মত্স্য হল আমাদের প্রথম অবতার। মৎস’র সঙ্গে জল সংযুক্ত। মানুষের জ্ঞান সমুদ্রকেই মৎস্য অবতার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল তখন। দ্বিতীয় অবতার কুর্ম উভচর প্রাণী। মানুষের মানসিক অবস্থাও অনেকটাই কুর্মের মতো। কুর্ম জলে ও ডাঙ্গায় দু’জায়গাতেই থাকতে পারে। সমুদ্রকে জ্ঞান স্বরূপ হিসাবে আমরা ভেবেছি। ডাঙাকে ব্যক্তিস্বরূপ হিসাবে ভাবি যদি তাহলে দাঁড়ায় মানুষ জ্ঞানসমুদ্র ও ব্যক্তিস্বরূপ থেকে অর্জিত চেতনার মধ্যে বিচরণ করতে পারে। তৃতীয় অবতার বরাহ। জলে থাকে না সে। ডাঙ্গা তার বাসযোগ্য জমি–তবে বরাহ প্রয়োজনে সাঁতারও দিতে পারে। মানুষ। ব্যক্তিস্বরূপকে জেনে চিনে বুঝে সেখানেই কেবল আবদ্ধ হয়ে থাকে না নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চায়। তাই তাঁর জ্ঞানসমুদ্রও উথলে ওঠে। এর পরের অবতার নৃসিংহ। অর্থাৎ সিংহের মাথা, শরীরটা মানুষের। মানুষের ভেতর যে পশুচেতনাও মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে এই অবতার তাকেই চিনতে সাহায্য করে প্রতীকী আলোকসম্পাতে। পঞ্চম অবতার বামন। ক্ষুদ্রতা, নীচতার প্রকাশকে যা চিহ্নিত করে। পরশুরাম পূর্ণ মানবসত্তার বিকাশপথটির। সূচনা। তাই রামের আগে পশুর বন্যতা লাগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সপ্তম অবতার রাম। পশুত্বের মুক্ত চেতনা থেকে উদ্ভূত তাঁর রূপ। অষ্টম অবতার বলরাম। অর্থ হল হলধর। যা দাঁড়ায়, মানুষের সেই জ্ঞান সমুদ্রকেই আরও কর্ষণ। নবম অবতার বুদ্ধ। সংসারের মায়াপাশ ফেলে রেখে সাধনার নির্জন খুঁজে বোধি লাভ করার প্রতীককল্প। দশম অবতার কল্কি অর্থাৎ নিষ্কলঙ্ক হয়ে ওঠা। দশ অবতার এভাবেই আমাদের চেতনার পটভূমিকে তৈরি করে দেয়। যে চেতনার জোরেই বাউল সাধক অকৈতব গাছের লতায় পাতায় দুলতে পারেন। পুরুষ ও প্রকৃতির কম্পনকেও ঠিক রাখতে পারেন বিশ্বনৃত্যের একাত্মতায়।
বাউল সাধক পরমাত্মার স্বরূপ আস্বাদন করেন দু’জনের একত্র সাধনায়। বাউল বলেন নিজেকে নিজে আস্বাদন করা যায় না। সঙ্গিনীর ভেতর দিয়েই নিজেকে চেনা যায়। স্বরূপ বেড়িয়ে পড়ে তখন।
শশাঙ্কশেখরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম একবার, সঙ্গিনীর ভেতর দিয়ে কীভাবে নিজেকে চিনতে পারেন বাউল?
বললেন, শিক্ষা-দীক্ষাই তো বাউলকে সঙ্গিনীর ভেতর নিজেকে চিনতে সাহায্য করে।
–কীভাবে হয় শিক্ষা-দীক্ষা?
–সে অনেক কথা বাবা। ব্রহ্মচর্যের শুরু হয় শিক্ষা-দীক্ষায়। তখনই তিন রস শরীর থেকে ধরে শরীরে ঢুকিয়ে নিতে হয়। মূত্র যতবার হবে নারকেল মালাতে ধরে খেতে হবে।
–খেতে পারেন কি সবাই?
— না পারলে চলবে? ঘেন্নাকে মন থেকে না তুলতে পারলে কিছুই হবে না। পাশ, রিপু সব মূত্র গেলার মতোই খেতে হবে। খেতে খেতে মূত্রকে এক সময় মনে হবে অমৃতধারা। মল হবে মাখন। সঙ্গিনীর রজ হবে সদ্য দোয়ানো ঘন গরম দুধ।
–তারপর?
জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
বাউল বললেন, তারপর ব্রহ্মচর্য ভাঙা যুগল সাধনায়। ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে আবার গড়েপিঠে নেওয়া। এ এত সহজ নয় বাবা। আসন আসন সিদ্ধাসন। শ্বাস ভেঙে শ্বাস নিয়ে শ্বাস ছেড়ে দু’জনকে দু’জনের মধ্যে গড়তে হয়। ভাঙতে গড়তেই রাধাকৃষ্ণের স্বরূপ বেড়িয়ে পড়ে।
সন্ধ্যা ঢলে এসেছে তখন। মজলিশপুরের আশ্রমে ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। যুগলের ঘন্টা ছড়িয়ে যাচ্ছে হাওয়ায় হাওয়ায়। অল্পলোয় ভেসে উঠছে রাধাকৃষ্ণের মুখ। শশাঙ্কশেখর তাঁকেই যেন উসকে তুলেছিলেন সেদিন। বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মানুষ তিনি। বাউলের ভাব পরে তিনিও একদিন মেতেছিলেন যুগল সাধনায়। আজ তাঁর ছেলে আছে আর আছে ছড়ানো ভক্তশিষ্য। দ্বিধারা স্রোত নিয়ে তিনি যেন একাই এই বৃদ্ধ বয়সে যুগল হয়ে বসে আছেন। সেদিন তাঁকে দেখে যেন তেমনই আমার মনে হচ্ছিল।
*****
যুগলকিশোরের মেলায় গোপাল দাস বাউলের মুখে শুনেছিলাম যে গান, তা শোনানোর আগে তিনি বলেছিলেন, কৃষ্ণের দরজায় এসেছেন আর নাড়া খাবেন না তা কী হয়!
–কীভাবে নাড়া খাব বলুন তো?
বাউল বললেন, কীভাবে আবার? সুরে নড়িয়ে দেব আমি। সুরে কৃষ্ণ শরীর ধারণ করবেন যে!তার বাঁশি যে সদর্থক বাঁশি। বাজলেই শরীর ধারণ বাঁশি আর কী বলুন, বাঁশি তো হল গিয়ে আমাদের মগ্ন চৈতন্য।
একতারা বাজাতে আরম্ভ করলেন বাউল। ভরদুপুরে তাঁর ভাত পেটে পড়েনি তখনও।
বললেন, কৃষ্ণকে খাইয়ে তবেই খেতে যাব আজ। যখন তুললেন ও কথা। আপনার সেবা হয়েছে তো?
ঘাড় নাড়লাম আমি। বাউল গাইতে লাগলেন।
কৃষ্ণ অনুরাগের বাগানে, আমার মন যাবি রে ভ্রমণে
প্রাণ জুড়াবে মন্দ মন্দ আনন্দ সমীরণে।
সেথা নিত্য ফুটে পাঁচ রকমের ফুল
যার সৌরভে প্রাণ মুগ্ধ করে গৌরবে অতুল,
আত্মারামের আত্মা ব্যাকুল, করেছে যার আঘ্রাণে।।
সেই বাগানে আছে দুই মালি
তাঁদের মধ্যে একজন উড়ে একজন বাঙালি
তাঁরা বাগান ছিঁড়েখুঁড়ে নাড়েচারে গাছ বাড়ে তাঁদের যতনে।।
আছে সেই বাগানের চার দিকে বেড়া
আছে আশমানে খাড়া ও তার মেলে না গোড়া।
সেথা শিব ব্রহ্মা আছে খাড়া প্রবেশ করবার সন্ধানে।।
তাঁর মধ্যে সরসী, সুধাতুল্য জলরাশি
সেই স্বচ্ছ জলে সদা খেলে হংস আর হংসী।
কোটি জন্মের পিপাসা যার তার বিন্দু মাত্র জলপানে।।
সেই বাগানে ফলে মেওয়াফল, তাঁর কাছে তুচ্ছ চারি ফল
সে ফল যে পেয়েছে যে খেয়েছে হয়েছে পাগল।
তার জন্ম সফল কর্ম সফল, সেই ফলের নাম সেই জানে।।
বাগানের অতি মনোেহর শোভা মনোহরের মনোলোভা
সাধুমুখে শুনেছি তার নাম সুদর্লভা।
সেথা নাই রাত্রিদিবা প্রভা পায় আপন গুণে।।
গোঁসাই তাই ভাবছেন অন্তরে,
শোন অনন্ত রে সেই বাগান আছে কোটি জন্মের অন্তরে।
সেথা যাবি যদি স্বকাম নদী পার হবি তার কেমনে।।
