শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্য একথা বলেছিলেন আমাকে। তবে তিনি তন্ত্রের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, ক্ষুধা, তৃষ্ণা বলেননি অষ্টপাশে। তিনি বলেছিলেন কিন্তু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘৃণা, ভয়, লজ্জা, মান, রাগ, দ্বেষ-এই অষ্টপাশের কথা। আসলে ব্যাপারগুলো সব প্রায় একই। তবে এগুলো বাবাজিদের কাছেই মূলত শুনেছি।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম বাউলকে, তা পাশমুক্তি হবে কী করে?
বললেন, ক্ষুধা জয় হল পেটের ক্ষুধাকে সাধনের অঙ্গভূত করে নেওয়া। তৃষ্ণাও তাই। সিদ্ধ স্তরে ওঠার জন্য আঁকুপাঁকু করা। ছটফটানি। এগুলো সবই ক্ষুধা-তৃষ্ণার ছটফটানি। মল-মূত্র খেয়ে-মেখে, রজও পান করে ঘেন্না জয়। ভয় হল মনকে একতানে বাঁধতে না পাড়ার অস্থিরতা। লজ্জা হল গুরুর সম্মুখেই সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলনের বাঁধো বাঁধা ভাব। মান হল গিয়ে গুরুর কড়া কথার উর্ধ্বে ঢলে যাওয়া। রাগ হল রিপুনাশ। দ্বেষও তাই বাবা। এসব মন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে। অষ্টভাবের কথা বৈষ্ণবরাও বলে থাকেন। তাঁরা বলেন এগুলো হল সাত্ত্বিকভাব। এছাড়া তাঁরা আবার দৈন্য, গ্লানি, চাপল্য, বিষাদ, আবেগ, চিন্তা, হর্য, নিদ্রা, শঙ্কা, ত্রাস, শ্রম ইত্যাদি তেত্রিশটি ব্যাভিচারি ভাবের কথাও বলেন। এগুলো সব আসলে গিয়ে হল সেই ইন্দ্রিয় দমন। অষ্টশক্তি সব চক্রস্থ পন্থারই বিষয় আশয়।
গানে বলা হয়েছে বিষামৃতের বিষ, সদাচার, শঙ্কা–এগুলো কিন্তু সবই অষ্টপন্থার অনুসারী। বাউল বলেছেন–’শান্ত মধুর ভাব সিদ্ধ হলে/ ব্রজ গোপীর, দেহ মিলে, / রাগে বাড়ে তার তিলে তিলে, / অহি-শার্দুলেতে নাহি খায়।
শার্দুল হল কামমত্ততা। প্রেমভাবে কাম-আচ্ছন্ন আবহাওয়া সৃষ্টি করে।
খ্যাপা বলেছিলেন একথা।
কী সেই আচ্ছন্নতা? জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বললেন, শেকল ভাঙার আচ্ছন্নতা। কামের হাত পা মাথা সব কেটে দিলে আমাদের কাম তো বেদনাময় হয়ে যায়। কাম থেকে রক্ত ঝরে।
আমি চমকে উঠলাম খ্যাপার কথায়।
বলেন কী খ্যাপা! কাম থেকে রক্ত ঝরছে। মানুষটা এমন সব ভাষার খড়িমাটি দিয়ে আলপনা আঁকতে পারেন। যেন কবির গায়ের গন্ধ লেগে ওঁর জোব্বাজুব্বির গায়ে।
বললেন, গলগল গলগল সব রক্ত গো। কৃষ্ণরক্ত। রাধার ভাবধারা নিয়ে ছোপছোপ সব দাগ মনের অন্দরে লেগে। হিক্কা তুলতে তুলতে কাম মরে। কাপড় চোপড় পরে সাজগোজ করে কাম বেরিয়ে যায় কৃষ্ণপ্রেমের হাওয়া খেতে।
আমি দেখলাম খ্যাপার মুখের ছায়ায় কৃষ্ণের একতারা শুধু বেজে বেজে যাচ্ছে দিঘরার হাওয়ায়।
একতারা কৃষ্ণ সাজচ্ছে। পরে নিচ্ছে রাধার বেশ। যুগল হয়ে উঠছে বাউলের চিন্তায়, সাধনায়।
০২.১ বাউল আবদুল করিম বলে
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা কালনী নদী আর হাওরের আফাল একটা মানুষকে বাউল বানাতে পারে, এ খবরটা যখন আমি শুনি ঘোষপাড়ার বাউল দীনদয়ালের মুখে, তখনই শাহ আবদুল করিমের পূর্ণাঙ্গ খবর নিতে উঠে পড়ে লাগি। ততদিনে আবদুল করিম বাংলাদেশের মানুষদের কাছে কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়ে টেয়ে একেবারে জীবনেরই প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছেন। অসুস্থ করিমের খবরও পেয়েছিলাম আখড়াবাড়িতে বসেই। ২০০৯ সাল, সেপ্টেম্বর মাসে আশ্বিনের ফোটা কাশের ভেতর দিয়ে এক ঢেউ খেলানো হাওয়া তুলে সাধক করিমের খবর এলো। ঘোষপাড়ার বাউল সমাজ তাঁকে বিদায় দিলেন গানের ভেতর দিয়েই। আখড়াবাড়ির গায়ে বয়ে চলা রূপ হারানো ত্রিবেণীর মূল সোঁতাটা তখন এখানে গঙ্গা নামেই খ্যাত। তার ভেতরও যেন কালনীর ঢেউ/ আফল তুলে আনলেন সাহেব কলোনির প্রবীন বাউল সাধক স্মরনজিৎ খ্যাপা। বেশ মনে আছে আমার, খ্যাপার একতারায় বোল উঠেছে; গলায় হাওরের আফল–’ভবসাগরের নাইয়া/ মিছা গৌরব করো রে/ পরান ধন লইয়া/ একদিন তোমার যাইতে হবে/ এই সমস্ত থইয়া রে/ পরান ধন লইয়া।‘ বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের উজালধল গ্রাম থেকে বাউল আবদুল করিমের দেহ রাখার খবর নদিয়ার ঘোষপাড়াতে পৌঁছলে এভাবেই এখানকার বাউল সমাজ তাঁকে বিদায় জানিয়েছিল। আমার আজও কল্পনা করতে ভালো লাগে। উজালধলের আখড়া বাড়িতে যখন করিমকে স্ত্রী ও সাধন সঙ্গিনী সরলার কবরের পাশে সমাহিত করা হচ্ছিল, তখনই বোধহয় ডুবকিতে চাপড় দিয়ে দীনদয়াল গাইছেন–’অকূল নদীর ঢেউ দেখে ডরাই/ অসময়ে ধরিলাম পাড়ি আকাশেতে বেলা নাই।।… আবদুল করিম দায়ে ঠেকেছে দরদি কে ভবে আছে রে/ দেও সংবাদ মুর্শিদের কাছে মরণকালে চরণ চাই।।’ শাহ আবদুল করিমের মরন সংবাদে আখড়াবাড়িতে এভাবেই গুরু মুর্শিদেরা বাউল সাধকের চরন বন্দনা করেছিলেন মুর্শিদ গুরুর কাছেই। কালনীর স্মৃতি, আফল, হাওরের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা বাউলা করিম এভাবেই প্রথম বাসা বেঁধেছিলেন আমার মনে–’নিশিদিনে শয়নে-স্বপনে/ পরানে পরানে মিশিয়া/ এই আঁধার রাতে নেও যদি সাথে/ তুমি নিজে পথ দেখাইয়া।।‘ বাউল আবদুল করিম এভাবেই বোধহয় পথ দেখিয়েছিলেন আমায়, আরও আশ্চর্য যেটা, সেই সুনামগঞ্জ, হাওরের ছেলেই আমার বন্ধু সুমনকুমার দাশ করিমের সঙ্গে এক অর্থে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটিয়ে দিলেন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেই। সেটা ছিল শাহ আবদুল করিমের জন্মশতবর্ষ স্মরণ অনুষ্ঠান। সিলেট শহরে ঘটা করে পালন হয়েছিল উৎসব। কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন শিল্পী ও সঙ্গীত সংগ্রাহক মৌসুমী ভৌমিক। অসম থেকে অধ্যাপক তপধীর ভট্টাচার্য। যদিও আমার কিন্তু সে উৎসবে যাওয়াই হয়নি। তথাপি আমি ছিলাম যেন সেই একেবারে উৎসবের মাঝখানে বসে–’আমি ফুল, বন্ধু ফুলের। ভ্রমরা/ কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া। / না আসিলে কালো ভ্রমর কে হবে যৌবনের দোসর/ সে বিনে মোর শূন্য বাসর আমি জিয়ন্তে মরা।’ সুমনের বই উদ্বোধন হচ্ছে ‘শাহ আবদুল করিম জীবন ও গান’, সাধু-গুরু-মরমিয়া-শিষ্যরা সব গাইছেন করিমের গান, বক্তব্য রাখছে সুমন। আমি ওঁর পাঠানো ছবি ও ভিডিও পেয়েই চলে যাচ্ছি সিলেট। ভাবছি, অনুষ্ঠান শেষে একবার গিয়ে বসব বাউল করিমের কবরে সুমনের সঙ্গেই হাঁটব ভাটি-সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবেড়িয়া; সাতটি জেলার চল্লিশটি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত ভাটি অঞ্চল, অথচ এ বছরও তো ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে মার্চ… আমার যাওয়া হল না হাওর… দেখা হল না কালনীর আফাল… আবদুল করিমের কবর…কাজের কাজ যেটুকু হল–বাংলাদেশ থেকে একুশে গ্রন্থমেলায় বের হল আমার প্রথম বই ‘পশ্চিমবঙ্গের বাউল’। যার মূলে কিন্তু জড়িয়ে আছে আবার সুমনের বন্ধুত্ব আর বাউল আবদুল করিমেরই এক নিবিড় যোগাযোগ–’বন্ধু দরদিয়া রে/ আমি তোমায় চাই রে বন্ধু/ আর আমার দরদি নাই রে।‘
