গোরভাঙার নামকরা ফকির আরমান করিমের একখানি গান গেয়ে বেড়ান প্রায় আসরে–’মুর্শিদের প্রেম বাজারে কে যাবে রে আয়/ যেতে যদি হয় বিলম্বে নয়/ চল যাই সকালবেলায়।‘ তবে বাউল করিমের গুটিকতক দেহতত্ত্ব, সাধনতত্ত্বের গানই কেবল গেয়ে থাকেন পশ্চিমবঙ্গের বাউল ফকিরেরা। বাংলাদেশে করিমের অনেক শিষ্য-বায়েত আছেন। তাঁরাই ধরে রেখেছেন বাউল আবদুল করিমের গান ও সাধনা–’এই যে তোমার দেহভাণ্ড বন্ধ করো সকল রন্ধ্র/ অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্র দেখবে হৃদাকাশে/ অনাহত দ্বাদশ দলে নয়ন যদি মেশে/ করিবে স্বদেশের চিন্তা রবে না আর এ বিদেশে।‘
সুমন কুমার দাশ আমার প্রাণের বন্ধু। বাংলাদেশে যাঁদের সঙ্গে আমার আত্মীক সম্পর্ক এখন, সমন তাঁদেরই অন্যতম। আমরা দু’জন দু’জনকে ‘বন্ধু’ সম্বোধনেই ডাকি। সিলেট থেকে সুমন ডাক দেয়, সেই ডাক নদিয়ায় এসে পৌঁছয়। অথচ কেউ কাউকে এখনও দেখিনি। সুমন কথা বললেই ওর ভাষা থেকে গানের গন্ধ বের হয়। শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে গৃঢ় ও গভীর সখ্য ছিল আমার বন্ধুর। এই একটি বিষয়েই আমি কেবল বন্ধুকে ঈর্ষা করি। আবদুল করিমের জীবনীকার সে। ওর কথা ভেঙেই আমি কিংবদন্তিসম মরমিয়ার অন্তরমহলে প্রবেশ করি আর আশ্চর্য হই। জানতে পারি শুধু গান নয়, বাউল করিম ‘নিমাই সন্ন্যাস পালা’ খুব চমৎকার গাইতেন। তবে সে পালা শোনার সৌভাগ্য সুমনেরও হয়নি। করিম বলেছেন, বাউলগান এত বেশি আসরে গাইতে হয়, নিমাই সন্ন্যাস পালা গাওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া আগের তুলনায় হিন্দু ধর্মীয় পালাগানের আসরও তো ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।
‘শাহ আবদুল করিম: তাঁর স্মৃতি, তাঁর গান’ নামক একটি লেখাতে বন্ধু সুমন লিখেছে সাধক করিমের সহজাত দিকটির কথা। পড়ে সম্মোহিত হয়ে উঠি। এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বাউল করিমের এই মানসিকতাই প্রমাণ রাখে যে, একমাত্র গানই তাঁর বেঁচে থাকার শ্বাস। সাক্ষাৎকারে তিনি অবশ্য বারেবারেই বলেছেন সে কথা, ‘আমি তো কোনও কিছু পাওয়ার আশায় গান গাই না। আমার মনে গান চায় তাই গান গাই। গান গাই বলেই তো তুমি আমার কাছে এসেছ, তাই না?
বাউল করিমের এই জিজ্ঞাসারই উত্তর সুমন দিয়েছে নিজের লেখায়। জীবনের শেষ দিক। অনেকখানি খ্যাতি ও সম্মান নিয়ে শাহ আবদুল করিম তখন দেশের মানুষদের কাছে পরিচিত। বিদেশেও গেছেন প্রবাসী বাঙালিদের মরমিয়া সুর শোনাতে, বেড়িয়ে গিয়েছে তাঁর গানগ্রন্থগুলিও এক এক করে। কালনী নদী তাঁকে বাউল করেছে বলেই একটির গ্রন্থনাম ‘কালনীর ঢেউ’। এছাড়া ‘ভাটির চিঠি’, ‘ধল মেলা’, ‘গণ-সঙ্গীত’ও বেরিয়ে গেছে। প্রথমবার যুক্তরাজ্য সফর করেছে ১৯৬৮ সালে শিষ্য দুর্বিন শাহকে সঙ্গে করে। ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুরের সঙ্গে বাংলা গড়ার স্বপ্নে সাড়াও দিয়েছেন–’দরদি, বাংলার নাও সাজাইয়া/ আমরা যাব বাইয়া। বাইতে বাইতে তরী এসেছে আপামর জনগনের ভেতর। গান, সাধনা, শিষ্য পরিবৃত্ত করিম আবার বাধাও পেয়েছেন। শরিয়ত সমাজের কাছে। মারফতি সমাজের আল্লা-ঈশ্বর না মেনে, বেদ-কোরান অস্বীকার করে সহজ মানুষ ভজা ধর্মে সাড়া দেওয়ার বাসনাতে বহুবারই নেমে এসেছে আক্রমণ। স্বাধীন বাংলাদেশে করিমও রেহাই পাননি। তাঁর স্ত্রী সরলা দেহ রাখলে গ্রামের ইমাম। জানাজা পড়াতে বাধা দিয়েছিলেন বাউল সাধক বলেই। কেননা করিমের বাউল সাধক বলেই। কেননা করিমের বাউল জীবন, সাধনা, গান–সবই নাকি বেশরা ও ইসলাম বিরোধী। লৌকিক ইসলামে বিশ্বাসী বাউল করিম দমে যাননি। নিজের বাড়িতেই স্ত্রীর কবর খুঁড়েছেন, শিষ্য আকবরকেও গুরু-মুর্শিদ করিম নিজেই জানাজা পড়িয়ে দাফন করেছেন। আবার এই বাংলাদেশই দিয়েছে তাঁকে সম্মান; একুশে সম্মানে ভূষিত হয়েছেন শাহ। আবদুল করিম। পেয়েছেন আমজনতার ভালোবাসা আর অসংখ্য পুরষ্কার। পূর্ববর্তী মহৎ লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণদের গানও তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন; রেকর্ড করেছেন। বাদ পড়েননি সৈয়দ শাহনুর, দ্বিজদাস, আরকুম শাহ, শীতালং শাহদের মতো। আলু পরিচিত সাধক ও মহাজনও। গান গেয়েছেন, সাধনা করেছেন, বই বের করতে শেষ সম্বল নয় বিষে জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। তবু সাধক, মহৎ মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছেন, কেবল আত্মভোলা বাউল সাধক হতে চাননি শাহ আবদুল করিম–’মানুষই যদি না থাকে তাহলে দেহসাধনা করবে কে? দেহসাধনা করতে তো কেউ বাধাটাধা দিচ্ছে না, তবে বিপন্ন মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে। গণমানুষের মুক্তি প্রয়োজন। তাই আমি বাউলগানের পাশাপাশি সুযোগ পেলেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরি। এই আঙ্গিকে গানও তো রয়েছে করিমের অসংখ্য। সেই করিমও শেষ জীবনে সংবর্ধনায় টাকা পেয়েছেন সোয়া তিন লাখ। করিম ভেবেছেন, সোয়া তিন হাজার। বলেছেন তখন, ‘এত টাকা! এই সোয়া তিন হাজার টাকা দিয়ে আমি কী করব?‘ আয়োজকরা বলেছেন ‘সোয়া তিন হাজার নয়, লাখ। করিম এই শুনে এক লাফে চেয়ার ছেড়ে ছেলেকে বলেছেন, ‘চল বাড়ি যাই। সর্বনাশ, অত টাকা! এগুলা নিয়া আমরা কিতা করমু? আমার টাকার দরকার নাই, মানুষ যে ভালোবাসা দিছে, সেইটাই বড়ো প্রাপ্তি। চল চল বাড়ি চল।‘
সুমনের লেখা থেকে এ কাহিনী পড়ে আমি কেঁপে উঠি। মনে মনে ভাবি আমার বন্ধু এমন মানুষের সঙ্গ করেছে, সাক্ষাৎকার নিয়েছে, জীবনীগ্রন্থ লিখেছে। আমি সেই গ্রন্থ নিয়ে এই শেষ ফেব্রুয়ারিতেই শাহ আবদুল করিমের সখ্য বোধ করি। সুনামগঞ্জ, সিলেটের, ভাটি-হাওরের জল বাতাস লাগাই গায়ে। একতারা বাজিয়ে গাই–’মানুষ হয়ে তালাশ করলে মানুষ পায়/ নইলে মানুষ মিলে না রে বিফলে জনম যায়।‘
০২.২ দুর্বিন শাহ কয়
ফাজিলনগরে খেজমত ফকিরের ডেরায় সন্ধ্যা মজে যেতেই চেরাগ জ্বালা হয়ে গেছে তখন। হাত-পায়ের গোসল করে একে একে বায়েত সব এসে জুটছেন মুর্শেদের ডেরায়। সকলেই চেরাগ বাতি আগরবাতি জ্বালছেন সায়ং সন্ধ্যায়। খেজমত তখন তোড়জোর করছেন সাধন গানের, গুরু বন্দনার, ভারিক্কি চেহারার এক বায়েদ, মাথায়। তেল চুকচুকে বাবরি, গলায় পাথরের মালা, কজিতে তামা-স্টিল-কেরুয়া নানা জাতের বালা, সাদা ধুতি লুঙ্গি করে পরা, ওপরে ফকফকে ফতুয়া হাঁটু গেঁড়ে বসে খেজমতকে ভক্তি দিয়ে বললেন, ‘আলেখ’। মুর্শেদ বায়েদ এরপর সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘আলেখ’। মুর্শেদ আমার দিকে চেয়ে একবার তৃপ্তির হাসি দিলেন। খেজমতের ইশারায় বেজে উঠল। ডুবকি, খমক, একতারা। যুবক বায়েদ বেঁধে নিচ্ছে দোতারা। একতারায় পিড়িং পিড়িং করছে মাঝবয়সী এক বায়েত। একজন খোলবাদ্যে কটা চাঁটি মেরে নিল। খেজমত ফকির সুর ধরলেন হারমোনিয়ামের রীড চেপে। তারপরই গেয়ে উঠলেন–’নামাজ আমার হইল আদায়–/নামাজ আমি পড়তে পারলাম না/ দারুণ খান্নাসের দায়।’
