একদিকে চলছে তাত্ত্বিক বৌদ্ধধর্মচর্চা। পাল রাজাদের চূড়ান্ত পৃষ্ঠপোষকতা। নালন্দা, বিক্রমশীল, ওদন্তপুরী, সোমপুর বিহারে শাস্ত্রজ্ঞ বৌদ্ধাচার্যদের দাপট। এর ঠিক উল্টোপিঠে শ্মশানে, বেশ্যাবাড়িতে, গুঁড়িখানায় মাথা তুলছে, বিদ্ধ হচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে তখন লোকায়ত সহজসাধনা। এরা গুরুর নির্দেশে ইন্দ্রিয় সংযম করছেন মাত্র, পাশ কাটাতে বাসি-পচা খাচ্ছেন, মদ-মাংস-মৈথুনের স্থূলতার ভেতর দিয়েই সাধন সঙ্গিনী নিয়ে বসবাস করছেন নির্জন পরিত্যক্ত স্থানে। সমাজ ছেড়ে, জাত ছেড়ে, বর্ণ ভুলে এরা মজে রয়েছেন কিন্তু বাউল ফকিরদের অনুসারী সেই সহজধর্মে। তাই বাংলার বাউল ফকির লোকসাধনার ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটে এইসব স্বজন, সুজন, মনের মানুষদের জীবনাচরণ ও যুঝে চলার ইতিহাসটিরও একটি সদর্থক জায়গা রয়েছে। পেশা, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে এরা সেই শিক্ষিত বাঙালির বানানো লোকায়ত সমাজেরই প্রতিনিধি। বাংলায় লোকধর্ম উদাত হওয়ার পেছনে এঁদেরও সাযুজ্যের অন্তর্ভুক্তি কায়াবাদী সহজ সাধনার কারণেই।
* *** *
বাংলার সাধারণজনের প্রধান জীবিকা চাষবাস বা কৃষিকাজ। এমনকি প্রাচীন ভারতের লোকায়ত মত অনুসারে এই বৃত্তিটিরই স্বীকৃতি রয়েছে একমাত্র বিদ্যা হিসাবে। বিদগ্ধদের দেওয়া গাল ভরা বার্তা নামে। এই বার্তা শব্দের মূল অর্থটি হচ্ছে কৃষিকাজ। চাষবাস চিরকালই উচ্চকোটির ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বলয়ের বাইরে। মনু মশাই তো তাঁর। সংহিতাতে একবারে স্পষ্ট ভাষায় কৃষিকর্মকে ব্রাহ্মণদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ কিনা সমাজের উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিরা কখনওই উৎপাদন কার্যের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না। তারা পুঁথি লিখবে, শাস্ত্রচর্চা করবে, সমাজ পরিচালনার বিধিনিয়ম বানাবে, ধর্ম সংস্কৃতিটা পুরোপুরি তাদের হাতে থাকবে। আর দেশ রক্ষার দ্বায়িত্ব ক্ষত্রিয়দের। গায়ের জোরে, কর্ম ক্ষমতায় ধূর্ত শিক্ষিত ব্রাহ্মনরা ওদের সঙ্গে পেরে উঠবে না বলেই একটা সামাজিক সম্মানের থাক বরাদ্দ রয়েছে ক্ষত্রিয়দের জন্য, এঁদের চটালে দেশে বসে পরম নিশ্চিন্তে করে-কষ্মে খাওয়া শক্ত। বর্গীর হানা থেকে দেশ বাঁচানো ক্ষত্রিয়দের তাই চট করে উত্তেজিত করতে চায়নি ব্রাহ্মণরা। বৈশ্যদের সঙ্গে অর্থনীতির যোগ। দেহে সেই স্থিতাবস্থাটাও তো জরুরি। তাই এই থাক নিয়েও ব্রাহ্মণরা নীরব। এর বাইরে যে বৃহত্তর জনতা জনার্দন, লোকায়ত সমাজ–চাষি ও কৈবর্ত, হালিক জেলে বা জেলিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও আছে ধোপা, যুগী, গুঁড়ি, কলু, মাঝি, কাহার, চণ্ডাল, বাড়ুই, চামার, নিকিড়ি, জোলা, নলুয়া, মাল, মিস্তিরি–নিম্নবর্গীয় এই হিন্দু ও মুসলমানদের বিস্তৃত লোকায়ত এলাকা। তারাই চর্যাপদের যুগ থেকে অদ্যাবধি জাতিভেদ, শাস্ত্র এবং ধর্মাচারকে অগ্রাহ্য করে মুখবাহিত মুখরক্ষিত গুরুকেন্দ্রিক করণধর্মের দিকে ঝুঁকে আছে। এগারো শতকে এই শ্ৰেনীটিই পাল রাজাদের মুখ পুড়িয়েছে। দিব্যোক যার প্রধান প্রতিনিধি। বরেন্দ্রজমিতে কৈবর্তদের এই অধিকারের পুরুষানুক্রমেই বাড়বৃদ্ধি ঘটেছে।
দিব্যোকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রুদোক, রুদোকের পর তাঁর ছেলে ভীম। দ্বিতীয় মহীপাল যখন দিব্যোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। তখন তাঁর দুই ভাই শুরপাল ও রামপাল কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়ে পালবংশের অধিকৃত এক অংশে রাজত্ব করতে থাকেন। এরপর দিব্যোকের উৎখাতের জন্য সৈন্য সংগ্রহ, শুরপালের মৃত্যু, রামপালের সিংহাসনে বসা, মগধ, ওড়িশা, বরেন্দ্ৰজমি,দণ্ডভুক্তি বা হালের মেদিনীপুর, বগড়ী বা নতুন গড়বেতা, কুজটি বা গালভরা সাঁওতাল পরগনা সহ বিস্তীর্ণ এলাকার সামন্ত রাজাদের এক করে কৈবৰ্তরাজ ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষমেশ তাঁকে বন্দী করে, তাঁর পরিবারবর্গকে নৃশংসভাবে হত্যা করে কৈবর্ত্যদের বরেন্দ্রভূমি থেকেই বলা চলে একেবারে উৎখাত করেন রামপাল।
সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত এর পাতায় সেই জয়গানই গেয়েছেন। কিন্তু লোকায়ত তথা নীচু মানুষদের গন অভ্যুত্থানকে যতটা সম্ভব হেয় প্রতিপন্ন করে বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেটুকু যা বেড়িয়ে পড়েছে তা তাঁর ওই কলম চালানোর অসতর্কতায়। আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই সম্পাদনাকালে দৃষ্টিগোচরে এনেছেন বিষয়টি। শিক্ষিত বাঙালি তাই প্রামান্যের নথিকে আর অস্বীকার করতেই পারেনি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বৌদ্ধগনের দোহায় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মতো বৌদ্ধাচার্যেরও নাম রেখেছেন, নাম আছে মহাসুখতাব্রজ, বৈরোচন, দৃষ্টিগেন নামক বৌদ্ধ আচার্যদেরও। অথচ এরা কেউই কিন্তু সহজ সাধক নন, কায়াবাদী সাধনা করেননি। লোকচক্ষুর অন্তরালে শাস্ত্রীয় ধর্মাচার খুইয়ে তান্ত্রিক যোগ সাধনাই সিদ্ধদের কাহিনীতে সংযুক্ত, এখানেই দেখা মিলছে ডাকিনী মা গুরুর। এই ডাকিনীদের সঙ্গে বাংলার ভৈরবী মা-গুরুদেরও প্রভূত মিল। তারাও শশ্মশানে। থাকছেন, সহজ শক্তির বিদ্যা রপ্ত করে শক্তিশালিনী হচ্ছেন, অথচ তারাও সিদ্ধ ডাকিনী মা গুরুদের মতোই নিষ্পেষিতা, তাচ্ছিল্যপ্রাপ্তা, শিক্ষিত বাঙালির ধর্মচর্চায়। বৈষ্ণব সহজ সাধনাতেও সেই একই প্রবাহমান ধারা। উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ চণ্ডীদাসকে ধোপানিকে সাধন সঙ্গিনী করে কায়াবাদী রস সাধনায় মনোনিবেশ করতে গিয়েই শেষে একঘরে হতে হয়েছিল। পরে চণ্ডীদাস জাতে উঠেছেন। বৈষ্ণব কবি বলে কলকে পেয়েছেন। বয়াতি বাউল, ফ্যাকরা-ফকির সেজে পদ লিখলে তাঁকে আর জাতে উঠতে হতো না।
