শিক্ষিত বাঙালি উচ্চকোটির সংস্কৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে এ পাড়ে কলকাতা ও পাড়ে ঢাকাকেই ধরে বসেছে কৃষ্টি ও সভ্যতার তীর্থজমি। এর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’দিকেরই বৃহত্তর বাংলায় সংস্কৃতি তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে ক্রমশই লোকায়ত আর অনাধুনিক। শহরে বাস করা শিক্ষিত বাঙালি লোকায়তের ব্যুৎপত্তিগত তাৎপর্যকেই আসলে ভুলে মেরেছে। জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া বিস্তীর্ণ যে সংস্কৃতি, সেটাই যে লোকায়ত অভিধার ঐতিহ্য বহন করে, এটা শহরে বাস করে নিত্য নতুন আধুনিক বস্তুবাদী প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে তাঁদের মাথার ভেতর থেকে একেবারেই বেড়িয়ে গেছে। ‘লোকেষু আয়তো লোকায়তঃ–এই পারিভাষিক তাৎপর্য তাঁদের কাছে বৃহত্তর বাংলায় সাধরণ ঘেঁষা ব্যাপার। নয় কোনও শহরকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে তারা নিজেদের মতো করে তাই মূলধারা বানিয়ে তুলেছে। আর বাদবাকি যতটুকু, যা কিছু, সবই এখন লোকায়ত বাংলার সংস্কৃতি। শিক্ষিত বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস চর্চার বহর ক্রমশই ঢাকা-কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ির মতো ছোট হচ্ছে বলেই, তারা তাই শেকড় ভুলে গিয়ে স্বল্প পরিসরের সংস্কৃতিকেই প্রধান বলে দেগে দিয়ে নিজেদের বিদগ্ধ ও পণ্ডিতজন মেনে আধুনিক মননচর্চায় ব্রতী হয়েছে। তাদের সামনে পড়ে রয়েছে অবিদগ্ধ লোকায়ত জনের সংস্কৃতি। এই গরিমার ভেতরই বড় হচ্ছে, বৃহত্তর হচ্ছে শিক্ষিত বাঙালির বোধ ও বিবেক।
লোকধর্ম তথা লোকায়তজনের সংস্কৃতিকে ধরতে হলে তাই সংকীর্ণ বাঙালির নষ্ট জাতিসত্তার দরজার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করলে হবে না কখনওই; আমাদের ঢুকতে হবে বৃহত্র বাংলার সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া লোকায়তের দরজা দিয়েই।
*****
অজয় নদের দক্ষিণ পাড়ে যেদিন পাল রাজার ঢিবি আবিষ্কৃত হল, সেদিনই খ্রিষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগেকার বাঙালির কৃষ্টি ও সভ্যতায় জুড়ে গেল অন্ত্যজ অভ্যুত্থানের সত্য। বাংলাদেশের সেই তাম্র প্রস্তর যুগে বরেন্দ্র কৈবর্ত্যনায়ক দিব্যোক পাল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। রাজা দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে তখনই বরেন্দ্রভূমিতে কৈবর্ত্যাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পাল রাজসভার সভাকবি ছিলেন সন্ধ্যাকর নন্দী। স্বভাবতই তিনি রামচরিত এর পাতায় দিব্যোকদের বিদ্রোহকে হেয় প্রতিপন্ন করবেনই। কবিমশাই তাই দিব্যোককে দস্যু আখ্যা দিলেন। প্রজাবিদ্রোহকে ধর্মবিপ্লব বলে দেগে দিয়ে তিনি ভরস্য আপদম বলে বর্ণনা রাখলেন ‘রামচরিত’ এর পাতায়। বিকৃত হল ইতিহাস। বাঙালি ধরতেই পারল না ঠিক ভাবে, এগারো শতকে কৈবর্ত্যদের গণবিদ্রোহের উত্তাপ। সন্ধ্যাকর দিব্যোকের সামাজিক অবস্থান, বৃত্তি সব বেমালুম চেপে গেলেন। বললেন না তাঁর নামিত এই দস্যু সমাজের প্রতিনিধিরাই এগারো বারো শতকে গোটা বাংলা জমি জুড়ে কেবট্ট নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এঁদের কেউ কেউ শিক্ষিত ছিলেন, সংস্কৃত চর্চা করতেন, কবিতাও লিখতেন। ‘সদুক্তি কর্ণামৃত’ নামক সংকলিত কাব্যগ্রন্থে পপীপ রচিত একখানি পদও বর্তমান। পপীপ জাতে ছিলেন কৈবর্ত শিক্ষিত উচ্চবর্ণের ভাগ করা লোকায়ত বাংলার প্রতিনিধি। জীবিকা বৃত্তির দিক থেকে কৃষক ও জেলে সমাজের প্রতিনিধি।
সন্ধ্যাকরের রাজ সন্তুষ্টির ব্যাপার ছিল। সেজন্যই তিনি পাল রাজবংশের জয়গান গাইতেই ব্যস্ত ছিলেন। রাজবংশের আভ্যন্তরীণ অন্তর্দন্দ্ব; মহীপালের নির্বুদ্ধিতা, রামপালের বিচক্ষণতা–এসব বোঝাতেই তিনি ব্যস্ত। রামচরিত লিখতে বসেছেন তিনি। তাই রামপালের বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তা–পাল রাজাদের সেনাবাহিনীর পক্ষে এই বিদ্রোহ দমন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বুঝে নানান ছোট বড় রাজা ও সামন্ত সৈন্য সংগ্রহ করে সেই বিদ্রোহ দমনের কাহিনী লিখতে গিয়ে সন্ধ্যাকর এটা অবশ্য বুঝিয়ে দিলেন যে, কৈবর্ত্য সংগঠন কী বিপুল জোরদার ছিল।
বিদগ্ধ পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই যখন বইটি সম্পাদনা করে বাজারে আনলেন, তখনই শিক্ষিত বাঙালি তথা ঐতিহাসিক মহলের চোখ খুলে গেল। তাঁরা সন্ধ্যাকরের পাল রাজার গুণপ্রশস্তি সরিয়ে এটা তখন বুঝতে পারলেন যে, এর ভেতর রয়েছে কৈবর্ত বিপ্লবের সংঘবদ্ধতা রামচরিত কেবলমাত্র রাম রাজার জীবনীগ্রন্থ তো নয়, এতে মিশে আছে গণঅভ্যুত্থানের সত্য, শিক্ষিত বাঙালির দাগা সেই লোকায়ত সমাজের উঠে দাঁড়ানো, ঘুরে দাঁড়ানোর শ্বাস প্রশ্বাস।
শাস্ত্রী মশাই তো এমন কাণ্ড আরও ঘটিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে তিনি হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা বের করে শিক্ষিত বাঙালির বিদ্যাচর্চার। মুখে একেবারে ঝামা ঘষে দিলেন। পরবর্তীকালে যখন তিব্বতী গ্রন্থ ‘চতুরশীতি-সিদ্ধ প্রবৃত্তি’তে চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত হল বাঙালির পড়ার দরজায়, তখনই বিদগ্ধ বাঙালি বুঝতে পারল, বাংলা ভাষাচর্চার মান্য প্রকরণে আদতে মিশে আছে লোকায়ত সমাজের ইতিহাস। গ্রাম্য চাষি,জেলে, জোলা, তিলি, মুচি, চণ্ডালরাই লিখেছেন তাঁদের ধর্মাচরণের ইতিহাস। লোকায়ত সমাজের ধর্ম, সাধনা, সংস্কৃতি, সংঘাত, লড়াই নিয়ে এসব কাব্যকথাই শেষমেশ হয়েছে প্রামাণ্য বাংলার প্রতিনিধি। আর এই কাহিনীর সময়কালটাও জড়িয়ে আছে পাল রাজাদের সময়সীমায়।
