বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন অনেকটা একক ধর্মগোষ্ঠী পাকিয়ে দানা বেঁধেছিল বলে, আর প্রবর্তক, গুরু গোঁসাইরা সব শিক্ষিত শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন বলেই একটা গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য শাখা পদাবলী কীর্তনের সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার কারণেই তাঁরা সব বাঙালি কবির মর্যাদা নিয়ে বসে যেতে পেরেছেন সাহিত্য ইতিহাসের পাতায়। বৈষ্ণব মহাজনদের শিক্ষিত বাঙালি তাই মান্যতা দিয়েছে। বাউল-বয়াতি, ফকির-ফ্যাকড়াদের দিকে চোখ তুলে আর তাকাবার সময়ই পায়নি। এখন অবশ্য ঢাকা কোলকাতায় ফোকলোর আধুনিকায়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়াতে বাউল ফকিরদের কপাল খুলেছে। বাউল ফকিরি গান, গায়ক, পদকর্তাদের খুঁজে পেতে গ্রথিত করার অবকাশ মিলছে। শিক্ষিত বাঙালি ঘুরে তাকাচ্ছে এদের দিকে। গান শুনতে আখড়ায় যাচ্ছে, গাঁজা খাচ্ছে। লোকধর্মের সাধুগুরুদের। নিয়ে তাই গড়ে উঠছে এক পপুলার কালচার, যার পুরোভাগে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, তিনি হলেন ফকির লালন সাঁই।
*****
লোকধর্মের মান্য ইতিহাস যে শুরুর কাল থেকেই সমাজের উপরতলার শাসক সম্প্রদায়ের নেকনজরে বড় হয়েছে তার নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে চতুরশীতিতে, বৌদ্ধগন ও দোঁহায়। অভয়দত্তশ্রীর বিবৃতি আর হরপ্রসাদীয় সংগ্রহই বলে দিচ্ছিল যোগী ও ডাকিনীর কাছে সিদ্ধ হওয়া মহাজনেরা দীক্ষালব্ধ নামে প্রচারিত হয়েছেন তাঁদের নিম্নবর্গীয় জনসমাজে বেশিরভাগটাই বৃত্তিগত নজির নিয়েই। জেলে-চাষা-কুমোর-চামার-কামার তাঁতি-জোলা সকলেই জীবিকা উপায়কে শিরোধার্য করেই শ্মশানে, প্রান্তিক এলাকায় সাধনা করেছেন, গুহ্যজ্ঞান লাভ করে সিদ্ধ পদবাচ্য হয়েছেন। দীক্ষায় তাঁদের নামান্তর ঘটলেও দীক্ষালব্ধ নামের ভেতরও তাঁরা তাঁদের পূর্বাশ্রমের জীবন জীবিকাকে ভুলে মারেননি। বরং হীন সামাজিক স্তর থেকে উঠে এসেই তন্তিপা তাঁতি, তেলিপা তেলি, ধোম্বিপা ধোবি, চামরিপা চামার, কংপরিপা কামার, মেদিনীপা চাষি, কুমরিপা কুমোর এটাই বোঝাতে চেয়েছেন তাঁদের পরিবেষ্টিত নীচুতলার পরিশ্রমজীবী মানুষদের, তোমরাও সাধনা করো, বৃত্তিনির্বাহ করো প্রবল আত্মবিশ্বাসে; রাজশক্তির মতো সামাজিক বাঁধা থাকবে, থাকবে শাসক স্বার্থের মতো দাবানো, প্রতিহত করবার মতো সামাজিক বাস্তবিক নিষ্পেষণ, তবু এরই ভেতর রাজ দরবারের মান্য ভাষায় নয়, উচ্চবর্ণের সংস্কৃত ভাষ্যে নয়, কথা বলতে হবে, গান বাঁধতে হবে, সাধন গুহ্য কথা বলতে হবে নিজেদেরই বোধগম্য ভাষায়। এই ভাষাকে উচ্চবর্গীয় সমাজের ভেতর কোনোভাবেই ছড়িয়ে দেওয়া যাবেনা, এ ভাষা হবে নিজেদের গুরু আধারিত, সাধনলব্ধ, দেহজ্ঞান বা অনুভূত সত্যেরই ভাষা। উচ্চবর্ণের সমাজ পরবর্তীতে এই ভাষার মধ্যে নাক গলাতে গিয়েই তাই থই পায়নি। টাকাকার–ভাষ্যকারেরা সেজন্য এর নামকরণ করে দিলেন ‘সন্ধ্যা ভাষা’বলে। ‘পরিশ্রমজীবীদের’ সহজ সরল ধর্মচর্চার চর্যাগান বা সাধন উপলব্ধ সত্যকে নিয়ে তাঁরা। মাতম্বরি মারলেন একেবারে সংস্কৃতে টীকাটিপ্পনী, ভাষ্যটাস্য করে ফেলে। তাঁরা একবারও বুঝলেন না, এই ভাষায় রয়েছে সহজ সাধনার প্রয়োগমূলক এক জীবনচর্যা। সেই জীবনে প্রবেশ না করলে, নিজে সাধনা করে ফলিত আচরণ বুঝতে না পারলে ভাষাতত্ত্বের অধিকার নিয়ে তাঁর টীকা-ভাষ্য করলে সেগুলো হয়ে উঠবে দার্শনিক জ্ঞান, লোকধর্ম যাকে বরাবরই এড়িয়ে চলেছে। শাস্ত্র, পুথির বক্তব্যকে অস্বীকার করে লোকধর্ম যুগল দেহসাধনার লৌকিক রীতিটিকেই নিজেদের বায়েত বয়াতিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে বলেই আচরণবাদী, প্রচ্ছন্ন ও সংগুপ্ত এই সাধনপথের গুরু বলেছেন–
আপন সাধন কথা না কহিও যথাতথা
আপনার আমিরে তুমি হইও সাবধান।
লোকধর্ম চিরকালই আপ্ত সাবধান হওয়ার কথা বলে এসেছে। দেহনির্ভর সাধনা, কাম থেকে প্রেমে উত্তরনের পথ-নির্দেশিকা, শ্বাস নিয়ন্ত্রণের যৌন-যৌগিক ক্রিয়া নিয়ে তাই গড়ে উঠেছে দেহতত্ত্বেরই সাধনমালা। চুরাশি সিদ্ধদের লেখাও সেই পর্যায়ভুক্ত। মুনিদত্তের মতো বিদগ্ধ সংস্কৃত পণ্ডিত তাই গম্ভীর সংস্কৃত এমন এক টীকা ভাষ্য রচনা করে বসলেন এগুলোর অর্থপ্রাপ্তি ঘটাতে, যেখান থেকে বেড়িয়ে এল কেবল মহাযান বৌদ্ধসাধনার জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা। সহজ সাধনার গুরু নির্দেশিত বস্তু ধরার করণকৌশল, যুগল সাধনা, রস সাধনা-সবই এখানে হয়ে উঠল বৌদ্ধদর্শনের মান্য শাখা। ভারতীয় দর্শনের স্বভাব চরিত্রে শেষমেশ তাকে বসাতে গিয়ে মুনিদত্ত একে এনে ফেললেন দেহতত্ত্বের জটিল পরিক্রমায়। লোকধর্ম বরাবরই এই শাস্ত্রীয় জটিলতার বাইরে থাকতে চেয়েছে আর আমাদের বিদগ্ধ পণ্ডিতপ্রবর ব্যক্তিরা সবসময়ই এর ভেতর নাক গলাতে গিয়ে দেহচর্চার করণে এলোপাথাড়ি জ্ঞানগম্ভীর বক্তব্য প্রকাশ করে এই এলাকাটাও দখল নিতে চেয়েছেন। ঠিক যেমনভাবে সন্ধ্যাকর নন্দী শূদ্র জাগরণের ইতিহাসকে চাপা দিতে একে ধর্মবিপ্লবের পর্যায়ে দাঁড় করাতে এক প্রকার বাধ্যই হয়েছিলেন রাজশক্তির দাক্ষিণ্য লাভের আশায়, মুনিদত্তও তো এর ব্যতিক্রম নন।
দিব্যোক, রুদোক, ভীম–এই তিন কৈবর্ত জননায়কের বরেন্দ্রজমিতে রাজা বা গননায়ক হিসাবে প্রতিপত্তির কথা বল্লালচরিত এও রয়েছে। কৈবৰ্তরা যখন বরেন্দ্ৰজমির অধিকার ছাড়তে বাধ্য হল রামপালের তৎপরতায়, তখন তারা হুগলী, হাওড়া, মেদিনীপুরে ছড়িয়ে পড়ল। এই হুগলিতেই ছিল ভুরশুট রাজ্য। চোদ্দ পনেরো শতকে যা কিনা ধীবর রাজার অধীন। যদিও এই ধীবর রাজার ইতিহাসের ঐতিহাসিক কোনো তথ্য নেই, তিনি বেঁচে আছেন কাহিনী-কিংবদন্তিতে স্থানীয় মানুষদের স্থানিক ইতিহাসে। তবে শেষ ধীবর রাজা শনিভাঙ্গের পরাজয় এবং গড় ভবানীপুরবাসী চতুরানন নিয়োগীর ভুরশুট রাজ্য দখল করে নেওয়াটা জাহাঙ্গীর আকবরের রাজত্বকালের আলোকায়নে ঘটা বলেই ইতিহাসে সামান্য জায়গা মিলেছে। লোকধর্ম তথা লোকায়ত মানুষদের স্বীকৃতির পেছনে। এভাবেই জড়িয়ে গিয়েছে সবসময়ই বিদগ্ধদের পদচারনা।
