নূতন উঠেছে কর্তাভজা শুন কিঞ্চিৎ তার মজা
সকল হতে শ্রবনে হয় মিষ্ট
বাল বৃদ্ধা যুবা রমণী নিষেধ মানে না যায় অমনি
অন্ধকারে পথ হয় না দৃষ্ট।
আর বাংলা সাহিত্যের প্রধান ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ শতক শেষে ১৮৯৫ সালে রানাঘাটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কবি নবীনচন্দ্র সেনের কর্তাভজা মেলায় পৌরহিত্য করবার কথা শুনে রীতিমতো আঁতকে উঠে বলে ফেললেন–
শুনিয়াছি উহা বড় জঘন্য ব্যাপার।
এইসব নিদান, টিপ্পনী, খোঁচা, উদ্বেগ, ব্যভিচারের তর্জনী নির্দেশই বলে দিচ্ছে আঠারোর শেষ থেকে শুরু হওয়া কর্তাভজা ধর্ম সহ আউল, বাউল, সাঁই, দরবেশ, সহজিয়া মত উচ্চবর্ণের সমাজকে বেগ দিচ্ছে। আর নিম্নবর্গীয়রা সংস্কৃত মেশানো মন্ত্র না বানিয়ে একেবারে বাংলায় মন্ত্র পড়ছেন, তত্ত্বকথা বলছেন, মধুস্রারী সঙ্গীত রচনা করছেন এমনই এক ভাষায় যার গ্রহ্যাবয়ণ ভেদ করতে গিয়ে এখনকার গবেষকদেরও মুনিদত্তের পথ ধরতে হয়েছে।
কর্তাভজারা বললেন–
কৃষ্ণচন্দ্র গৌরচন্দ্ৰ আউলচন্দ্র
তিনেই এক একেই তিন।
সাহেবধনীরা বললেন–
সেই ব্রজধামের কর্তা যিনি
রাই ধনী সেই নামটি শুনি
সেই ধনী এই সাহেবধনী।
হাড়িরামী-বলরামীরা বললেন–
হাড়িরাম তত্ত্ব নিগূঢ় অর্থ বেদান্ত ছাড়া।
করে সর্ব ধর্ম পরিত্যাজ্য সেই পেয়েছে ধরা।।
ওই তত্ত্ব জেনে শিব শ্মশানবাসী।
সেই তত্ত্ব জেনে শচীর গোরা নিমাই সন্ন্যাসী।।
বীরভদ্রপন্থীরা বললেন–
বীরচন্দ্ররূপে পুনঃ গৌর অবতার।
যে না দেখেছে গৌর যে দেখুক এবার।
লালনশাহীরা বললেন–
গুরু ছেড়ে গৌর ভজে
তাতে নরকে মজে।
সহজিয়া বৈষ্ণবরা বললেন–
যে রাধাকৃষ্ণের কথা পদে গায়।
সে তো বৃন্দাবনের কৃষ্ণ রাধা নয়।।
লোকধর্মের এইসব বলাবলিই বলে দিচ্ছে যে, আঠারো শতকের বাংলায় যে সব বৈষ্ণবীয় উপসম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছিল সবেরই মূলে রয়ে গেছেন সেই আচণ্ডালে প্রেম বিতরণকারী চৈতন্য মহাপ্রভু। সামগ্রিক লোকধর্ম সম্পর্কেই আদতে কথাটি খাটে।
*****
একদিকে মুসলমান শাসন, অপরদিকে ধর্মান্তকরণ;গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো তাঁর ওপর আবার ব্রাহ্মণ সমাজপতিদের মাতব্বরি; মৃদু আচারে তন্ত্র সাধনা ও বৌদ্ধ সহজাচার্যদের যৌন বিকৃতি; লোকাচারে চণ্ডী-মনসার ভীতি-বিশ্বাসের নিম্নবর্গীয়দের। অবলম্বন; কেননা দূর্গা-লক্ষ্মীর ব্রাহ্মণ্য মন্ত্রাচারে, বৈদিক অৰ্চনায় এদের তো আর ঠাঁই নেই, সেই ঠাঁইহীন মানুষজনদের জন্য চৈতন্যদেব তখন শাস্ত্রাচারের, মন্ত্রাচারের জটিলতাকে দূরে সরিয়ে এনে দিলেন কেবল অহৈতুকী ভক্তির কৃপা। তিনি ত্রাতা, অজ্যদের ভগবান; ব্রাহ্মণ্য শক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ তোলা নেতা; নামজপের সাধারণী করণে বাংলার সাধারণজনকে দিয়েছেন প্রতিরোধের ভাষা। কিন্তু সেই ভাষাই আবার চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের একশো বছরের মধ্যেই ঘুরে গেল বৃন্দাবনের গোস্বামীদের শাস্ত্রীয় কচকচালিতে আর বাংলার বৈষ্ণবদের সেই একই ধাঁচায় ব্রাহ্মণ্য ফেঁকড়ি তথা হিন্দু স্মার্তদের উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণে। নামজপে মাতোয়ারা হওয়ার সহজ ধর্মে রাধাতত্ত্ব, কৃষ্ণতত্ত্বের শোরগোল উঠল; করুণাবতার চৈতন্যদেব চাপা পড়ে গেলেন উচ্চবর্গীয় শাস্ত্রিক সমাজের শাস্ত্রীয় বৈষ্ণবতার চর্চায়। এই চর্চাই বিভেদ আনল পুনর্বার; শূদ্র পতিতদের জায়গাই হল না চৈতন্য মাহাত্মের বৈষ্ণব ধর্মে। বৈষ্ণবতায় ফিরে এল জাতপাত, উচ্চনীচ, অধিকারী-অনধিকারীর বিচার। এই বিচারই বলা চলে সতেরো শতকের গোড়ায় জন্ম দিল নানা বৈষ্ণবীয় দল উপদলের। আঠারো শতকে দক্ষিণ দেশীয় দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ নবদ্বীপে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বদান্যতায় ‘বড় আখড়া’ খুলে এদের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিলেন। অচ্ছুৎ বলে ত্যাজ্য হলেন আউল-বাউল-কর্তাভজা-নেড়া-সাঁই দরবেশ-সহজিয়া-সখী ভাবকী-জাত গোঁসাইরা। এমনকি চৈতন্য পার্ষদ নরহরি ঠাকুর প্রবর্তিত গৌরাঙ্গ নাগরীরা পর্যন্ত তোতারামের কাছে ধিকৃত হলেন। সম্প্রদায়, অচ্ছুৎ মানুষের দল ক্রমশই বাড়তে থাকল। তোতারাম বাবাজি তাই এবার খেদোক্তি করলেন–
পূর্বকালে তেরো ছিল আসম্প্রদায়।
তিন তেরো বাড়ল এবে ধর্ম রাখা দায়।।
উনচল্লিশটি উপসম্প্রদায়েরই জন্ম হল সেই আবারও শ্রীচৈতন্যের উদার জাতি বর্ণহীন ভাবনার বীজসূত্রটি নিয়ে। লোকধর্মের সব সম্প্রদায়েই চৈতন্যদেব হয়ে উঠলেন তাই সর্বস্বীকৃত ত্রাতা। যে কারণে এইসব লোকধর্মের প্রবর্তকদের প্রধান গুরু-মহাজনদের অনেকেই চৈতন্য-অবতারের কিংবদন্তি নিয়েই যেন ফিরে এলেন। চৈতন্যদেব এই মানুষগুলির কাছে শ্রদ্ধেয় এই কারণেই, তাঁদের মুখ্য ধর্মের প্রতি অগ্রাহ্যতা বা বেদপুরাণকে অবমাননা করার পেছনে যে রয়ে গেছে মানুষের মূল্যে গড়া শাস্ত্রাচারের বেড়াজালকে টপকে যাওয়া প্রবণতা। সেই প্রবণতাই বাংলার লোকধর্মে এনে দিল গতি ও সাহস। তাঁর বাড়বৃদ্ধি শেষমেশ অবশ্য এমন দশায় পৌঁছল যে, লোকধর্মের সাধকরা বিশ্বাসই করতে থাকলেন এবার চৈতন্য সাধনার ভেতরও আদতে লুকিয়ে আছে কায়াবাদী গুহ্য প্রকৃতি সাধনা। চৈতন্যদেবের নিষ্পেষিত, অসহায় মানুষদের জাগানোর প্রচেষ্টা এভাবেই যেন জুড়ে গেল কখন ফকির বাউলদের মনের মানুষকে জানবার সাজুয্যে। চৈতন্যদেবের স্থান হল কায়াবাদী চৈতন্যে। ফকির লালন সাঁই তাঁকে জুড়ে নিলেন ‘আলেখ মানুষের সঙ্গে–
