তিনি বলছেন, ‘এমনকি উচ্চারণও স্পষ্ট হতো না সব সময়; গাইতেন কাশযুক্ত ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায়, কিন্তু তাতে কী হবে, ভক্তেরা কয়, আসরে আসরে কত নির্ঘুম রাত যে কাটিয়েছি দুর্বিন নেশায় এই গান শুধু তাঁর স্বকণ্ঠে শোনার জন্যে। এক অন্তর্মগ্ন মিনতি, আহা! কী যে এক বিষাদঘন মাধুর্য, যেন কান্না ঝরে পড়ত গানের ছত্রে ছত্রে। গানের বিশাল বিশাল আসর বসত তখন মাজারে, আখড়ায়, প্রত্যন্ত গ্রামে আবার কোনো কোনো গঞ্জেও। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ হন্যে হয়ে ছুটে আসত গান শোনার জন্য। দুর্বিন শাহ’র কিছু গান একদা সারা বাংলাদেশ মাতিয়েছিল। অবশ্য তখনও বাউলা গানের কদর ছিল বেশ, বাউলরাও উপেক্ষিত ছিল না খুব একটা।
২০১০ সালে দুর্বিন শাহের প্রকাশিত–অপ্রকাশিত–অগ্রন্থিত ৩২ টি গান নিয়ে একটি সংকলন বের হয় সুমন কুমার দাশের সম্পাদনায়। সুমন সিলেটের ছেলে। আমারই বয়সী। গ্রাম ঘুরে ঘুরে লোকগান সংগ্রহ করে সে। ওর ব্যক্তিগত সংগ্রহে নানা ধারা উপধারার গান রয়েছে।
ভূমিকায় সুমন লিখছে, ‘আমি নিজে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চেষ্টা করেছি দুর্বিন শাহের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানগুলো একত্রে গ্রন্থভুক্ত করার। তবে সংকলিত গানগুলোর বাইরে আরও কিছু গান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন সময় গানের মঞ্চে তাৎক্ষণিক ভাবে রচিত অধিকাংশ গান সংরক্ষণের অভাবে শিল্পী নিজেই হারিয়ে ফেলেছেন। শিল্পীর অনুরাগী, ভাবশিষ্য ও ভক্তদের বদৌলতে হয়তো একদিন এসব গানও সংগৃহীত ও সংকলিত হবে। তখন হয়তো বা দুর্বিন শাহের গানের প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে…।
২০১৪ সালে ‘দুর্বিন শাহ সমগ্র’র দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। এই সংস্করণে সুমন লিখছে, ‘দুর্বিন শাহ সমগ্র’ গ্রন্থে পূর্ববর্তী সংস্করণের ৩২৭ টি গানের সঙ্গে আরও ২৮ টি অগ্রন্থিত গান মুদ্রিত হল। অগ্রন্থিত গানের মধ্যে ‘ভুলে পড়ে জগৎ ঘোরে, তার পিছনে আমিও ঘুরি’ ও ‘ফুলের মালা হল কী জ্বালা’ শীর্ষক দুটি গানের কোনো নামপদ পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে দুর্বিন শাহের গানের সংখ্যা ৩৫৫ তে দাঁড়ালো। এর বাইরে আরও কিছু গান হয়তো শিষ্য-অনুরাগীদের সংগ্রহে থাকতে পারে। তবে সে সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য বলেই আমাদের ধারণা। তবে বর্তমান সংস্করণ থেকে বইটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে দুর্বিন শাহ সমগ্র।
এই সংকলনেই সুমন যোগ করেছে দুর্বিন শাহের জীবনপঞ্জী ও গ্রন্থপরিচয়। জুড়েছে আবুল আহসান, আবদুর রহমান ও আহমেদ কায়সারের লেখাগুলি।
সংকলনে গ্রথিত করবার সময় সুমন দুর্বিনের গানগুলো বলা চলে একেবারে সাধন বিন্যাসেই দিয়েছে। হামদ ও নাতে রাসুল, সৃষ্টিতত্ত্ব, আউলিয়া শানে, মুর্শিদ বর্ণনা, পারঘাটা, দেহতত্ত্ব, মারিফত তত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, কামতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, কারবালা স্মরণ, বিচ্ছেদ, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ–এই পনেরোটি সাধন আধারে রেখে সুমন দুর্বিনের পদাবলী সাজিয়েছে। আর ওঁর স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলোকে রেখেছে সে বিবিধ হিসাবে।
বাউলের সাধন পদ্ধতি, আচরণ ও গায়নশৈলী বদলায় আসলে অঞ্চলের জল হাওয়ায়। নদিয়া বৈষ্ণব আচরণে ধন্য বলেই কুষ্টিয়ার সাধনা ও সুরে কীর্তনের প্রভাব।
ভাটির দেশের মরমিয়াদের সুরে ভাটিয়ালির প্রভাব থাকাটা তাই স্বাভাবিক। দুর্বিনের গান তাঁর ব্যাতিক্রম নয়। শরিয়ত মারফতের বিশ্লেষণ, দম-শ্বাসের দেহসাধনা, গুহ্যচর্চার গানের পাশাপাশি দুর্বিনের মুর্শিদ বন্দনার গানগুলির ভেতর যে আচরণবাদ তা বাউল পন্থারই যথার্থ তারিকা। যখন মেলায় খেলায় ঘোরাঘুরি শুরু করি, গুহ্য আচরণবাদে আকৃষ্ট হয়ে মরমিয়াদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করি তখন অনেকেই বলতেন আমায়, ‘আগে গুরু ধরেন গা, গুরু না ধরলি কোনও কিছু শুরুই হবে না নে।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম খয়েরবুনির সনাতন দাসকেই, ‘গুরু কেন?‘
বলেছিলেন, ‘গুরু হলেন নিয়ন্ত্রণ।‘
বললাম, কীসের?
বললেন, শ্বাস প্রশ্বাসের। শরীরে নানা কাম যাতনার চক্র রে খ্যাপা। গুরু এর ঘোর কাটায়।
বিকেল যখন মজেছে। সনাতন একতারা তুলে নিয়ে গাইতে থাকলেন মুর্শেদ বন্দনারই গান। খয়েরবুনিতে সন্ধ্যা নামছে তখন হু হু করে। বাউলেরা এ সময় গুরু ভরসার দৈন্যগান করেন।
সনাতন গাইছেন, ‘মুর্শিদ নাম ভরসা করে অকূলে দিলাম সাঁতার।’
‘দুর্বিন শাহ সমগ্র’র ভেতর এই গানখানি নাড়াচাড়া করতে করতে খয়েরবুনির খ্যাপাকে বড় মনে পড়ছে। ওঁর গলাতেই আমি যে প্রথম শুনেছিলাম দুর্বিন শাহের পদ। কিছুকাল হল খ্যাপাও চলে গেছেন দুর্বিন শাহের দেশে।
০২.৩ দীন প্রশান্ত বলছে ডেকে
মাঝে মাঝেই ভাবি আউল-বাউল, ফ্যাকরা-ফকির, সাঁই-দরবেশ, ভৈরবী বৈষ্ণবী, সহজিয়া-মরমিয়াদের ভাবের রাজ্যে যদি কিছু সাধারণ অনুসন্ধিৎসু, ভূতে পাওয়া মানুষজনদের প্রবেশ না ঘটত তবে বাংলার দেহবাদী কায়া সাধনার নিরক্ষর, অল্প শিক্ষিত সাধক সম্প্রদায়ের সাধন ধারা, দেহতত্ত্ব ও সাধন নির্দেশের মধুস্রাবী সঙ্গীতের কী দশা হতো! সবই তো হারিয়ে যেত গ্রামের গহনে। ভাগ্যিস বাঙালি বিদ্বৎসমাজের কারও কারও গ্রাম ঘোরার বাতিক ছিল। আর ছিল পরিমণ্ডল ঢুড়ে এইসব সাধন সম্প্রদায়ের অনুসন্ধান করবার মতো একটা মন। যে মন উদাসীনের বিচিত্র ভুবনের ডাকে সারা দিয়ে পুথিপড়া লোক সংস্কৃতিচর্চার আড়াল ধসিয়ে সরাসরি বেড়িয়ে পড়তে পারে গ্রামদেশে এইসব উপাসক সম্প্রদায়ের সন্ধানে। বিদ্বৎসমাজ যাকে ‘লোকায়ত ধর্ম’ বা গৌন ধর্মের স্রোত বলে করেই পৃথক করে রেখেছে। তবে এ কাজটি বাঙালি করবার আগে করে গিয়েছিলেন এক বিদেশী। তিনি উইলসন সাহেব। ভারতীয় ধর্ম সম্প্রদায়গুলোকে তিনি ১৮ টি ভাগে ভাগ করে পথ প্রদর্শকের কাজটি করে দিয়ে গিয়েছিলেন ১৮৬২ সালে। এর আট বছর বাদে অক্ষয়কুমার দত্ত ভারতীয় উপাসক সম্প্রদায়কে এমন এক উপমুখ্য সম্প্রদায়ে ভাগ করে দেহবাদী কায়াসাধনার বৃত্তান্ত পেশ করলেন যেখান থেকে বেড়িয়ে আসলে গ্রাম্যভূমির লোকায়ত যাপনের হদিশ। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি উৎসাহ দেখাল জমিদারী এলাকাভুক্ত কুষ্টিয়ার সাধক লালন ফকির সাঁইকে নিয়ে। সাঁইজি অবশ্য ঠাকুরবাড়ির তত্ত্বাবধানে বেরোনো প্রবাসী পত্রিকার হারামণি বিভাগে ঠাই পাওয়ায় আগেই শরীরে থাকার সময়েই হরিনাথ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়দের মতো বাঙালি বিদ্বজনের নজরে পড়েছেন। যেমন উইলসন সাহেবের কত আগে ১৮০২ সালে শ্রীরামপুরের মিশনারী উইলিয়াম কেরির নজরে পড়েছিল নদিয়ার কুষ্টিয়ার মতো আরেক এলাকা ঘোষপাড়া। যেখানকার কর্তাভজা ধর্ম ও ধর্মগুরু দুলাল চাঁদ ও সতী মা তাঁদের একেশ্বরবাদের কায়া সাধনা দিয়ে মিশনারীদের নজর কেড়েছিলেন। ধর্মান্তকরণের স্বার্থবুদ্ধি নিয়ে তাই কেরি, মার্শম্যানরা তখন ঘোষপাড়া যাতায়াত করছিলেন। তবে উইলসন সাহেবের কোনো স্বার্থবুদ্ধি ছিল না। Religious sects of the Hindus’ ছিল আদতে একটি অনুসন্ধিৎসার ফসল। ১৮৭০ সালে বেরোনো অক্ষয়কুমার দত্তের ভারতীয় উপাসক সম্প্রদায়’ও তেমনই এক মৌলিক গবেষণার নজির। এরপরই বলতে হয় ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর কথা। যিনি বীরভূমের বাউলদের আচরণবাদকে দেখেই ১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করলেন বাংলার বাউল’ নিয়ে। বাউলিয়া তত্ত্ব বলা ভালো সেই প্রথম বিদ্বৎসমাজে উঠে এল। অক্ষয়কুমার দত্তের সমপর্যায়ের আরেক মানুষ হলেন দীনেন্দ্রকুমার রায়। তিনিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। আর এরপর বাউল গবেষণা যার হাতে সর্বপ্রথম বৃহৎ আকারে আকরগ্রন্থ হিসাবে উঠে এল তিনি কুষ্টিয়ারই সন্তান উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বাংলার গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ১৫০০ বাউল গান। কুষ্টিয়ার আরেক কৃতী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীও। বর্তমানে অনুসন্ধিৎসু মানুষ হিসাবে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেমন এ বঙ্গে শক্তিনাথ ঝা, সুধীর চক্রবর্তী। ওপার বাংলার আহমদ শরীফও বাউল তত্ত্ববিদ হিসাবে সমধিক পরিচিত। এ প্রসঙ্গে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরও উল্লেখ্য। ঠিক যেমন এখানে ১৯৬৬ সালে বঙ্গীয় লোক সঙ্গীত রত্নাকর সম্পাদনা করে আশুতোষ ভট্টাচার্য এক অনন্য নজির গড়েছেন। এই। সমস্ত নজিরের পেছনেই রয়েহে আসলে উদাসী মন। না হলে ভাববাদী কায়া সাধনার এলাকাতে চলাফেরা করা বেশ শক্ত।
