ইন্দু হল চাঁদ। যার সাধনা ‘বি’র জন্যই সাধনা। বিন্দু শুক্র। বাউল বলেন বিন্দু সাধনায় আত্মশক্তির দর্শন হয়ে যায়। হাউড়ে গোঁসাইও সে কথা শুনিয়েছেন।
শ্রীমদ্ভগবদগীতাতে আমরা দেখি শ্রীভগবান বলছেন–’রজোগুণসমুদ্ভবঃ এষঃ কামঃ এষঃ ক্রোধঃ মহাশনঃ মহাপাপমা ইহ এন বৈরিণম্ বিদ্ধি। রজগুণ থেকেই কাম উৎপন্ন হয়ে ক্রোধে পরিণত হয়। যাকে সব সময় শত্রু বলে জানবে। তৃষ্ণা ও আসক্তি থেকে আসে রজগুণ। রজগুণের এই আসক্তি থেকেই আসে কামনা। দেহসাধকের সাধনা কামনার কামকে প্রেমে রূপান্তরিত করে নেওয়া। আর তা হলেই কৃষ্ণপ্রাপ্তি। ‘আত্মশক্তির দর্শন’। অষ্টপাশ নাশ, ষড়রিপু দমন, চন্দ্ৰসাধন–এসবের মহদ্য দিয়ে কাম প্রেম হয়। ‘অষ্টপাশ’ কিন্তু প্রতীকী কৃষ্ণরূপ। এরকম ভাবতেই পারি আমরা। বাউল অষ্টমচন্দ্রের কথাও বলেন। সবই তাঁদের যদি কৃষ্ণবস্তু রক্ষার সাধনা হয় তাহলে তাঁদের ‘অষ্ট’তেও কিন্তু কৃষ্ণ বিরাজমান। কৃষ্ণ দেবকীর অষ্টম গর্ভেরই সন্তান। বাউলের কৃষ্ণ প্রতীকের বহিষ্কৃতি যেহেতু, তাই ‘প্রতীকের আট’ও সদর্থক অর্থেই কৃষ্ণসূচক। কৃষ্ণ আস্তিকতায় স্থৈর্য কৃষ্ণ চিত্তস্থৈর্যের ঈষৎ উচ্চাবচতা।
মনোহর খ্যাপার আশ্রমে একবার অজিত দাস বাউলের গলায় শুনেছিলাম এরকমই এক অতিক্রমের গান। গুরুপূর্ণিমা ছিল সেদিন। ভক্তশিষ্যরা অনেকেই এসেছিলেন। আশ্রমে থই থই করছে লোক। রোজকার ফাঁকা আশ্রম আর নেই। শ্রাবণের দু’এক পশলা লেগেছে হাওয়ায় বেশ কয়েকদিন ধরা বৃষ্টির পর এদিনই যেন মাঝ দুপুরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। সন্ধ্যেয় বেদনাশা বটের পাতায় খিলখিলিয়ে উঠছে সিক্ত হাওয়া। ভরা অজয়েও যেন দোলা লেগেছে। বিকেলে ফুরফুর করে জলের স্রোত এসে লেগেছিল। আশ্রম বেষ্টনীর পাঁচিলে। হাওয়ায় জলের গন্ধ। রাধাকৃষ্ণের মতোই দুলে উঠছে বেদনাশার পাতা। জ্যোৎস্না পড়ে চিক চিক করছে জলে ভেজা পরিষ্কার পাতা। বাউল গাইছেন নিবিষ্ট মনে। ভক্তশিষ্য থ মেরে বসে আছেন গানের সামনে। এমনই পরিবেশের সম্মোহন। খ্যাপার গান গিয়ে ধাক্কা মারছে নির্জন আশ্রমের চরাচরে রাধাকৃষ্ণের শূন্য অখণ্ডতায়।
বাউল গাইছেন–
অকৈতব গাছের লতায় পাতায় রাধা-কৃষ্ণ দোলে
পাতা নয়, শ্রীগোবিন্দ, লতা নয় সে প্রাণবন্ধু
ইন্দু বিন্দু এক দোলায় দোলে।
(ক্ষ্যাপা) সেই অপ্রাকৃত মদনমোহন।
কৈতবেতে না যায় লিখন।।
(রাধা) শ্যাম দোলে (ক্ষ্যাপা) ওই দ্বিদলে,
অকৈতব গাছের লতায় পাতায় রাধা-কৃষ্ণ ঝুলে
পাতা নয়, শ্রীগোবিন্দ, লতা নয় সে প্রাণবন্ধু
ইন্দু বিন্দু এক দোলায় দোলে।
সেই অপ্রাকৃত মদনমোহন
কৈতবেতে না যায় লিখন।।
(রাধা) শ্যাম দোলে
(ক্ষ্যাপা) ওই দ্বিদলে
গোঁসাই পূৰ্ণানন্দ ভনে,
দোলার কথা কেই বা জানে।
গোলকপতি আপন মনে
(ক্ষ্যাপা), এক দোলায়, আজ দুজন দোলে।।
অকৈতব গাছের লতায় পাতায় রাধা কৃষ্ণ দোলে
পাতা নয়, শ্রীগোবিন্দ, লতা নয় সে প্রাণবন্ধু,
ইন্দু বিন্দু এক দোলায় দোলে।
(ক্ষ্যাপা) সেই অপ্রাকৃত মদনমোহন।
কৈতবেতে না যায় লিখন।।
(রাধা) শ্যাম দোলে
(ক্ষ্যাপা) ওই দ্বিতলে।।
‘অকৈতব গাছ’ এখানে ছলনা কপটতাহীন সাধক ও তাঁর সাধন সঙ্গিনীর যুগল শরীর। গাছের লতায় পাতায় রাধাকৃষ্ণ দুলছে। মনে হচ্ছে যুগল শরীরের সমস্ত প্রত্যঙ্গগুলোতে অপার্থিব হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কেননা দুই শরীর স্থূল দেহকে অতিক্রম করে চলে গেছে সাধনের সিদ্ধতায়। যার জন্য ইন্দু বিন্দু এক দোলাতে দুলে যাচ্ছে। ইন্দু হচ্ছে চাঁদ আর কি কৃষ্ণবস্তু। সাধক বাউল ইন্দুরই সহায়তায় বিন্দুধারণ করে জাগতিকতার উর্ধ্বে উঠে গেছেন, সাধন সঙ্গিনীর সঙ্গে তাঁর মিলন এখন রাধাকৃষ্ণেরই মিলন। রাধাকে প্রকৃতিও বলেন। প্রকৃতি হল তাঁর সঙ্গিনী প্রকৃতির সাহায্যে সাধক বাউল কৃষ্ণবস্তুকে নিগম করে নিয়েছেন। সাধক আর সঙ্গিনী দুলছেন দ্বিদলে। ভ্রদ্বয়ে আজ্ঞাচক্রে দ্বিদল পদ্মের অবস্থান। আজ্ঞাপদ্ম দুই দলের। বাউল সাধক হৃদ্বয়ের মিলনস্থলকে আরশিনগরও বলে থাকেন। বহুশ্রুত লালনের গানে আমরা এর উল্লেখ পাই–’আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে/ আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর/ ও এক পড়শি বসত করে।‘ বাউল বিশ্বাস রাখেন আজ্ঞাচক্রেই পড়শি বা উপাস্য থাকে। বাউলের উপাস্য হল বীর্য। যার সাধনক্রিয়ায় বাউল অটল হয়ে যান। বাউল কামকে ধ্বংস করেন। কামের বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করা সেজন্যই তাঁর প্রধান সাধনা। ভীষ্মর ইচ্ছামৃত্যুর মতো কামকে বাউল ইচ্ছাকামের মধ্য দিয়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে রাখেন বস্তু সাধনাতেই। ভীষ্মর যে শরশয্যা–এই শরশয্যাকে আমরা কল্পনা করতে পারি সংসারের সঙ্গে। সংসার শরশয্যা। অর্থাৎ সাধক সংসারের মায়ারিপুতে যাতে না বশীভূত হয়ে পড়েন তাঁরই প্রতীকীরূপ ভীষ্মর শরশয্যা। ভীষ্ম ত্যাগ তিতিক্ষার উর্ধ্বে উঠতে চেয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞা পর্যন্ত করেছিলেন ব্রহ্মচর্য পালনের। মহানুভবতার পরিচয় দিতে গিয়েও ব্রহ্মচর্যের নাগপাশে তিনি আটকে থাকলেও তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল মায়া। শুধু কি মায়া? আড়ালে থেকেও রাজ্যের পুরোধা হবার বিশেষ বাসনা তাঁর কি একেবারেই ছিল না? ছিলই। না থাকলে তিনি ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে বেড়িয়ে পড়তেন। আর তা পারেননি বলেই ভীষ্ম শেষপর্যন্ত শরশয্যায় বিদ্ধ হয়ে পড়ে রইলেন গৃহ থেকে দূরে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে। ভীষ্মর এই শর যোজনার উপাখ্যান রিপু বশ্যতার উপাখ্যানই। যার থেকে সাধককে দূরে থাকতে হয়। বাউলের সাধনা শরীর থেকে কামের বন্ধন টেনে ছিঁড়ে কামকে নির্মূল করে দেওয়া। যার জন্যই তাঁর বস্তুরক্ষার প্রশ্ন। বাউলের সাধনাতে জন্মনিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে প্রসারিত করারই সাধনা। যদিও এ নিয়ে এখন প্রবল মতান্তর আছে। এক শ্ৰেণী বলছেন সাধক বাউলের যদি সন্তান না আসবে তবে আসল বাউল কী করে জন্মাবে? তবে বীর্য সাধনার মূল বিষয় নিয়ন্ত্রণেরই সাধনা। সৃষ্টির আদিবীজকে তাঁরা দেহ ব্রহ্মাণ্ডের সক্রিয় যোগশক্তির ভেতর ভ্রমণশীল বিচরণক্ষেত্র করে নিতে পারেন। এতেই তাঁদের সিদ্ধ স্তরের যে প্রবর্তনা তা প্রতিপন্ন হতে থাকে। আজ্ঞাচক্রে দ্বিদল যেমন থাকে তেমনই থাকে পদ্মের উপরে ইড়া,পিঙ্গলা, সুষুম্নার মিলনস্থল। বাউল একে ‘তিনরতি’ও বলে থাকেন। এই রতিকেই মতি দেন তাঁরা। আজ্ঞাপদ্মকে জ্ঞানপদ্মও বলে থাকেন সাধক। পরমাত্মা এর অধিষ্ঠাতা। জীবাত্মার বিনাশ হলে তবেই সাধক পরমাত্মার কাছাকাছি যেতে পারেন। বাউল সাধক অকৈতব মিলনে সেই স্তরে বিচরণ শুরু করে দেন। কেননা বিন্দুধারণে তাঁর উপাস্য, পড়শি বা কৃষ্ণবস্তু পরমাত্মার সংবর্ধনাকে গহন বৈভব দিয়ে দেয়। যার ফলে সিদ্ধ হয়ে ওঠেন সাধক। মদনমোহনও অপ্রাকৃত হয়ে এক দোলায় দুলতে থাকে। মদনমোহন কামজয়কারী মানুষ। অটল মানুষ। দ্বিদলে বা দ্বিতলে তখন রাধাকৃষ্ণ দোলে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষ এক হয়ে ওঠে। কে পুরুষ আর কে বা প্রকৃতি সেই বাহ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। আমরা যে দশ অবতারের কথা বলে থাকি সেও কিন্তু আমাদের বাহ্যতা নাশেরই প্রতীকস্বরূপ।
