পদ্মলোচন বা গোঁসাই পোদোও রাঢ়ের প্রাচীন বাউল। উপেন্দ্রনাথ, সুধীর চক্রবর্তী ওঁর গান সংগ্রহ করেছেন। রাঢ়ের আসরে অনিবার্য পদ্মলোচন। প্রশান্তচন্দ্র রাঢ়ভুক্ত আখড়ার মানুষ বলেই তাঁর গ্রন্থনায় পদ্মলোচনকে রেখেছেন।
বর্ধমানের নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের গান শুনে দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব সমাধিস্থ হতেন একথা ‘কথামৃতে’ আছে। সুধীর চক্রবর্তী, শক্তিনাথ ঝাঁ কেউই এই মহতের গান গ্রথিত করেননি। প্রশান্তচন্দ্র রাঢ়ের আখড়া থেকে নীলকণ্ঠের গান সংগ্রহ করেছেন।
হাউড়ে গোঁসাইও নামি পদকর্তা। তন্ত্র, বেদপন্থা অবলম্বন করে শেষমেশ তিনি সনকানন্দ স্বামী। উপেন্দ্রনাথ তাঁর গান রেখেছেন। শক্তিনাথ, সুধীর চক্রবর্তী, প্রশান্তচন্দ্রও তাঁর গান গ্রথিত করেছেন।
হাওরের বিশিষ্ট মরমিয়া দীন শরৎ। বাংলাদেশে তাঁর গান নানাভাবে গ্রথিত হয়েছে। পার্থ ঠাকুরের ‘দীন শরৎ বলে’ গ্রন্থখানি এবারই একুশে গ্রন্থমেলাতে বের হয়েছে। সুমনকুমার দাশ এবছর বাংলাদেশের চোদ্দ মহতের একশোটি করে গান গ্রথিত করেছেন। দীন শরৎ তাঁর অন্তর্ভুক্ত। নদিয়া ও রাঢ়ে দীন শরতের গান যথেষ্টই চর্চিত। স্বভাবতই প্রশান্তচন্দ্রের সংকলনেও তাঁর জায়গা হয়েছে।
বিশ শতকে রাঢ়বঙ্গে সম্মাননীয় সাধক ও পদকর্তা সনাতন দাস। বাঁকুড়ার সোনামুখির খয়েরবুনি যাননি মরমিয়াবাদের অনুসন্ধিৎসুরা এ হতে পারেনা। পশ্চিমবঙ্গে যথেষ্ট জনপ্রিয় তিনি। ১৯৯৯ সালে পেয়েছিলেন লালন পুরষ্কার। রেডিয়ো, দুরদর্শনে। নিয়মিত অনুষ্ঠান করেছেন। দেশ বিদেশ ঘুরে বেরিয়েছেন। বাদবাকি সময় খয়েরবুনির নিমগ্ন সাধক। ঋত্বিক ঘটকের ছেলে ঋতবান ওঁর ওপর তথ্যচিত্র নির্মান করেছেন। একুশ শতকের প্রচারের আলো মাখা পার্বতী দাস বাউল ওঁরই শিষ্য। ৯২ বছর বয়সে চলে গেছেন তিনি গতবছর। তাঁর এই চলে যাওয়াতে বাউল সাধনার একটি যুগের অবসানই হল বলা চলে। অনন্ত গোঁসাই থেকে সনাতন দাস–রাঢ়ের এই গুরুত্বপূর্ণ পরম্পরা। তমালতলার সুধীর বাবার আখড়ায় বসে প্রশান্তচন্দ্র রায় যার অনেকখানি অবলোকন। করেছেন। তাঁর একটুকরো ভূমিকাতে এবং দশ মহাজনের সংকলিত পদ সহ তিনশো। পদের তিনি গীতি নির্দেশও দিয়েছেন। সেসব এলাকায় বাউলের গুহ্য সাধনার বিষয়টি তিনি শুনে, বুঝে বলবারও চেষ্টা করেছেন দু’এক লাইনে। গুরুবস্তু, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চাঁদের গায়ে চাঁদ এসব গোপন দেহতত্ব তিনি বুঝতে চেষ্টা করেছেন বাউল সাধকদের কাছে। আর এখানে কিছুটা ফাঁক রয়ে গেছে। সেকথা নিজেই প্রশান্তচন্দ্র বলেছেন, ‘যেহেতু আমি তাঁদের সমাজের দীক্ষিত নই সে কারণে কিছু কিছু গোপনীয়তাও তাঁরা রক্ষা করেছেন।’
এই গোপনীয়তা মরমিয়াবাদের বৈশিষ্ট্য। সাধক কখনও শিষ্য বা বায়েদ ছাড়া দেহতত্ত্ব প্রকাশ করবেন না। তবে বায়েদ ও সাজা বাউল হরহর করে বলতে থাকেন। দেহতত্ত্ব। যার অনেকটাই ভুলে ভরা। অনুমান, লোকসাধনা বর্তমানের সাধনা। আমার গুরুকরণের আগে হেথাহোথা ঘুরছি ভেতর বাড়ির মানে জানতে। নবাসনের নির্মলা মা সার বলেছিলেন আমায়, ‘আগে সাধনে আয়, সব বলব তোরে।’ আমার গুরুজি বলেন, ‘সাধন বর্তমান। সাধন করে দেহতত্ত্ব বুঝতে হয়। দেহসাধনার অনুভূতি বাপ আমার, প্রমাণ। এটা অনুমানের ধর্ম নয়।’ আর এই বর্তমানে না এলে কিছু ভুলত্রুটি থাকে। যেমন অনেক বাউল গুরু আর বায়েদ বলেন ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ’ হল পুরুষ প্রকৃতি মিলন। প্রশান্তচন্দ্র ‘গীত নির্দেশ’ অংশে তাই-ই লিখেছেন। তবে লালনশাহী ঘরানা ও কুষ্টিয়া মতাদর্শে চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে অর্থাৎ কিনা গুরু-শিষ্যের মিলন হচ্ছে। গুরু শিষ্যিকে নির্দেশ দিচ্ছেন, টানছেন যেন চুম্বকদণ্ডের মতো। শিষ্য সেই প্রতিধর্মের লৌহকনিকা। লেগে যাচ্ছেন গুরুর গায়ে। অর্থাৎ কিনা গুরুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন শিষ্য বাউল। সাধন এলাকার এই মার্গ নিয়ে তাই আমাদের ভাবনার কিছু নেই–’চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করব কি?’
প্রশান্তচন্দ্র গুরুমার্গকে অনুধাবন করে নিজে পদও লিখেছেন বেশ কিছু। বাউলের দেহতত্ত্ব ও মরমিয়াবাদের ভাব এসব গানের মূল বিষয়। তিনি বাউল স্বভাবী বলেই এসব গানে অনেক সাধন আধারই মিশেছে। আমার আপশোষ, এমন মানুষের সঙ্গে আলাপ হল না। তিনি চলে গেলেন সাঁইজির দেশে।
০২.৪ আপন সাধন কথা না কহিও যথাতথা
লোকধর্ম উদাত হওয়ার পেছনে যতই উদার মানবতাবাদের যোগসূত্রটা খুঁজে বের করা হোক না কেন, আদতে উচ্চবর্ণের ধর্মীয় কর্তৃত্বই নিম্নবর্গের মানুষদের শুধু। বর্ণগত নয়, ধর্মগত এই পৃথকীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ব্রাত্য, অন্ত্যজরা সমাজপতিদের সামাজিক নিষ্পেষণের ভেতর দিয়ে যেতে যেতেই একসময় নিজ জনগোষ্ঠীর কারও মধ্যেই নেতৃত্ব বা মুক্তির স্বপ্ন সত্য হওয়ার অলৌকিক শিখাটি খুঁজে পেয়েই তাঁকে লোকনায়ক বা গুরু বলে মেনে নিয়ে তাঁর দেখানো বিপরীত ধর্ম নির্দেশ ও কায়াবাদী আচার সর্বস্বতাকে আঁকড়ে সামাজিক মোকাবিলার দিকে চলতে গিয়েই একেকটি লোকধর্মের আকস্মিক সন্নিপাত ঘটিয়েছিল।
লোকধর্মে তাই ধর্মীয় উদারতন্ত্র ও সমন্বয়বাদের অভিজ্ঞান যত না রয়েছে, তাঁর থেকে বেশি মিলেছে গ্রামকেন্দ্রিক বাংলার অকুলীন, দরিদ্র, সাধারণ মানুষদের জোটবদ্ধতার মতামত।
