বাউল আবদুল করিমের গান আমি প্রথম অবশ্য শুনি ঘোষপাড়া নয়, সাহেব কলোনিতে স্মরণজিৎ খ্যাপার আখড়াবাড়িতে। খ্যাপা দুই মহতের পদ খুব পছন্দ করেন। এক, ভবা পাগলা। দুই, শাহ আবদুল করিম। ভবা পাগলা খ্যাপার মুখে নিজের লেখা গান শুনেই তাঁকে খ্যাপা উপাধিটি দিয়েছিলেন। মনসুরউদ্দিন তাঁর ‘হারামণি’তে পূর্ববঙ্গের সাটুরিয়া থানা এলাকার আমতা বেলেটি গ্রাম ভবার জন্মভূমি বলে উল্লেখ করলেও আদতে তাঁর জন্ম ঢাকার ধামরাই থানা এলাকার আমতা গ্রামে। ১৯৫০ সালে ভবা পাগলা পশ্চিমবঙ্গে এসে বর্ধমানের কালনায় কালী মন্দির ও আশ্রম স্থাপন করে মাতৃসাধনা শুরু করেন। কালনার মন্দির প্রতিষ্ঠার দিবসেই স্মরণজিৎ খ্যাপা গেয়ে ওঠেন–’মানুষ তোমার কোথায় অবস্থান/ আসো যাও নাই স্থিরতা অনুমান আর বর্তমান/ বুঝো না এই বারতা/ মানো না তুমি বিধাতা/ প্রকৃতি যে সেই তো মাতা কথাটি কী মূল্যবান।‘ এই গান শুনেই ভবা নিজের গলার মালা খুলে স্মরণজিৎ বাউলের গলায় পরিয়ে তাঁকে ‘খ্যাপা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
স্মরণজিৎ খ্যাপা সন্ধ্যায় চালপানি নিয়ে দৈন্য গানের আসরই শুরু করতেন আবার বাউল আবদুল করিমের পদ গেয়ে। গাইতেন–’দয়াল মুর্শিদ, তুমি বিনে/ কে আছে আমার? / তোমার নাম ভরসা করে অকুলে দিলাম সাঁতার। তাঁর বায়েদ শ্রীদাম ফকির এর পরই গেয়ে উঠতেন–… পড়িও না রিপুর ফাঁদে ভক্তি রেখো মুর্শিদপদে পড়বে না। কোনো বিপদে/ নিলে মুর্শিদ পদায়। আবদুল করিম মূঢ়মতি/ মুর্শিদ বিনে নাই তাঁর গতি/ কাঙাল জেনে দাসের প্রতি/ যদি মৌলার দয়া হয়।’ করিমের গানের পরই আসরে আসত ভবার গান।
খ্যাপা করিমের আরেকখানি জনপ্রিয় গানও গেয়ে থাকেন অনুষ্ঠানে গেলেই। একতারাতে সুর চড়িয়ে গাইতেন খ্যাপা–’আমি কুলহারা কলঙ্কিনী/ আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী। এ গানের সঙ্গে জমজমাট বাঁশির সঙ্গত রাখেন শ্রীদাম ফকির। এবছর একুশে গ্রন্থমেলাতেই প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট লোক সংস্কৃতি গবেষক সাইমন জাকারিয়ার শাহ আবদুল করিমের জীবনছায়া অবলম্বনে উপন্যাস ‘কুলহারা কলঙ্কিনী।
২০০৯ সালের মে মাসে তাঁর জীবদ্দশাতেই শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র প্রকাশ পায় সিলেট থেকে কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভেন্দু ইমামের সম্পাদনায়। আর শুভেন্দুই ওঁর জন্মশতবর্ষ স্মরণ’ পুস্তিকাটিরও সম্পাদক ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের দু’জন লেখক এই স্মরণ পুস্তিকাতে লিখেছিলেন। আমার সৌভাগ্য আমি সেখানে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম।
ঘোষপাড়ার বাউলানি কৃষ্ণা দাসী গেলে পরেই আমাকে করিমের একখানি গান শোনাতেন–’কী জাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে, দেওয়ানা বানাইছে। কৃষ্ণার তখন জুড়ি ভাঙেনি নবকুমার দাস বাউলের সঙ্গে। দুজনেই এক সঙ্গে গান করে বেড়ান তাঁরা। একসময় এই জুটি ছিল বাউল সমাজে চর্চা ও শ্রোতা মনোরঞ্জনের বিষয়। তারপরই জুড়িহীন কৃষ্ণার একাকী জীবন শুরু হয়। তবু কৃষ্ণা করিমকে ছাড়েননি। আসর মাত করেই গাইতেন–’আমার বুকে আগুন রে বন্ধু/ তোমার বুকে পানি/ দুই দেশে দুই দেশে দুই জনার বাস/ কে নিভাইব আগুনি রে/ আর আমার দরদি নাইরে।‘ এই গান গাইতে গেলে কৃষ্ণার গলায় হাহাকার খেলত, চোখ ছলছল করত। রংদোলে চাঁচরের রাতে তবু কৃষ্ণা দাসী বাউল আবদুল করিম দিয়েই আসর। জমাতেন সতী মায়ের মেলায়—’না জেনে করেছি কর্ম/ দোষ দিব আর কারে/ সর্পের গায়ে হাত দিয়াছি/ বিষে তনু ঝরে রে/ আর আমার দরদি নাই রে।‘
জনপ্রিয় বাউল পূর্ণদাসের দিদি হলেন রাধারানি দাসী। কৃষ্ণার মতো তাঁর গান জনসমাজে পৌঁছায়নি। কেঁদুলির মেলার এককোণে পড়ে থাকতেন প্রবীনা রাধারানি। কেউ একটু গাইতে দিলে নিজেকে উজাড় করে দিতেন। থাকতেন বোলপুরের ওঁড়িপাড়া ভাই চক্রধর বাউলের অথর্ব ছেলেটিকে নিয়ে। পরে অবশ্য তাঁর বাস গোপালনগরে গিয়ে ওঠে। রাধারানি ছিলেন গানের ভাণ্ডারী। দুঃখ এটাই, তাঁর কণ্ঠ ধরে রাখা যায়নি। হারিয়ে গেছে তাই অল্পশ্রুত অনেক মহতের পদ, লেখাজোখা না থাকার কারণেই। রাধারানি দাসীর মুখে শুনেছিলাম বাউল করিমের একখানি পদ–’মন পাগলা তুই লোক সমাজে, লুকি দিয়ে থাক। / মনমানুষ তোর মন মাঝে, আছে রে নির্বাক।‘
চন্দ্রাবতী রায় বর্মণ সিলেটের প্রবীণ লোকসঙ্গীত শিল্পী। জনপ্রিয় এই শিল্পী গত হয়েছেন ২০১৪ সালে। সেখানকার আরেক কিংবদন্তি সুষমা দাশ। সংগ্রাহক মৌসুমী ভৌমিক এই দুইজন প্রবীণ শিল্পীর গান সংগ্রহ করে এনে এখানে প্রকাশ ঘটিয়েছেন। চন্দ্রাবতী রাধারমণের গানের একজন নামী শিল্পী হলেও করিমেরও বেশ কিছু গান। গেয়েছিলেন। সুষমা এখনও ভারী বার্ধক্য নিয়েও করিমের গান পরিবেশন করেন। এক সাক্ষাৎকারে সুমন প্রশ্ন রেখেছিল, ‘করিমের কোনও গান কি জানেন? বা কোন গানগুলো বেশি পছন্দ আপনার?’ চন্দ্রাবতী উত্তর করেছিলেন, ‘জানতাম না কেনে? করিম ভাইয়ের বেশ কতগুলো বেশ কতগুলো গান গাইছি। তাঁর ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’, ‘কোন মেস্তুরী নাও বানাইল কেমন দেখা যায়’–এসব গান বেশি গাই। করিম ভাইয়ের সঙ্গে অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎও হইছে।
আমাদের ছোটবেলাতেও রেডিও, টিভিতে বাজত–’আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/ গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান/ মিলিয়া বাউলা গান ঘাটু গান গাইতাম।‘ এখনও এই গানটি আমাদের এখানকার লোকসংগীত শিল্পীরা গেয়ে থাকেন। করিমের আরেকখানি গানও এখানে বেশ প্রচলিত–’আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া/ গান গাই আমার মনকে বোঝাই/ মন থাকে পাগলপারা।‘
