হংস ডিম্ব কথাটির অন্তস্থ মানে আমরা কিন্তু আরেকভাবেও করতে পারি। হং’ শ্বাস পরিত্যাগ। যা একপ্রকার মৃত্যু। ‘স’ গ্রহণ। হংসই জীবাত্মা। হংস ইতি জীবাত্মানং। হংসের বিপরীত সোহংস হল সাধকের সাধনা। সোহংসা পরমাত্মা। যুগল মিলনে বাউল বলে থাকেন সেই রকমই এক উপলব্ধি আসে। এই উপলব্ধিকেও হংস ডিম্ব দ্যোতক। হিসাবে অনায়াসে চিহ্নিত করতে পারি।
বাউল গাইছেন–’একটা সর্পের মাথাতে/ হংসের ডিম্ব দিয়েছে তাঁর ভিতরে চোদ্দ ভুবন/ বাজার বসেছে।’
চোদ্দ ভুবন দশেন্দ্রিয় ও চারভুতের সমষ্টি। যা দেহসাধনার দ্বান্দ্বিক সোপান। পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়র ক্রিয়াকরণ ও ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎকে চক্র ক্রিয়ায় জাগিয়ে নেওয়া। ‘চোদ্দ’কে শরীরের স্বমাপ হিসাবেও দেখা যেতে পারে। দেহ আমাদের যার যার হাতের সাড়ে তিন হাত। আগে পোয়া ছিল মাপের একক। এক চার। তাহলে সাড়ে তিন হাত চৌদ্দ পোয়াও কিন্তু। বাউল গানে দেহপ্রসঙ্গ ‘চোদ্দ পোয়া’ও হিসাবে চিহ্নিত করে থাকেন। চোদ্দ ভুবন দেহের সামগ্রিক দীপ্র দীপ্তির ঘোষণা দেহের উজ্জীবতা। জাগরণ। তাঁর জন্যই বাজার বসা–’(আবার)সেই বাজারে বেচাকেনা হচ্ছে কেবল একদরে।’ ‘এক’ এখানে যুগল দেহের একত্র তন্ময়তা। বাউল এভাবে শব্দাবরণে দেহের বহিরঙ্গকে ভাঙন ধরান। দেহের আবরণ খসিয়ে, ক্ষইয়ে, তলিয়ে, শোষক–শোষিতের বিযুক্তকে আলাদা করে দিয়ে এমন এক অসভৃত দেহের আধার তৈরি করেন সেখানে দেহ দেহাতীত ভাবের। ধ্রুপদী সঙ্গীত গাইতে থাকে। বাউলের গান প্রতীকে, উপমায় তাঁরই আবেশনক্ষত্র নিয়ে মিটমিট করে জ্বলে বাউল আসরে।
ষষ্ঠী খ্যাপা একবার বলেছিলেন, ঘর হল গিয়ে গুরুপর্যায়। গুরুই ঘর খুলে দেন গো। গুরু হলেন গিয়ে চাবিকাঠি। তাঁর ইশারাতেই ঘর খোলে, সদর দেখা যায়। ভিতরবাড়ি, চমকায়।
–কীভাবে চমকায় ভিতরবাড়ি?
–কীভাবে আবার! শ্বাসে, দমে। গুরু শ্বাস চেনান। ঘরের চাবি খুলিয়ে রাধাশ্বাস, কৃষ্ণশ্বাস চেনান।
খ্যাপা গাইতে লাগলেন:
আমার ঘরের চাবি পরের হাতে
কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেখব চক্ষেতে।
আপন ঘরে বোঝাই সোনা
পরে করে লেনা দেনা
আমি হলাম কর্মকানা না পাই দেখিতে।
রাজী হলে দারোয়ানী
দ্বার ছাড়িয়ে দেবেন তিনি
তারে বা কই চিনি শুনি বেড়াই কুপথে।
এই মানুষে আছে রে মন
যারে বলে মানুষ-রতন
লালন বলে পেয়ে সে ধন
পারলাম না গো চিনিতে।
থামলেন খ্যাপা।
বললেন, বাউলের সোনা হল তাঁর গান। গানই তাঁর আঘাত। রাধাকৃষ্ণের আঘাত।
জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে গান রাধাকৃষ্ণের আঘাত?
–রাধা কী?
জিজ্ঞেস করলেন খ্যাপা।
বললাম, আপনিই বলুন না রাধা কী?
বললেন, বলব কী তোমায়। আমিই জানিনে কী তা। এই না জানাই রাধা।
–কীভাবে না-জানা রাধা হল শুনি?
–রাধা আয়ত্ব। রপ্ত। রাধা প্রকৃতির ছন্দ। কৃষ্ণরে কথা লিখতে সাহায্যে করে রাধা। ছন্দ দিয়েই তো কথা লিখতে হয়। না কি?
বাউলের জিজ্ঞাসার আমি কোনও উত্তর দিলাম না।
নিমতলার হাওয়াতে বসেই খ্যাপা বাউল গাইতে লাগলেন রাধার ছন্দ দিয়ে কৃষ্ণের কথা। চৈত্রের কচি নিমপাতারা তখন দুলতে থাকল রাধাকৃষ্ণের হাওয়ায় হাওয়ায়। খ্যাপার বাড়ির চারধারে ছড়িয়ে পড়ল গানের হাওয়া।
একতারার বোল তুলে খ্যাপা তখন ভাবে নিমগ্ন। গাইছেন:
কৃষ্ণের অধীন হওয়া মুখের কথা নয়।
কেবল রসিক অনুরাগীর কর্ম,
রাগের গুণে সুলভ হয়।
অনুরাগীর এই লক্ষণ–
ভাবে মগন তনু-মন;
বাতুলের প্রায় দরশন,
বোবা-ন্যাকার ভঙ্গী তায়।
তৃণাদপি সুনীচ জন,
সর্বত্র যার সম জ্ঞান,
কৃষ্ণময় যার নিয়ন,
তার ধ্যানে সদাই কৃষ্ণ রয়।।
ছিন্ন অষ্টপাশ যে জন,
কৃষ্ণ ভজনের যোগ্য সে জন,
সদা পূৰ্ণানন্দ তাঁর
দিন-রজনী সমান যায়।
অপ্রাকৃত গোবিন্দ কয়,
সদাচার-কদাচারে নয়,
কেবল গোপী-প্রেমে ঋণী হয়,
শ্রীভাগবতে ব্যাসদেবে কয়।।
গোপী-প্রেমের বলিহারি,
শঙ্কা, স্বজন পরিহারি,
কৃষ্ণ-সুখ লক্ষ্য করি
নিশিতে নিকুঞ্জে যায়।
কৃষ্ণ-প্রেম সুনির্মল,
যেন শুদ্ধ গঙ্গাজল,
তপ্ত ইক্ষু-চর্বণ-ফল
সেই প্রেমাস্বাদে উপজয়।।
যে জন বিষামৃতের বিষে মরে,
নিজে মরে পরকে মারে,
বহে জীবন মৃতাকারে,
হবে না তার গোপী-ভাব-উদয়।
শান্ত মধুর ভাব সিদ্ধ হলে,
ব্রজ-গোপীর দেহ মিলে,
রাগ বাড়ে তার তিলে তিলে,
অহি-শার্দুলেতে নাহি খায়।।
তীর্থযাত্রা পরিশ্রম,
সকলি মনের ভ্রম,
গোবিন্দ-ভজনের ক্রম
না সাধলে কি সাধন হয়।।
ঘটে ঘটে বিরাজকারী
চৈতন্য কৃষ্ণ নাম ধরি,
তার তত্ত্ব পাবে, নিলে–
মধুর রসের আশ্রয়।।
কৃষ্ণ শরীরস্থ উচ্চদশা। যে দশাতে কেবল রসিক অনুরাগীরাই পৌঁছে যেতে পারে। পদকর্তা বলেছেন–’রাগের গুণে সুলভ হয়।’ বাউল সাধকের প্রকৃতি-পুরুষের অন্তর্নিহিত সত্তা শুক্র ও রজ। রজ হল বীজ। বীর্য শক্তি। বীর্যসত্তাকে বাউল ঈশ্বর নামে অভিহিত করেন। বীর্য তাঁদের কৃষ্ণবস্তু। মূলাধারের সুপ্ত শুক্রকে বাউল সাধক ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠিয়ে নিতে পারেন চক্রস্থ সাধনায়। সঙ্গিনীর দেহে রজ থাকে সহস্রার চক্রে। যখন রজসত্তায় বিকাশ আসে তখন রজ নেমে আসে। সাধক অষ্টম ইন্দুকে স্পর্শ করে, ছুঁয়ে, ব্যবহার করে সঙ্গিনীর কামক্রিয়াকে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র দিয়ে ভোঁতা করে শুক্রকে ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠিয়ে নেন। মূলাধারের বীর্য ওঠে সহস্রারের ব্রহ্মরন্ধ্রে অপরপক্ষে সহস্রারের রজ প্রবৃত্তির নিয়ম নেমে আসে মূলাধারে। দুই শরীরের মিলন হয়। রজ-বীর্য মিলিত হয় না কখনও। বাউল বলেন সহজ মানুষের কথা। তাঁরা মনে করেন, বলেন, সঙ্গিনীর সত্তায় প্রকৃতি নিয়মে রজরূপী ঈশ্বর নেমে এসে ত্রিবেণীর স্রোতধারা বয়ে চলে। সাধক বাউল সেখানে। স্নান সারেন কেবল। রজরসে অবগাহন করেন। শুক্ৰবীজকে স্বাভাবিক রেখে দেন। কিন্তু সৃষ্টি ধারাকে তাঁরা নাশ করে মিথুনানন্দ উপভোগ করেন। তাঁরা বলেন পুরুষ-প্রকৃতির এই মিলনে দেহ বৃন্দাবন হয়ে ওঠে আর মিলন হয় রাধাকৃষ্ণের মিলন। এই মিলন সম্পূর্ণ কার্য সাপেক্ষ। পদকর্তা তাই বলেছেন–’ইহা রাগের গুণে সুলভ হয়। রাগ হল সহজ মানুষে পরিণত হওয়া। যার জন্যই অষ্টপাশ ছিন্ন। ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, শঙ্কা, জিগীষা, জাতি, কূল, মান–এগুলোর ঊর্ধ্বে ওঠা। অষ্টভাব মনেতে নিয়ে আসা। এই ভাবগুলো হল–স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ, স্বরভঙ্গ, বেপথু, বৈবর্ণ, অশ্রু, মূৰ্ছা। আর অণিমা, লঘিমা, ব্যাপ্তি, প্রকাশ্য, মহিমা, ঈশিত্ব, বশিত্ব, কামবসায়িত–এই অষ্টশক্তিকেও জাগিয়ে নেওয়া। বাউল বলেন। আটপাশ আত্মচৈতন্যকে ডুবিয়ে রেখেছে গহিন জলে। তাকে আগে ভাসিয়ে তুলতে হবে। পাশ মুক্তির পর সব স্থূলতা কেটে যাবে।
