ফকিরি গ্রাম গোরভাঙা ও তার আশেপাশের গ্রাম জুড়ে তখন রোজার মাস। মারফতি সাধকরা রোজা ও নামাজে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু শরিয়ত পন্থায় নামাজ রোজা তো আবশ্যক। মারফতি গ্রাম গোরভাঙায় এর বালাই না থাকলেও আশপাশের গ্রাম জুড়ে শরিয়তে বিশ্বাসী মানুষদের বাস। তবে এখানকার সিংহভাগ মানুষই বিপন্ন গরীব। সারাদিন মাঠেঘাটে কাজের পর কর্মক্লান্ত হয়ে সংসারে ফেরে। পেটে খিদের আখ্যান। তাই ইচ্ছে থাকলেও তারা সবসময় নামাজ পড়ার অবসর-অবকাশ পায় না। যখন তারা বাড়ি ফেরে গোরভাঙার ফকিরি গ্রাম ধরে, অনেকেই শুনতে পায় খইবর-আরমান-গোলামরা তখন সাধন গান গাইছেন একেবারে তাঁদেরই যেন মনের কথায়–’ফজরের নামাজের কালে/ ছিলাম আমি ঘুমের ঘোরে/ জোহর গেল আইতে যাইতে/ আসর গেল কামের দায়।’
পাথরচাপড়ি হল ফকিরদের মক্কা। চোতমাসে দাতাবাবার উরস উৎসবে দুনিয়ার পীর ফকির এক হন। চারিধারে তখন পিরান-পাজামার গিজগিজ। পূজা, উৎসর্গ, সিন্নি, মানত, মোমবাতি–তারই মাঝে অবাঙালি ফকিরেরা গাইছেন কাওয়ালি, বাঙালি ফকিরেরা বসিয়েছেন মারফতি গানের আসর। গান হচ্ছে। মাইক্রোফোনেই ধ্বনিত হচ্ছে পীর-সুফী-ফকিরি পন্থার রীতি ও তরিকা–ঘুড়িষার নূর মহম্মদ ফকির গাইছেন–’মগরেবের নামাজের কালে/ গেলাম আমি গোয়াইল ঘরে/ হাওর থাকি আইল না গাই/ বাছুর আমার বান্ধা নায়।‘ পঞ্চাশ পেরোনো নূরের বাবা তোরাব আলি শাহ ফকিরি গান করতেন। হাওরের এ গান তোরাব পেয়েছিলেন খোদ পদকর্তার মুখ থেকেই। নূর মহম্মদ দৈন্যের ভঙ্গিমায় গানখানি আমাকে শোনানোর পর বললেন, ‘চোপর রাত জুড়ে গান হলে বাবা সারিন্দা বাজিয়ে গাইতেন এ গান।’ ডুবকির সঙ্গতে নূর এবার ভণিতায় চলে এলেন–’এসেয়ার নামাজের কালে/ বিবি বলেন চাউল ফুরাইছে/ ছাইলা মাইয়ার কান্দন শুইনা/ কান্দে পাগল দুর্বিন শায়।’
নূরের শেষ করাটায় রীতিমত আমার গায়ে কাঁটা দিল। খোদ পদকর্তা তাঁর আব্বাকে এ গান দিয়েছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোরাব আলি কবে নাগাদ দিয়েছিলেন সিলেটের দুর্বিন টিলায়?’
নূর মহম্মদ বললেন, ‘আব্বার মুখে শুনেছিলাম দাতাবাবার উরসে দুর্বিন পাগল এসেছিলেন শেষ বয়সে। সঙ্গে তাঁর ছেলে আলম শরীফও ছিলেন। আমার তখন মেলায় আসার বয়স ছিল না।’
মাজারে তখন ভিড় বাড়ছে। ফকির চামর নেড়ে বলছেন, ‘আঁটকুড়ার পুত্র যদি হয় সত্য ভাবে/ নিধনের ধন হয় পীরের স্বভাবে। পীর বন্দনার এই ফাঁকে পাথরচাপড়িতে বসে আমি ভাবছি মারফতিদের নামাজ, রোজা, কোরান না মানার বাহাস-ঝগড়ায়, কত আসরে শুনেছি এই গান–’নামাজ আমার হইল না আদায়–’, কিন্তু আজ এমন একজন গাইলেন পাগল দুর্বিনের এই গান, যাঁর উত্তরাধিকারে মিশে আছে পদকর্তার পরম্পরা। তিনি নিজেই দিয়েছেন আবার তাঁর সাধন আখড়ারও পরিচয়–’সিলেট জেলার ভিতরে, পোষ্ট অফিস ছাতক বাজারে দুর্বিন টিলার উপরে, দুর্বিন শাহ হয় যার নাম।।’
দুর্বিন শাহ সুফিপন্থা ও মারফতি মতে বিশ্বাসী। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়ারাই গ্রামের তারামনটিলা তাঁর সাধন ক্ষেত্র। দেহতত্ত্বের অসংখ্য গান লিখেছেন তিনি। তত্ত্বগানে তিনি ছিলেন পূর্ববর্তী সাধক মরমীয়া আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, জালাল উদ্দিনের অনুসারী। বিশেষত জালালউদ্দিনের গানের দেহঘরের নিমগ্ন প্রতীকগুলিই যেন দুর্বিন মূর্ত করেন তাঁর অতীন্দ্রিয় দশায়। এর পাশাপাশি বৈষ্ণবীয় পন্থার ভাবতত্ত্ব, রাধা কৃষ্ণলীলা, গোষ্ঠলীলাও আশ্চর্যভাবেই তাঁর গানের বিষয় হয়ে ওঠে। সাধক মহলে তিনি জ্ঞানের সাগর অভিধায় চিহ্নিত। কুষ্টিয়া ও হাওর–মরমিয়া সাধন ধারার দুই মতামত, আচরণ, ভেক, রীতিনীতি সবটাই বেশ আলাদা ধরণের। নদিয়া, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, যশোরে গুরু ধরে বাউল সাধনার রীতি। সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ সহ গোটা হাওরেই সেটা মুর্শিদ এর দীক্ষা আধারিত। এ তো গেল স্থূল স্তরের তারিকা। প্রবর্তস্তরে নদিয়া তথা বাংলাদেশের লালনপন্থী বাউলেরা ভেক-খিলাফৎ নিয়ে থাকেন। তাঁরা সাদা পোশাক পরেন। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই ভেক খিলাফতের কোনো ব্যাপার নেই। শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহরা তাই ভেক খিলাফত না নিয়েই মুর্শিদ, পীর এর কাছে দীক্ষা নিয়ে বাউল সাধনা করে গেছেন।
দুর্বিন শাহের সাধনশৈলী তাঁর গানের ভেতরই ধরা আছে। তিনি পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ ছিলেন। তথাপি তিনি যেন ঘরছাড়া বাউল। আজমীর শরিফের খাদিম সৈয়দ আব্দুস সামাদ গুলজেদি ছিলেন তাঁর মুর্শিদ। ছেলেমেয়ে থাকলেও তিনি যে বাউল ধারার চারচন্দ্রভেদ, দমসাধনা, রজঃসাধনা সম্বন্ধে বিশ্বাসী এবং আচরণবাদী তা তাঁর গানগুলির ভেতরই স্পষ্ট চিহ্নিত। ১৯৫০ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘প্রেমসাগর পল্লীগীতি’এর প্রথম খণ্ড প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় খণ্ডও ওই একই সালে বের হয়। তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ সাল ১৯৬৮ সে বছরই তিনি শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গে বিদেশ যাত্রা করেন। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সাধনতত্ত্বের গান পরিবেশিত হওয়ার পর তিনি প্রবাসীদের কাছ থেকেই জ্ঞানের সাগর উপাধিটি লাভ করেন। পরবর্তীতে গোটা বাংলাদেশই তাঁর নামের আগে বিশেষণ স্বরূপ উপাধিটি জুড়ে দেন। ১৯৬৮ সালেই ‘প্রেমসাগর পল্লীগীতি’র চতুর্থ খণ্ডের প্রকাশ ঘটে। এরপর তিনিও মুক্তিযুদ্ধের শরিক হয়ে ওঠেন। জনগনকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এক্ষেত্রে করিমের মতোই তাঁর প্রধান সহায় গান। তিনি বেশ কিছু দেশাত্মবোধক সঙ্গীতও রচনা করেন। ১৯৭২ সালে এইসব সংগ্রহ নিয়েই বের হয় বই ‘সোনার বাংলা সংগ্রাম গীতিকা’। এইসব গানের মূল বিষয়বস্তু হল মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালেই সিলেটের ইউনাইটেড প্রেস থেকে বের হয় ছটি গানের সংকলন ‘পাক বঙ্গ ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ গীতি’। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক তাঁর বিখ্যাত সিনেমা ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’তে দুর্বিন শাহের জনপ্রিয় সাধন সঙ্গীত নামাজ আমার হইল না আদায় ব্যবহার করেন। এটি গেয়েছিলেন ভাটির বিখ্যাত গায়ক রণেন রায়চৌধুরী। ১৯৭৭ সালে দুর্বিন টিলার নিজ বসত বাড়িতেই এই মরমিয়া সাধক দেহ রাখেন। বাউনের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন–’দুর্বিন শাহ কত গান রচনা করেছিলেন তার সঠিক হিসেব পাওয়া ভার। তবে তাঁর গানের একটা বড়ো অংশ ‘প্রেমসাগর পল্লীগীতি’ নামে মোট ছ’খণ্ডে বেড়িয়েছিল ১৯৫০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে। সপ্তম খণ্ডের পাণ্ডুলিপি অসম্পূর্ণ থাকায় তা প্রকাশিত হয়নি। গবেষক আবদুল রহমান লিখেছেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই বাউল দুর্বিন শাহের গান নানাজনের কণ্ঠে শুনে আসছি। যেমন শুনতাম শাহ আবদুল করিমের গানও। আমাদের গ্রামের গানপিপাসু আলেক ভক্তগন প্রতি মাসে তিন চার দিন ঘরোয়া আসর করতেন। তখন বিভিন্ন পীর ফকির বাউল মহাজনের গান গাইতেন। প্রত্যেক আসরে দুর্বিন শাহের। দুই চারটি গান গাইতেন। যিনি গাইতেন তিনি ব্যতীত আর সবাই মুখ বন্ধ করে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির করতেন। কোনওপ্রকার বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গাইতেন। তখন গানকে বলা হতো কালাম। অনুসন্ধিৎসু টি এম আহমেদ কায়সার লিখেছেন দুর্বিন শাহের গায়কি নিয়ে।
