সন্ধ্যাকর কৈবর্ত বিদ্রোহে ধর্মাবহের প্রলাপ বকলেও পরবর্তীতে ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহের নায়করা কিন্তু নিজেদের বাউল বলে পরিচয় দিয়েছে, আবার আসাম দেশের কৃষক বিদ্রোহীরা বৈষ্ণব বলে অভিহিত করেছে নিজেদের। এর থেকে এটাই অনুমেয়, লোকায়ত মানুষদের উঠে দাঁড়ানো, লড়াইটা সব সময়ই আদতে পরিশ্রমজীবীদের জীবনধারা বাহিত ধর্মাবহের ভেতর দিয়েই ঘটেছে। এই যে নিজেদের বাউল, বৈষ্ণব বলে দেগে লড়াইয়ে নামাটা কিন্তু সেই প্রবর্তক বা ধর্মগুরুদের পরশ্রমজীবীদের শাস্ত্রীয় ভাবধারার বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোরই এক পৃথকীকরণের মণ্ডল।
ঢাকার মান্য গবেষক যতীন সরকার প্রাকৃতজনের ‘জীবন দর্শন’ গ্রন্থে এই শ্রেণিকরণটিকে পরিশ্রমজীবী ও পরশ্রমজীবী বলে চিহ্নিত করে দিয়ে দুই সমাজের দর্শনকে ভাববাদ-আশ্রয়ী ও বস্তুবাদেরই প্রাধান্য বলে উল্লেখ করে লোকধর্ম তথা দেবীপ্রসাদ কথিত ‘লোকায়ত দর্শন’ এর মূল যে সাধনায় দেহ তথা দেহেরই রজঃ বা বর্জ্য পদার্থের ব্যবহার তারও ইঙ্গিত রেখেছেন। লোকধর্ম এক অর্থে তাই বস্তুবাদী সম্প্রদায়েরই নামান্তর। শক্তিনাথ ঝাঁ সেই কারণেই বাউলের সমাজ, সংস্কৃতি ও দর্শনের গ্রন্থনাকে বস্তুবাদী বাউল বলেই স্পষ্ট করে রেখেছেন। লোকধর্মের মান্য ইতিহাস বা লোকায়ত দর্শনে এই বস্তুবাদ আদতে যে রজবীর্যের দেহক্ষয় বা কামের তৎপরতাকে টপকানোরই বস্তু সাধনা, সেটা প্রথমেই মাথায় ঢুকিয়ে নিতে হবে। রহস্যাচ্ছাদিত সেই করণের ভেতরই দাঁড়িয়ে আছে বাংলার লোকধর্মের ইতিহাসও প্রেক্ষাপট। চুরাশি সিদ্ধ-র কথন দিয়েই তাই শুরু করতে হবে আমাদের ঘুরে তাকানো। নচেৎ লোকায়ত চর্চায় বাদ পড়ে যাবে মধ্যযুগের ইতিহাস।
*****
আঠারো শতকের নবদ্বীপ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এক্তিয়ারে। দক্ষিণ দেশ থেকে কট্টর দ্রাবিড় বৈষ্ণব ভক্ত তোতারাম এসেছেন নবদ্বীপে ন্যায়শাস্ত্র পড়তে। নবদ্বীপে চৈতন্যের আমলের ন্যায়চর্চার অক্ষত ধারা না থাকলেও তখনও শ্রুত গৌরব অক্ষত; রমরম করে চলছে ন্যায়চর্চার টোল তোলারাম এই টোলে পড়তে পড়তেই বৈষ্ণবতার ছোঁয়া মাখলেন। গায়ে, আর পর পরই সাধন ভজন করতে ছুটলেন কৃষ্ণের দেশ বৃন্দাবনে।
বৃন্দাবনে বসেই তোতারাম বাবাজি খবর পেলেন বাংলার বৈষ্ণবতায় শাস্ত্রিক আচারে ধ্বস নেমেছে, লোকধর্মের নানা শাখায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবতা বিপন্ন। তিনি ছুটে এলেন নবদ্বীপে বৈষ্ণবীয় ভজনে শাস্ত্রিক শুদ্ধাচারের বাণী শোনাতে। পেলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দাক্ষিণ্য। ছয় বিঘা নিষ্কর জমিতে পত্তন করলেন আখড়া। তাঁর আখড়াতেই চর্চিত হতে থাকল নৈষ্টিক বৈষ্ণব ধর্ম। নবদ্বীপ তথা বাংলায় তখন নানা বৈষ্ণব উপসম্প্রদায়ের স্রোত, সহজিয়া মত, কায়াবাদী সাধনার রমরমা। জাতপাত, উচ্চনীচ, অধিকারী-অনধিকারী বিচারের গৌড়ীয় বৈষ্ণবতাই হাড়ি, ডোম, বাগদি, বাউরি, ঘোষ, পাল, দাস, রুইদাস, কাঁসারি, শুড়ি, ধোপা, ঘুগী, কলু, কপালী, মাঝি, মালো, রাজবংশী, পোদ, কাহার, চণ্ডাল, বেলদার, কোরা, বাগদী, বাড়ুই, করণ, গাঁড়ল, ভূঁইয়া, চামার, মাল, বেদে, বুনোদের পৃথক এক ধর্মীয় আচারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যেখানে এলে ধর্মচর্চা, শাস্ত্রচর্চা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার অধিকারী পুরোহিত বা ব্রাহ্মণশ্রেণীর উৎপাত বা শোষণ নেই। বৈষ্ণব উপসম্প্রদায়ের স্রোতে, সহজিয়া মতে, কায়াবাদী সাধনায় পুরোহিত নেই কোনও, গুরু আছেন। তবে তিনি ব্রাহ্মণ মন্ত্র-দীক্ষাদাতা গুরুও নন, তিনি যেমন শূদ্র, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে নারীও বটে।
জনবিন্যাসের এই বিচিত্রতায় বৃহত্তর লোকায়ত সমাজ তখন বাঙালির শাস্ত্রিক বিধির বাইরে। তারা ইহজীবন, দেহ আর দৃশ্য মানুষের ভজনা করে খালি। জাত, লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িক সীমানা, পরলোক, পূর্বজন্ম, পুনর্জন্ম, ব্রত, পুজো, রোজা–এইসব অনুমানে তাঁদের বিশ্বাসীই নেই। তারা বর্তমানপন্থী, ‘যা আছে দেহভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে’–এই তাঁদের সিদ্ধান্ত। প্রকৃতির সকল গুপ্ত শক্তির সঙ্গে শরীরের গুপ্ত শক্তির যোগাযোগ নিয়েই তাঁদের দেহতত্ত্বের সাধনা পুষ্ট। যে সাধনাতে মানুষই হল গিয়ে অন্বিষ্ট। সাধনসঙ্গী-সঙ্গিনী গুরু ইষ্ট, আর দেহ শরীর হল গিয়ে বেদ-কোরান।
বৃহত্তর এই জনগোষ্ঠীর এমন অবৈদিক-বেদবিরোধী বা লিখিত শাস্ত্র অমান্য করার কায়াবাদী-আচরণমূলক ধর্ম দেখে তোতারাম বাবাজি ভীষণ চিন্তিত হয়ে শেষমেশ নিদান হাঁকলেন:
আউল বাউল কর্তাভজা নেতা দরবেশ সাঁই।
সহজিয়া সখী ভাবকী স্মার্ট জাত গোঁসাই।।
অতি বড়ী চূড়াধারী গৌরাঙ্গ নাগরী।
তোতা কহে এই তেরোর সঙ্গ না করি।।
উচ্চবর্ণের সমাজপতি বা ধর্মগুরুর এই নিদানই বলে দিচ্ছে আঠারো শতকে হঠাৎ গজানো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল শাস্ত্র মান্যতার ধর্মকে কতখানি বেগ দিয়েছিল। উনিশের শেষ পাদে ১৮৮২ নাগাদ দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ ঠাকুর পর্যন্ত চিন্তিত তাঁর ওখানে যাতায়াত করা ভক্ত হরিপদর ধর্ম নিয়ে। কেননা হরিপদ ঘোষপাড়ার কর্তাভজা ধর্মের এক ‘মাগীর’পাল্লায় পড়েছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে বৌদ্ধিক আসরেও বেগ দিচ্ছে কর্তাভজা ও বাউল ধর্ম। কেননা ঠাকুর বাউল ধর্ম নিয়েও উদ্বিগ্ন; পায়খানার দরজা’ দিয়ে প্রবেশ করা পথ বলে তিনি একেও টিপ্পনী কাটছেন। দাশরথি রায়ও ফুট কাটছেন–
