প্রশান্তচন্দ্রের মূলত ওঠাবসা রাঢ়বঙ্গের বাউলের সঙ্গে। সুধীর খ্যাপার আখড়াই তাঁর মহাজনী পদ শোনা ও সংগ্রহের প্রধান জায়গা। এখানেই তাঁর রাঢ়ের বাউলদের সঙ্গে সান্নিধ্য। সে বিবরণ তিনি নিজেই দিয়েছেন তাঁর লেখা ‘বাউলগান ও ভাবসংগীত’ গ্রন্থখানিতে–’কেঁদুলি গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটতে শুরু করে। বোলপুরের ভাবসাগর বিশ্বনাথ দাস, বাঁকুড়া খয়েরবনীর সনাতন দাস, গৌর খ্যাপা, পবন। দাস, জয়দেব কেঁদুলির শান্তিরঞ্জন, বাঁকাশ্যাম দাস, লক্ষ্মণ দাস, তারকেশ্বর দাস, লক্ষ্মণ দাস(পূর্ণদাসের মেজোভাই), রাধারানি দাস(পূর্ণদাসের দিদি)। এঁদের সকলকেই তিনি তাঁর কর্মস্থল চিত্তরঞ্জনে গান শোনানোর জন্য নিয়ে গেছেন। তবে বোলপুরের প্রবীণ বাউল দেবীদাস, জয়দেবের তারক খ্যাপা, খ্যাতিমান শান্তদাস বাউল, রামপুরহাটের কানাই বাউলের অনুল্লেখ এখানে চোখে পড়ারই মতো। যেমন গৌরখ্যাপার সাধন সঙ্গিনী দুর্গা খেপী ও আহমেদপুরের ফুলমালা দাসীর কথা অনুল্লেখ রাখলে রাঢ়ের মরমিয়া সাধনার কথা অসম্পন্ন রয়ে যাবে। আর দু’জন সোনামুখী বাঁকুড়ার হরিপদ গোঁসাই ও নির্মলা মা।
প্রশান্ত রায় লিখেছেন, ‘বাউল তত্ত্ব দর্শন ও গানের কথা’ নিয়ে দুই বাংলার পণ্ডিত গবেষক অনেক গ্রন্থ লিখেছেন অনেক গবেষণাও হচ্ছে কিন্তু বিশেষ করে বাংলাদেশের গবেষকরা লালন ফকিরকে নিয়েই বেশি কাজ করেছেন, অবিভক্ত বাংলার বিশেষ করে রাঢ় বাংলায় যাদুবিন্দু, পদ্মলোচন, নিতাই খ্যাপা, রাধাশ্যাম দাস, মদন নাগ, নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়(কণ্ঠমশাই), পীতম্বর দাস, হাউড়ে গোঁসাই, গোঁসাই প্রেমানন্দ, কোঠরে বাবা, গোঁসাই নরহরি প্রভৃতি অনেক মহাজনের গানের কথা বাংলাদেশের পণ্ডিত গবেষকদের পুস্তকে খুব একটা নজরে পড়ে না।
লালন ফকির সাঁই দুই বাংলাতেই পপুলার কালচার। তাই তাঁকে নিয়ে চর্বিত চর্বন চর্চা বেশি। বসন্তকুমার পালের প্রথম লালন জীবনী ‘মহাত্মা লালন ফকির’ ১৯৫৫ সালে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অর্থানুকুল্যে বেরোনোর পর প্রামাণ্য লালনচর্চা বলতে সুধীর চক্রবর্তীর ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’ ও শক্তিনাথ ঝাঁয়ের ‘ফকির লালন সাঁই দেশ কাল এবং শিল্প’ আর ওপার বাংলায় এ বিষয়ের পুরোধা আবুল আহসান চৌধুরী। তাঁর ‘কুষ্টিয়ার বাউল’ গ্রন্থখানিও মরমিয়া আলোচনায় প্রনিধানযোগ্য। লালনের পাশাপাশি
আবুল আহসান কাঙাল হরিনাথকে নিয়েও এখন কাজ করে চলেছেন। ঢাকা বাংলা। একাডেমীর সহ পরিচালক সাইমন জাকারিয়া লিখেছেন ‘উত্তর লালনচরিত’। তাঁর বাংলাদেশের কিংবদন্তি সাধক শাহ আবদুল করিমের জন্মশতবর্ষ পালন হল সিলেট শহরে। আয়োজকদের ডাকে সাড়া দিয়ে সংকলন স্মরণিকায় করিমের গান নিয়ে সে সময় লিখবার সুযোগ ঘটেছিল। রাঢ়ের আখড়ায় করিম প্রচলিত। প্রশান্তচন্দ্রের সংকলনে তাঁর উপস্থিতি নেই। হাওর ভাটি অঞ্চল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে হাওরের বিস্তার। আর ভাটি পুরুষ করিম, দুর্বিন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ, আরকুম শাহ, পাগলা কানাই, শিতালং শাহ, করিম শাহরা এপারের আখড়াবাড়িতে পরিচিত। রাঢ়ের কিংবদন্তি সনাতন দাস মঞ্চে উঠলেই দুর্বিন শাহ গাইবেন না এ হতে পারেনা। রাঢ়ের সাধুসঙ্গের উদাসীন প্রশান্তচন্দ্র কেন ভাটির সাধকদের গান সংকলনভুক্ত করলেন না এটা আশ্চর্যের। অথচ গ্রন্থটিতে দু’কলম ভূমিকা আছে ভাটিপুরুষ খালেদ চৌধুরী। প্রশান্তচন্দ্র ঠিকই লিখেছেন, রাঢ়ের সাধক বাউলদের পদ ওপারে কম প্রচলিত। এর প্রধান কারণ কিন্তু গ্রন্থনা। এ বঙ্গে একটি লালন সমগ্র নেই পপুলার কালচার হয়েও। কুবিরের গান অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সংগ্রহ করেছেন সুধীর চক্রবর্তী। শক্তিনাথ ঝাঁ সংগ্রহ করেছেন রাঢ়ের অনন্ত, গুরুচাঁদ, রাধাশ্যাম গোস্বামীদের গান। মুর্শিদাবাদের বাউলদের আচরনবাদ ধরা রয়েছে তাঁর ‘বস্তুবাদী বাউল’ গ্রন্থখানিতে। বর্ধমানের যাদুবিন্দু, কোটার অনুরাগী সাঁই, বৈরাগীতলার রাধাপদ গোস্বামী, মুর্শিদাবাদের মনমোহন দাস, শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্য সহ উল্লেখ্য সাধক মহাজনদের পদও তিনি গ্রথিত করেছেন ‘বাউল ফকির পদাবলি’তে। বাংলাদেশের চিত্রটা কিন্তু এমন নয়। সেখানে শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, মছরু পাগলা, দ্বিজদাস, দীন শরৎ, আরকুম শাহ, পাগলা কানাইয়ের মতো উল্লেখ্য মহাজনদের সমগ্র বের হয়েছে। তাই সাধুগুরুর গান। সংগ্রহে ওপার বাংলা অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশে আমার ‘বাউলগানের কথকতা’, ‘দেহসাধনায় যৌনতা’ বইদুটি রমরমিয়ে চলার পর এবছর যখন একুশে গ্রন্থমেলায় ঢাকা থেকে বের হল পশ্চিমবঙ্গের বাউল তখনই যোগসূত্রের বহর আরও বেড়ে গেল। ওখানকার সুমনকুমার দাশ, সৈয়দা আঁখি হক, বঙ্গ রাখাল, পার্থ ঠাকুরের মতো আমার বয়সীরা মরমিয়াবাদ নিয়ে অকল্পনীয় সব কাজ করছেন। তাই বাংলাদেশে বাউলিয়া চর্চা এখন আর কোনও মতেই লালনচর্চাতে থেমে নেই। বরং এপার বাংলাতেই কাজের ঘাটতি রয়েছে।
রাঢ়ের প্রাচীন বাউল অনন্ত গোঁসাই। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর গ্রন্থে ওঁর পদ গ্রথিত করেন। এরপর শক্তিনাথ ঝাঁ। প্রশান্তচন্দ্র রায় অনন্ত গোঁসাই ও রাধাশ্যাম দাস–এই দুই রাঢ়ের বাউলের পদ সংকলিত করেছেন। রাঢ়ের সাধক বাউলদের মধ্যে অনন্ত গোঁসাইয়ের পর রাধেশ্যাম দাসের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। তাঁর গুরু হলেন আহমদপুরের গুরুচাঁদ গোস্বামী। ফুলমালা দাসী আমাকে ওঁর আশ্রমে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাধেশ্যামের ‘অজ্ঞান তিমির হে গুরু নাশ করো জ্ঞান অঞ্জন নয়নে দাও’–এই গানখানি দিয়েই রাঢ়ের বর্তমান বাউলেরা আসর বন্দনা সারেন। নদিয়া, মুর্শিদাবাদেও রাঢ়ের এই দুই মহতের পদ গাওয়া হয়ে থাকে। অনন্ত গোঁসাইয়ের ছেলে হলেন অত্রুর গোঁসাই। নবনী দাসের বাবা। পূর্ণদাস, লক্ষ্মণ ও রাধারানি দাসী এই বংশধারারই বাউল। রাঢ়ের আরেক মহৎ যাদুবিন্দু। তাঁর গুরু নদিয়ার সাহেবধনী সম্প্রদায়ের কুবির গোঁসাই। বর্ধমানের পাঁচখালিতে যাদুবিন্দুর সমাধি আছে। ওর নাতি দেবেন গোঁসাইএর কাছ থেকে সুধীর চক্রবর্তী যাদুবিন্দুর গানের খাতা পেয়েছিলেন। প্রশান্তচন্দ্র যাদুবিন্দুর পদ রেখেছেন গ্রথিত সংকলনে।
