‘কৃষ্ণ অনুরাগের বাগান’ দেহসাধকের স্থূল শরীর। গুরু প্রদর্শিত পথে সেই স্থূলতাই প্রবর্ত হয়ে উঠবে আর তখনই কৃষ্ণ অনুরাগের বাগানকে টের পেতে শুরু করে দেবেন সাধক বাউল। প্রবর্ত ছাড়িয়ে সাধক স্তরে এলেই তিনি বাগানের ‘পাঁচ রকমের ফুলকে’ দেখতেও পাবেন। সাধক দেখবেন শরীরের পাঁচ চক্রপদে পাঁচ ফুল ফুটে গিয়ে শোভা ছড়াচ্ছে। সৌন্দর্য দান করছে। সেই শোভা, সৌন্দর্য সবই কৃষ্ণ অনুরাগের কারণেই। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম–এই পাঁচ ফুলের শোভা সাধক বুঝে যাবেন। তাঁর সৌরভে মুগ্ধও হবেন।
বলা হয়ে থাকে স্কুল সাধনার পরই জ্ঞানযোগ হয়ে থাকে। স্থূলতাকে অতিক্রম করার জন্যই মূর্তি, প্রতীক–লিঙ্গ বা শালগ্রাম, দেবদেবীর ছবি ইত্যাদির সাহায্য নেওয়া হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সশব্দে মন্ত্র উচ্চারণ করার কথাও বলা হয়ে থাকে।
বাউলে এই সব উপাচার নেই। বাউল ভুল শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন যোগে। তন্ত্রসাধকের একই পথ। স্থূল শরীরকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যে যোগ, তাঁর নাম হল গিয়ে হঠযোগ। স্থূল শরীর সূক্ষ্ম শরীরের সঙ্গে যুক্ত। স্থূল শরীরের ভেতরই তো থাকে শরীরের যাবতীয় সূক্ষ্মতা। সূক্ষ্ম স্তরে দেহের কোষগুলো সব তরবারির মতো খুলে যায়। সাধক বলেন সূক্ষ্ম শরীরে রয়েছে বুদ্ধি, ভাব, লোভ, কামনা, বাসনা ইত্যাদি। স্থূল শরীরের স্তর পেরোনোর পর যে সূক্ষ্ম শরীরের কথা বললাম সেখানের কোষগুলো পাঁচটি স্তরে সাজানো। এখানে পাঁচ চক্রের কল্পনাকে আমরা সামনে আনতেই পারি। পাঁচটি কোষ পার হবার পর ষষ্ঠে এসে পৌঁছলে সাধক বলে থাকেন নতুন জন্মান্তরে তিনি এসে পৌঁছেছেন। হঠযোগে এই স্তর পেরিয়ে আসেন সাধক। ষষ্ঠের জন্মান্তরের সঙ্গে ষটচক্রভেদের বোধহয় কোনো সম্বন্ধ আছে। তাই তন্ত্রে হঠযোগের বিধিব্যবস্থা। চক্রভেদ মানে একেকটি কোষকে অতিক্রম। বাউল সাধকও ষড়রিপু বা ষটচক্রকে ছয়েরই ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন। যেমন প্রচলিত এক গানের ভেতরও পাই সেই ছয়েরই ইঙ্গিত–’মন পাখি বিবাগী হয়ে ঘুরে মোর না/ ভবে আসা যাওয়ার কি যন্ত্রণা/ তাও কি জান না। / পাখির আছে দশ ইন্দ্রিয় / রিপু আছে ছয় জনা।’ হঠযোগে শরীরের মধ্যস্থ প্রাণ বায়ুকে টানে অপান বায়ু। প্রাণ বায়ু থাকে গিয়ে হৃদপিণ্ডে। সে অপান বায়ুকে ঠেলে তুলে দেয় হৃদপিণ্ডে। মূলাধার চক্র থেকে এসে অপান বায়ু মিশে যায় প্রাণে যোগশাস্ত্র হঠযোগের পদ্ধতিকে সাত ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। প্রথম ভাগ শোধন। ছটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে এখানে শরীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা হয়। দ্বিতীয় ভাগ দৃঢ়তা। এক্ষেত্রে আসন দ্বারা শক্তি সঞ্চয় করা হয়। তৃতীয় ভাগ হল গিয়ে স্থিরতা। বিভিন্ন মুদ্রা দ্বারা স্থৈর্য অর্জন করা আর কী। চতুর্থ ভাগ ধৈর্য। ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পঞ্চম ভাগ লাঘব। প্রাণায়ামে হাল্কাবোধ। ষষ্ঠ ভাগ ধ্যান। যা মনঃসংযোগেরই অংশবিশেষ। সপ্তম ভাগ হল গিয়ে নির্লিপ্ততা। বহির্বিশ্ব থেকে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। ষটচক্র দ্বারা দেহশুদ্ধির কথাও বলেন সাধক। এই শুদ্ধতা আসে। ধৌতিতে। অন্তর ধৌতি। বায়ুর সাহায্যে হৃদয় পরিষ্কার। দন্ত ধৌতি, দাঁত, জিভ, কান ইত্যাদি পরিষ্কারকরণ। হৃদ ধৌতি। কফ, পিত্ত, মল ইত্যাদির নিষ্কাশন। ধৌতির পর ষটকর্মে আসে বস্তিযোগীপুরুষ উৎকটাসনে বসে গিয়ে নাভি পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রাখেন। এতে সিক্ততা আসে। শুষ্কতা চলে যায় সব প্রাণায়ামে। বিশেষত কপালভাতিতে। তিন রকম কপালভাতি করে থাকেন দেহসাধক। শ্বাস নেওয়া ও শ্বাস ছাড়া, নাকদিয়ে জল নিয়ে মুখ দিয়ে বের করে দেওয়া, মুখ দিয়ে জল টেনে নাক দিয়ে বের করে দেওয়া। এরপর হঠযোগে বসেন সাধক। তন্ত্রসাধক এখানে আরও কিছু আসন সারেন। সেগুলো হল মুণ্ডাসন, চিতাসন আর শবাসন। মুণ্ডের সন্নিবেশ নিয়ে তৈরি আসন মুণ্ডাসন। চিতায় বসে চিতাসন আর শবের উপর বসে শবাসন। হঠযোগের পর মুদ্রার সাহায্য নেন দেহসাধক। এও এক ষটচক্রের দেহশুদ্ধি। অগ্নির দাহিকা, জলের সিক্ততা, বায়ুর প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে পারে মুদ্রাভঙ্গি। অশ্বিনী মুদ্রা, যোনি মুদ্রা, খেচরী মুদ্রা, মহাবোধ মুদ্রাতে ধ্যান করে তিনি কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগান। তারপর রেচক, পুরক, কুম্ভক প্রাণায়াম। বাউল সাধক এগুলো রপ্ত করেন। হঠযোগও করেন। তবে মুদ্রার ব্যবহার তাঁর ক্রিয়াকরণের অঙ্গিভূত নয়। ষটচক্রে এরপর লয় যোগ। আসন, কুম্ভক, মুদ্রা–এসবই কুণ্ডলিনীকে জাগরনের জন্য করে থাকেন দেহসাধক। বাউল সাধক শ্বাসক্রিয়াতে তাকে জাগান। কুণ্ডলিনী জেগে গেলে ইড়া ও পিঙ্গলার প্রভাবে শক্তি সুষুম্নাতে প্রবেশ করে ব্রহ্মরন্ধ্রে চলে যায়। বাউল। সাধক এই শক্তির সাহায্যেই শুক্রকে উধ্বগতিতে মূলাধার থেকে আজ্ঞাচক্রের উপরে অবস্থিত ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।
গানে কৃষ্ণ অনুরাগের বাগানে দুজন মালির কথা বলা হয়েছে। এই দুইকে দুইভাবে দেখতে পারি আমরা। এক,ভক্তিকে বেড়া দিয়ে শাখা-উপশাখা সব ঘেঁটে জল সার ইত্যাদি দেওয়া। এ কাজে আগের দিনে উড়িয়াদের কদর ছিল। তাই এক মালিকে পদকর্তা উড়ে করে নিয়েছেন। দুই, দুইজন বলতে আমরা দু’প্রকার ধ্যানের কথাও বলতে পারি। সগুণ ধ্যান আর নিগুণ ধ্যান। সগুণ ধ্যান মূর্তি কল্পনা করে ধ্যান। বাউল তা করেন। না তা কিন্তু নয়। কেননা অনেক বাউলই বৈষ্ণব ভাবাপন্ন বাউল। শশাঙ্ক দাস বৈরাগ্য বাউলের কথা কিছু আগেও বলেছিলাম। তিনি বৈষ্ণব ভাবাপন্ন বাউল ছিলেন। তিনি এই দু’প্রকার ধ্যানের কথা বলেছিলেন। নিষ্ঠুণ ধ্যান হল যে ধ্যানে মনকে ধাবিত করা হয় মহাশূন্যতার দিকে। আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির জন্য। সুতরাং ভক্তির বেড়া দিয়ে মালির যত্নে গাছ বাড়তে পারে আবার ধ্যানযোগেও তা সম্ভব। কেননা দুটো তো একেবারেই সংযুক্ত রূপ।
