সুধাতুল্য জলরাশি সঙ্গিনীর রজ। হংস সাধক নিজেই। হংসী সাধিকার সম্বোধন। এই জলপান আসে বিন্দুধারণে। আর তা ধারণ করেই বাউল সাধক স্বকাম নদী পার হয়ে যান অনায়াসে। এই পারাপারে কৃষ্ণ যেন জল সীমানা ছাড়িয়ে সাধকের বস্তুজল ধারণ করে বসে থাকেন। জল হল রজপাত। প্রতীকী যমুনা ধরতেও পারি আমরা। রাধাকে বেশ আগে সুষুম্না চিহ্নিত করেছিলাম আমরা। রাধাকে শরীরস্থ সাধকের নাড়িতে স্থান দিলে যমুনা অর্থাৎ পিঙ্গলার লীলা থাকবে না তা কি হয়? শরীর যদি এক্ষেত্রে পূর্ব কথিত কৃষ্ণ হয়। বাউলের কৃষ্ণ শরীর ধারণেরই কৃষ্ণ। রক্ষাবস্তুর কৃষ্ণ। সঙ্গিনীর জলকে সিঞ্চন করেই তিনি কৃষ্ণ পান। সঙ্গিনী রাধারূপ। সম্বোধিত বাউলের ‘রাধারানি’। বৈষ্ণব সাধক আবার নিজেকেও রাধারানি ভাবেন। তা যদি ভাবেন তাহলেও কৃষ্ণ শরীরধারণ করে ভক্তিরসে রসস্থ হয়। বাউলের কৃষ্ণ যথার্থই শরীর ধারণের কৃষ্ণ।
ঘোষপাড়ার মেলায় প্রতিবছরই আমতলায় আখড়া করেন নবকুমার দাস বাউল। তাঁর ভক্ত শিষ্য,গুণমুগ্ধর সংখ্যা কম নয়। আখড়া একেবারে গমগম করতে থাকে। বেশ রাতেই এখানে গাইতে ওঠেন নবকুমার। সবাইকে গাইয়ে, তদারকি করে তাঁর গাইতে গাইতে একেবারে শেষ রাত। শেষে প্রভাতী গেয়ে তিনি নেমে পড়েন। এবছর প্রভাতী গাইবার আগে বললেন, দেখেন এখনই কীরকম গৌরের আধাপ্রকাশ্য, আধাগোপন আলো এসে গিয়েছে। এবার বোধহয় প্রভাতী গাইবার সুযোগ দেবেন না গৌর। গৌর যে আমার এমনই।
সমবেত ভক্তমণ্ডলী তখন ধ্বনি দিলেন–জয় গৌর, জয় গৌর।
গান ধরলেন বাউল। নবকুমারের গানে গৌর যেন ছড়িয়ে পড়তে লাগল সতী মায়ের মেলাতে।
এই গৌর লীলার বাজারে
অবাক যাই হেরে।
একটা সূচের ছিদ্র মজার কথা
পার করে গজবরে
একটা সোনা গাছেতে
জোড়া আম ধরে তাতে
আমের ভিতর জামের গাছ ভাই
জাম ধরে তাতে।
আছে তার তলে এক বাঁকা নদী–
হেম নামেতে প্রেম ঝরে
একটা সাপে-নেউলে
আর একটা ইঁদুর-বেড়ালে
এক যোগে বাস করে এরা
থাকে নির্মলে।
তাই দেখে এক মজায় হেসে
নিতাই গৌর রব করে।
একটা সর্পের মাথাতে
হংসের ডিম্ব দিয়েছে
তার ভিতরে চোদ্দ ভুবন
বাজার বসেছে।
(আবার) সেই বাজারের বেচাকেনা
হচ্ছে কেবল একদরে।
গোঁসাই হরি পোদোয় বলে
শোন রে মন কানা
তোর হাতে তুলে দিলাম রতন
যতন করলি না।
সে ধন অযতনে হারায়ে
(জগৎ) পড়েছে কর্ম ফেরে।
গৌর লীলার বাজার’ হল কৃষ্ণের বাজার কোথায় বসেছে সেই বাজার? বাজার বসেছে দেহচক্রে। স্থূলদেহে নয়, আত্মিক সত্ত্বায় এ বাজারে সমাগম ঘটছে সাধকের। যার জন্যই ‘সূচের ছিদ্র মজার কথা/ পার করে গজবরে।‘ ‘গজবর’ হল হাতি। হাতি কামমত্ততার প্রতীক। ছিদ্র অবশ্যই যোনিদ্বার। তার তীক্ষ্ণতার জন্য সূচের বিশেষণ পরানো হয়েছে। যুগল মিলনের সম্ভোগে কাম পেরিয়ে যাচ্ছে ওই ছিদ্রপথ দিয়ে। দেহ কামেন্দ্রিয়ের। প্রতিটি দরজা বন্ধ করে দিয়ে প্রেমেন্দ্রিয়ের সদর খুলে দিয়েছে। প্রকৃতির উপর মগ্ন পুরুষের সৌন্দর্য যেন ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতি এখানে স্থির নিবেশ। যা সাধককে সাধন সঙ্গিনীই কেবল দিতে পারেন। আর সেই উৎসারণে শরীর সোনা গাছ হয়ে উঠেছে। সোনা হল আত্মপ্রতিচ্ছবি কৃষ্ণের। কৃষ্ণ প্রেমময় তাই তিনি জ্যান্ত। গৌরের প্রতিমূর্তি। শরীরস্থ ‘সোনা গাছে’ জোড়া আম ধরে আছে। কৃষ্ণ যুগলরূপের আধারকণা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পদকর্তা পদ্মলোচন(পোদো) বলছেন ‘আমের ভিতর জামের গাছ।’ ‘আম’ সোনা গাছের দ্যোতক। আম রক্ত-গৌরাঙ্গ জীবন্ত গৌর। ‘জাম’ কৃষ্ণের গাত্রবর্ণেরই প্রতীক। শরীর যুগল কৃষ্ণের ক্রমনির্মিতির অধ্যায়কে সংহত, মিতবাক তিমির দিয়ে দিয়েছে। তিমির প্রেমের অসূয়া কাটিয়ে নেবার অন্ধকার। যার জন্যই গাছ তলে ‘বাঁকা নদী’র বয়ে চলা। কৃষ্ণাঙ্গ শরীরের প্রকৃতির অনুষঙ্গ লাভ করা। নদী সঙ্গিনীর প্রতীককল্প। নদীতে ‘হেম নামেতে প্রেম ঝরে।’ ‘হেম’ স্বর্ণ বা স্বর্ণ অঙ্গ বিশিষ্ট গৌরাঙ্গেরই গাত্রবর্ণ। অর্থাৎ প্রকৃতি পুরুষের মিলনে শরীর জীবন্ত গৌরেরই শিরোপা আদায় করে নিয়েছে। এই মিলন এমনই এক ভাবের মিলন যে মিলনে শত্রর সহাবস্থান পরম মিত্রের। ‘সাপ-নেউলে’, ‘হঁদুর-বেড়াল’এর প্রতীককল্পে পদকর্তা তাঁরই ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাপের মাথাতে হাঁসের ডিমও সাধনার শুভ্র আবেগনিঝর কথা। হাঁসের ডিম(হংসের ডিম্ব) এখানে কামের আসক্তি থেকে বেরিয়ে পড়ে। নিরাসক্ত পূর্ণিমায় আত্ম-আবদ্ধ হয়ে থাকা। পূর্ণিমা যুগল প্রেমের অন্তর্লোকে বিহ্বল আদিঅন্তের কৃতাঞ্জলি। বাউলের জ্যোৎস্না, পূর্ণচন্দ্র প্রেম। সাপ তো কামাসক্তি। সেই কামের মাথাতে অর্থাৎ চূড়ান্ত মত্ততায় কামের পরতে যেন বিন্দু বিন্দু প্রবৃত্তির নিবেশ সরে গিয়ে হংসের ডিম্বর মতো ধবধবে জ্যোতি সর্বোচ্চ শান্ত, নির্মল, নিরাধার, নির্বিকার, নির্বিকল্প, দীপ্তিমান আত্মস্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। যোগশাস্ত্রও বলছে–’চিদাত্মা সৰ্ব্বদেহে জ্যোতিরূপেণ ব্যাপকঃ। / তজ্জ্যোতিশ্চক্ষুরগ্ৰেষু গুরুনেত্রেণ দৃশ্যতে।।’ চিদাত্মা জ্যোতিস্বরূপ সকল দেহতেই পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। গুরুনেত্র দ্বারা চোখের অগ্রভাগে তা দৃষ্ট হয়ে থাকে। পদকর্তা সেই গুরুনেত্র দিয়েই এই হংসের ডিম্বকে ‘সর্পের মাথাতে’ দেখেছেন। এই দেখা আত্মদর্শন। ‘আত্মদর্শনমাত্রেণ জীবন্মুক্তো ন সংশয়ঃ। আত্মদর্শন মাত্রে জীবদেহ মুক্ত হয়। পরমাত্মার দ্যুতি বের হয় শরীর থেকে।
