত্রণ বা বস্তুরক্ষাও তাই কায়াবাদী সাধনার ভরকেন্দ্র। এই বিন্দু, বীর্য তাই সাধকের চৈতন্য যেমন, তেমনই কৃষ্ণসত্তাতেও তো সামিল। একদিকে চৈতন্যদেব, অপরদিকে নবী মহম্মদকে গুপ্তজ্ঞানে চিহ্নিত করেই বাউল ফকিররা কিন্তু তাঁদের সাধন আধার স্পষ্ট করেছেন। কায়াবাদী সাধনায়, গুপ্ত সাধন কড়চায় তাই চৈতন্যদেব, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, গদাধর, শ্রীবাসদের দেহসাধনা, রসসাধনার যেমন বিচিত্র বিবরণ আছে, তেমনই আবার ফকিরি গুপ্তজ্ঞানের কড়চায় নবী মহম্মদ, মা ফতেমা কেউই তো পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক চরিত্র নন, সকলেই জায়গা পেয়েছেন রসের সাধনায়। কায়াবাদী বাউল ও সহজিয়া সাধনা চৈতন্যযুগের সীমানা ছাড়িয়ে শিব, ব্রহ্মা, কৃষ্ণের প্রাধান্যে এবং ভাগবতাদির সাজুয্যে আদতে প্রাচীনত্বের জায়গা জমিটিকেই হাসিল করতে চেয়েছে। বোঝাতে চেয়েছে প্রকাশ্য বা মুখ্য ধর্মের সমান্তরালে এই ধর্ম গুপ্ত, গোপ্য,গুহ্য সাধনার ভাষা হিসেবেই চিহ্নিত।
